পাকিস্তান ক্রিকেটে আবারও নেতৃত্বে পরিবর্তন এসেছে। টেস্ট দলের অধিনায়কের দায়িত্ব থেকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছে শান মাসুদকে। তার পরিবর্তে দ্বিতীয়বারের মতো পাকিস্তানের টেস্ট দলের নেতৃত্বে ফিরেছেন বাবর আজম। চলতি মাসের শেষ দিকে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দুই ম্যাচের টেস্ট সিরিজকে সামনে রেখে দল ঘোষণার সময় এই সিদ্ধান্ত জানায় পাকিস্তান ক্রিকেট বোর্ড (পিসিবি)। সাম্প্রতিক সময়ের হতাশাজনক পারফরম্যান্সের পর অভিজ্ঞ নেতৃত্বের ওপর আবারও আস্থা রাখার বার্তাই দিল বোর্ড।
শান মাসুদের নেতৃত্বের অধ্যায় শেষ হলো প্রত্যাশা আর বাস্তবতার বড় ব্যবধান রেখে। প্রায় তিন বছর আগে টেস্ট দলের দায়িত্ব নেওয়ার পর তার অধীনে পাকিস্তান খেলেছে ১৬টি টেস্ট। এর মধ্যে জয় এসেছে মাত্র চারটিতে, আর পরাজয় হয়েছে ১২টিতে। এই পরিসংখ্যান তাকে টেস্ট ইতিহাসে প্রথম ১৬ ম্যাচে ১২টি হার দেখা প্রথম অধিনায়কের অনাকাঙ্ক্ষিত রেকর্ডের মালিক করেছে।
ব্যক্তিগত সেই রেকর্ডের চেয়েও বেশি উদ্বেগের ছিল দলের সামগ্রিক অবস্থা। মাসুদের নেতৃত্বে পাকিস্তান টানা সাতটি টেস্টে হেরে দেশের ইতিহাসে দীর্ঘতম ধারাবাহিক পরাজয়ের যৌথ রেকর্ড স্পর্শ করে। পাকিস্তানের হয়ে মাসুদের চেয়ে বেশি টেস্টে নেতৃত্ব দেওয়া অধিনায়কদের মধ্যে হারের সংখ্যায় তার ওপরে রয়েছেন শুধু মিসবাহ-উল-হক। তবে মিসবাহ ৫৬টি টেস্টে ১৯টি হার দেখেছিলেন, আর মাসুদ মাত্র ১৬ ম্যাচেই ১২টি পরাজয়ের মুখোমুখি হয়েছেন। ফলে তার নেতৃত্ব নিয়ে সমালোচনা দ্রুতই তীব্র হয়ে ওঠে।
শুরুর দিক থেকেই কঠিন বাস্তবতার মুখে পড়তে হয়েছিল মাসুদকে। অস্ট্রেলিয়া সফরে তিন ম্যাচের টেস্ট সিরিজে ৩-০ ব্যবধানে হোয়াইটওয়াশ হয় পাকিস্তান। সেই ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার আগেই ঘরের মাঠে বাংলাদেশের কাছে ২-০ ব্যবধানে সিরিজ হারতে হয়। টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের বিপক্ষে পাকিস্তানের ইতিহাসে সেটিই ছিল প্রথম সিরিজ পরাজয়। ক্রিকেটবিশ্বে সেই ফলাফল ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয় এবং পাকিস্তানের টেস্ট কাঠামো নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন ওঠে।
তবে পুরো সময়টা ব্যর্থতায় ঢাকা ছিল না। ইংল্যান্ডের বিপক্ষে এক সিরিজে দারুণভাবে ঘুরে দাঁড়িয়ে জয় পেয়েছিল পাকিস্তান। সেটিই ছিল মাসুদের নেতৃত্বে সাতটি সিরিজের একমাত্র সাফল্য। বাকি চারটি সিরিজে দলকে হার মেনে নিতে হয়েছে। ধারাবাহিক ব্যর্থতার প্রভাব পড়ে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের ২০২৩–২৫ চক্রেও। পয়েন্ট তালিকার নিচের সারিতে অবস্থান করায় পাকিস্তানের ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা নিয়েও উদ্বেগ তৈরি হয়।
দলীয় ফল আশানুরূপ না হলেও ব্যাট হাতে শান মাসুদের পারফরম্যান্স তুলনামূলকভাবে ইতিবাচক ছিল। অধিনায়ক হওয়ার পর তার ব্যাটিং গড় বেড়ে দাঁড়ায় ৩৪.০৬, যেখানে দায়িত্ব নেওয়ার আগে সেই গড় ছিল ২৮.৫১। এই সময়ে তিনি দুটি শতক ও সাতটি অর্ধশতক করেন। একটি শতক আসে দক্ষিণ আফ্রিকার মাটিতে। আর মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে একটি টেস্টের দুই ইনিংসেই অর্ধশতক করে নিজের লড়াকু মানসিকতার পরিচয় দেন।
এমন পরিস্থিতিতে আবারও বাবর আজমের হাতে নেতৃত্ব তুলে দিয়েছে পিসিবি। ২০২৩ সালে টেস্ট অধিনায়কত্ব ছাড়ার পর তিন সংস্করণেই ব্যাট হাতে প্রত্যাশিত ধারাবাহিকতা ধরে রাখতে পারেননি তিনি। বিশেষ করে মাসুদের নেতৃত্বে টেস্টে বাবরের ব্যাটিং গড় নেমে আসে ২৭-এর কিছু বেশি, যা তার সামর্থ্যের তুলনায় অনেক কম। তবু নেতৃত্বের অভিজ্ঞতা, ড্রেসিংরুমে গ্রহণযোগ্যতা এবং অতীতে দলকে সফলভাবে পরিচালনার রেকর্ডই তাকে আবারও দায়িত্ব ফিরিয়ে দিয়েছে বলে মনে করছেন ক্রিকেট বিশ্লেষকেরা।
বাবরের প্রথম নেতৃত্বের মেয়াদের পরিসংখ্যান অবশ্য যথেষ্ট আশাব্যঞ্জক। তার অধিনায়কত্বে পাকিস্তান ২০টি টেস্ট খেলে ১০টিতে জয় পেয়েছিল। ঘরের মাঠে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ২-০ ব্যবধানে সিরিজ জয়ের মাধ্যমে নেতৃত্বের সূচনা করেছিলেন তিনি। পরে বাংলাদেশ ও শ্রীলঙ্কার মাটিতেও সিরিজ জয়ের স্বাদ পায় পাকিস্তান। কয়েকটি সিরিজে প্রতিপক্ষকে হোয়াইটওয়াশ করার কৃতিত্বও ছিল তার নেতৃত্বে। সেই সময় ব্যাটার বাবরও ছিলেন দুর্দান্ত ছন্দে। অধিনায়ক থাকা অবস্থায় তার টেস্ট ব্যাটিং গড় ছিল ৫০-এর ওপরে, যা নেতৃত্ব ও ব্যক্তিগত পারফরম্যান্স—দুই ক্ষেত্রেই তাকে বিশেষ উচ্চতায় নিয়ে যায়।
তবে প্রথম মেয়াদ পুরোপুরি বিতর্কমুক্ত ছিল না। সবচেয়ে বড় ধাক্কা আসে ঘরের মাঠে ইংল্যান্ডের কাছে ৩-০ ব্যবধানে হোয়াইটওয়াশ হওয়ার মাধ্যমে। পাকিস্তানের টেস্ট ইতিহাসে নিজ দেশে কোনো দলের কাছে এমনভাবে সিরিজ হারার ঘটনা ছিল সেটিই প্রথম। সেই ব্যর্থতার পর থেকেই নেতৃত্ব নিয়ে প্রশ্ন তৈরি হতে শুরু করে।
দ্বিতীয় মেয়াদে দায়িত্ব নিয়েই কঠিন সূচির মুখোমুখি হচ্ছেন বাবর আজম। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে দুই ম্যাচের সিরিজ দিয়ে নতুন অধ্যায় শুরু হবে। এরপর ছয় বছর পর টেস্ট সিরিজ খেলতে পাকিস্তান সফর করবে ইংল্যান্ডে, যেখানে তিন ম্যাচের কঠিন লড়াই অপেক্ষা করছে। সেই সফর শেষে ঘরের মাঠে নিউজিল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কার বিপক্ষেও গুরুত্বপূর্ণ টেস্ট সিরিজ রয়েছে।
সব মিলিয়ে বাবরের সামনে চ্যালেঞ্জ শুধু ম্যাচ জেতার নয়, বরং দীর্ঘদিন ধরে টেস্ট ক্রিকেটে ধারাবাহিকতার সংকটে থাকা একটি দলকে নতুন আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে দেওয়া। ব্যাট হাতে নিজের পুরোনো ছন্দে ফেরা, ড্রেসিংরুমে ইতিবাচক পরিবেশ তৈরি করা এবং আন্তর্জাতিক অঙ্গনে পাকিস্তানের টেস্ট ক্রিকেটকে আবারও প্রতিযোগিতামূলক অবস্থানে ফিরিয়ে আনা—এই তিনটি লক্ষ্যই এখন তার দ্বিতীয় নেতৃত্বের মেয়াদের সাফল্য নির্ধারণ করবে।
![সংকটে বাবরের কাঁধে ফের পাকিস্তানের টেস্ট নেতৃত্ব 1 সংকটে বাবরের কাঁধে ফের পাকিস্তানের টেস্ট নেতৃত্ব Cricket Gurukul [ ক্রিকেট গুরুকুল ] GOLN](https://cricketgoln.com/wp-content/uploads/2026/07/সংকটে-বাবরের-কাঁধে-ফের-পাকিস্তানের-টেস্ট-নেতৃত্ব.png)