আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট মানেই হলো বলের সংখ্যার চেয়ে বেশি রান সংগ্রহ করা। এই সংক্ষিপ্ততম সংস্করণে নিয়মিত এক রান নেওয়ার পাশাপাশি চার ও ছক্কার সাহায্যে দলের রানের গতি বাড়িয়ে নেওয়াই ব্যাটারদের প্রধান ও মূল দায়িত্ব। তবে বাস্তব পরিসংখ্যান বলছে, এই বিশেষ ক্ষেত্রে বিশ্বের অন্যান্য শীর্ষ দেশগুলোর তুলনায় বেশ পিছিয়ে রয়েছেন বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলের ব্যাটাররা। আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ঠিক আগে দলের ব্যাটিংয়ের এই ধীরগতি এবং রান তোলার নিম্ন হার অধিনায়ক নিগার সুলতানা জ্যোতিকে গভীরভাবে ভাবিয়ে তুলছে, যা দলের জন্য একটি বড় চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
শীর্ষ দলগুলোর তুলনায় বাংলাদেশের ব্যাটিং পরিসংখ্যান
বিগত দুই বছরের আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় দলগুলোর ব্যাটাররা যেখানে ওভারপ্রতি দ্রুত গতিতে রান তুলে গড়ে ১৩৬-এর বেশি স্ট্রাইকরেটে ব্যাটিং করেছেন, সেখানে বাংলাদেশের ব্যাটারদের গড় স্ট্রাইকরেট মাত্র ১২৩। স্ট্রাইকরেটের এই বিশাল ব্যবধান ও তারতম্য স্বাভাবিকভাবেই আন্তর্জাতিক ম্যাচের ফলাফলে বড় ধরনের পার্থক্য গড়ে দেয়। আসন্ন নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে দলের ব্যাটাররা যদি এই ধীরগতির ব্যাটিং থেকে নিজেদের বের করে এনে রান তোলার গতি বাড়াতে না পারেন, তবে মূল আসরে দলকে বড় ধরনের মাশুল গুণতে হবে এবং ভুগতে হবে—তা বাংলাদেশ অধিনায়ক নিগার সুলতানা জ্যোতি বেশ ভালোভাবেই অনুধাবন করতে পারছেন।
টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের মূল মঞ্চে লড়াইয়ের উদ্দেশ্যে স্কটল্যান্ডে অনুষ্ঠেয় ত্রিদেশীয় সিরিজে অংশ নিতে আগামীকাল ঢাকা ছাড়বে বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দল। এই সফরের ঠিক আগের দিন আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে স্ট্রাইকরেট সংক্রান্ত প্রশ্নের জবাবে বাংলাদেশ অধিনায়ক বলেন, ‘স্ট্রাইকরেটের এই সমস্যার একটি বড় কারণ হলো আমাদের ব্যাটিংয়ের ধারাবাহিকতার অভাব। আমাদের ব্যাটারদের ক্ষেত্রে দেখা যাচ্ছে যে, একটি ম্যাচে হয়তো একজন ব্যাটার ৩২টি বল খেলে ৫০ রান সংগ্রহ করছেন, কিন্তু ঠিক পরের ম্যাচেই পরিস্থিতি এমন দাঁড়াচ্ছে যে তিনি একই রান করতে ৪৮টি বল ব্যবহার করছেন। ফলে একটি নির্দিষ্ট স্ট্রাইকরেট বজায় রাখার যে বৈশ্বিক তাগিদ রয়েছে, ম্যাচের পরিস্থিতি অনুযায়ী সামগ্রিক ব্যাটিং ইউনিট হিসেবে আমরা তা ধরে রাখতে পারছি না।’
নিচে গত দুই বছরের আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টিতে শীর্ষ দল ও বাংলাদেশের ব্যাটিং স্ট্রাইকরেটের একটি তুলনামূলক চিত্র ছকের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| দলের বিবরণ ও শ্রেণী | বিগত দুই বছরের গড় স্ট্রাইকরেট | ব্যাটিংয়ের মূল ধরণ ও ঘাটতি |
| বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় নারী দলসমূহ | ১৩৬-এর বেশি | নিয়মিত চার-ছক্কা ও দ্রুত রান সংগ্রহ |
| বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দল | ১২৩ | ধারাবাহিকতার অভাব ও ধীরগতি |
টপঅর্ডার ব্যাটারদের ব্যর্থতা ও অধিনায়কের বিশ্লেষণ
দলের স্ট্রাইকরেটে পিছিয়ে থাকার পেছনে প্রধানত টপঅর্ডার বা ওপরের সারির ব্যাটারদের দায়িত্বজ্ঞানহীন ব্যাটিংকে দায়ী করেছেন অধিনায়ক নিগার সুলতানা জ্যোতি। তাঁর মতে, ক্রিকেটে বড় ইনিংস খেলার এবং রান রেট বাড়ানোর সবচেয়ে বড় সুযোগটি থাকে কেবল টপঅর্ডারের ব্যাটারদের হাতেই। পাওয়ার প্লে বা শুরুর প্রথম ছয় ওভারে যখন ওপেনার বা উদ্বোধনী ব্যাটারদের কাছ থেকে একটি ভালো সংগ্রহ আসে, তখন পরবর্তী ব্যাটারদের জন্য আরও বেশি স্ট্রাইকরেটে ব্যাটিং করা সহজ হয়।
কিন্তু বাংলাদেশ দলের ক্ষেত্রে দেখা যায় যে, ম্যাচের শুরুতেই দ্রুত দুই থেকে তিনটি উইকেট পড়ে যাচ্ছে। ফলে পরবর্তী ব্যাটারদের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হয় এবং তাঁরা উইকেট বাঁচানোর জন্য রক্ষণাত্মক ভঙ্গিতে ধরে খেলতে বাধ্য হন। এই পরিস্থিতিতে তখন আর চাইলেও উচ্চ স্ট্রাইকরেট বজায় রাখা সম্ভব হয়ে ওঠে না। অধিনায়ক মনে করেন, শুরুতেই উইকেট হারানোর এই নিয়মিত প্রবণতাই দলের সামগ্রিক স্ট্রাইকরেটের তারতম্য ও অবনতির প্রধান উৎস।
স্বর্ণা ও রাবেয়ার ওপর বাড়তি প্রত্যাশা
আসন্ন টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে দলের অন্যতম দুই তরুণ ক্রিকেটার স্বর্ণা আক্তার এবং রাবেয়া খানের কাছ থেকে ধারাবাহিক পারফরম্যান্স বা নৈপুণ্য দেখতে চান নিগার সুলতানা জ্যোতি। স্বর্ণা আক্তারের ব্যাটিং সামর্থ্য নিয়ে আশা প্রকাশ করে অধিনায়ক বলেন যে, স্বর্ণার যেভাবে বড় শট খেলার ক্ষমতা রয়েছে তা দলের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক। তবে তিনি এখনো আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে দলের জন্য পুরোপুরি ধারাবাহিক হয়ে উঠতে পারেননি। স্বর্ণা যদি নিজের পূর্ণ সক্ষমতা অনুযায়ী নিয়মিত অবদান রাখতে পারেন, তবে ম্যাচের শেষ দিকে দ্রুত রান তোলার ক্ষেত্রে তা দলের জন্য অনেক বড় অর্জনে পরিণত হবে।
অন্যদিকে রাবেয়া খান সম্পর্কে অধিনায়ক বলেন যে, রাবেয়া মূলত একজন দারুণ বোলার হওয়া সত্ত্বেও তাঁর চমৎকার ব্যাটিং করার ভালো সামর্থ্য রয়েছে। রাবেয়া যদি লোয়ার অর্ডারে বা নিচের সারির ব্যাটিংয়ে নিজের সামর্থ্য অনুযায়ী দলের জন্য আরও কিছু কার্যকর রান যোগ করতে পারেন, তবে সেটি বিশ্বকাপের মতো বড় মঞ্চে বাংলাদেশ দলের জন্য একটি বিশাল বাড়তি সুবিধা এবং ইতিবাচক দিক হিসেবে কাজ করবে।
