বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দল আন্তর্জাতিক টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপে অংশগ্রহণের উদ্দেশ্যে দেশ ছাড়ার চূড়ান্ত প্রস্তুতি গ্রহণ করেছে। সর্বশেষ তিনটি দ্বিপক্ষীয় আন্তর্জাতিক সিরিজে কোনো ম্যাচে জয় না পাওয়ার একটি নেতিবাচক ধারাবাহিকতা রয়েছে দলের। তবে এর মাঝে একমাত্র স্বস্তির বিষয় ছিল গত জানুয়ারি মাসে অনুষ্ঠিত টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হওয়ার গৌরব অর্জন করা। কিন্তু ইংল্যান্ডে মূল টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ খেলতে যাওয়ার আগে সাম্প্রতিক শ্রীলঙ্কা সিরিজের পর থেকে দলের ক্রিকেটারদের সেই স্বস্তি কিছুটা কমে গেছে। শ্রীলঙ্কা সিরিজের পর থেকে নিজেদের মাঠের পারফরম্যান্সের ঘাটতিগুলো নারী দলের ক্রিকেটাররা নিজেরাই অনুধাবন করতে পারছেন।
দলের প্রধান সমস্যা ও উত্তরণের কৌশল
বাংলাদেশ নারী ক্রিকেট দলের প্রধান সমস্যাগুলো ক্রিকেট মহলে বেশ সুপরিচিত। এর মধ্যে অন্যতম হলো ব্যাটিং বান্ধব সমতল উইকেটের সুবিধা পূর্ণাঙ্গভাবে নিতে না পারা, রান তোলার ক্ষেত্রে ধীরগতি বা কম স্ট্রাইকরেট এবং কার্যকর পেস বোলারের তীব্র সংকট। তবে এই সমস্ত সীমাবদ্ধতা ও প্রতিকূলতার মধ্যেও গ্রুপ পর্বের পাঁচটি ম্যাচের মধ্যে অন্তত তিনটিতে জয় লাভ করার একটি সুনির্দিষ্ট লক্ষ্য ও আশা ব্যক্ত করেছে দল। এই উদ্দেশ্যে আজ রাত এবং পরশু সকালে দুই ভাগে বিভক্ত হয়ে ক্রিকেটাররা ইংল্যান্ডের উদ্দেশ্যে দেশ ত্যাগ করবেন।
মূল বিশ্বকাপ প্রতিযোগিতা শুরু হওয়ার আগে স্কটল্যান্ডে স্বাগতিক স্কটল্যান্ড এবং নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে একটি ত্রিদেশীয় সিরিজ খেলবেন নিগার সুলতানারা। এই ত্রিদেশীয় সিরিজ এবং বিশ্বকাপের আগে নির্ধারিত দুটি আনুষ্ঠানিক প্রস্তুতি ম্যাচকে ইংল্যান্ডের কন্ডিশন বা আবহাওয়া ও উইকেটের সাথে অভ্যস্ত হওয়ার একটি চমৎকার সুযোগ হিসেবে দেখছেন তাঁরা। আগামী ১৪ জুন বার্মিংহামে নেদারল্যান্ডসের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে বাংলাদেশ দল বিশ্বকাপে তাদের প্রথম খেলায় মাঠে নামবে।
বাংলাদেশ দলের গ্রুপ পর্বে প্রতিপক্ষ দলগুলোর তালিকা এবং পূর্ববর্তী সাফল্যের বিবরণ নিচে ছকের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| গ্রুপ পর্বে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ দেশসমূহ | দলের প্রধান শক্তির জায়গা | সাম্প্রতিকতম সাফল্য ও সূচক | প্রথম ম্যাচের প্রতিপক্ষ ও তারিখ |
| অস্ট্রেলিয়া, ভারত, পাকিস্তান, দক্ষিণ আফ্রিকা ও নেদারল্যান্ডস | স্পিন বোলিং বিভাগ ও দলগত ফিল্ডিং | টি-টুয়েন্টি বিশ্বকাপ বাছাইপর্বে অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন | নেদারল্যান্ডস, ১৪ জুন (বার্মিংহাম) |
ব্যাটিং স্ট্রাইকরেট ও কন্ডিশন নিয়ে ভাবনা
বিশ্বকাপের প্রস্তুতি নিয়ে দলের অধিনায়ক নিগার সুলতানা এবং প্রধান কোচ সরোয়ার ইমরানকে বেশ সন্তুষ্ট মনে হচ্ছে। প্রধান কোচ সরোয়ার ইমরান জানিয়েছেন, ব্যাটাররা যেন আন্তর্জাতিক মানের ভালো স্ট্রাইক রেটে বা দ্রুত গতিতে রান তুলতে পারেন, সে জন্য গত কয়েক মাস ধরে তাঁদের ক্রিজ ছেড়ে ডাউন দ্য উইকেটে এসে খেলার জন্য বিশেষ অনুশীলন করানো হয়েছে। ঘরের মাঠে অনুষ্ঠিত শ্রীলঙ্কা সিরিজ এবং নিয়মিত অনুশীলনেও বাউন্সি বা লাফিয়ে ওঠা উইকেটে খেলেছেন নারী ক্রিকেটাররা। কোচ আশা প্রকাশ করেছেন যে, এই নিবিড় অনুশীলনের কারণে ব্যাটিংয়ে অন্তত বড় কোনো সংকট থাকবে না। অনুশীলনে করা কাজগুলো যদি ম্যাচে বাস্তবায়ন করা যায়, তবে সব ব্যাটারের স্ট্রাইকরেট ১০০-এর ওপরে থাকবে বলে কোচ আশাবাদ ব্যক্ত করেন।
অধিনায়ক নিগার সুলতানার দৃষ্টি এখন পুরোপুরি স্কটল্যান্ডের ত্রিদেশীয় সিরিজের ওপর নিবদ্ধ। তিনি জানান, স্কটল্যান্ড এবং ইংল্যান্ডের কন্ডিশন, আবহাওয়া ও উইকেট প্রায় একই রকম থাকে, যা তাঁদের ইংল্যান্ডের মূল আসরে খেলার জন্য অনেক বেশি সাহায্য করবে। এই সিরিজটিতে জয় লাভ করা সম্ভব হলে তা দলের জন্য অত্যন্ত ইতিবাচক মানসিক শক্তি হিসেবে কাজ করবে।
অধিনায়কের ফর্ম ও বোলিং কম্বিনেশন
বাংলাদেশ দলের জন্য অন্যতম চিন্তার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে অধিনায়ক নিগার সুলতানার ব্যক্তিগত ফর্ম। ঘরের মাঠে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সর্বশেষ টি-টুয়েন্টি সিরিজে তিন ম্যাচ খেলে তিনি করতে পেরেছেন মাত্র ২০ রান। তবে অধিনায়ক আত্মবিশ্বাসী যে, বিশ্বকাপে তিনি এই অফ-ফর্ম কাটিয়ে উঠতে সক্ষম হবেন। তিনি পরিস্থিতি অনুযায়ী দলের প্রত্যাশা পূরণে অবদান রাখার প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন।
বাংলাদেশ দল ঘরের মাঠে এবং দেশের বাইরেও বোলিংয়ের ক্ষেত্রে মূলত স্পিন শক্তির ওপর নির্ভর করে। ইংল্যান্ডের কন্ডিশনেও এই স্পিন নির্ভরতা বজায় থাকবে, কারণ ভালো বিকল্প না থাকায় দল মাত্র দুজন বিশেষজ্ঞ পেসার নিয়ে বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছে, যার মধ্যে মারুফা আক্তারের ওপর ভালো শুরুর দায়িত্ব থাকবে। প্রধান কোচ স্পষ্ট করেছেন যে, পেস বোলিংয়ের চেয়ে তাঁরা ব্যাটিং, ফিল্ডিং এবং স্পিন বোলিং—এই তিনটি বিভাগকে শক্তিশালী করতে বেশি মনোযোগী।
স্পিন বিভাগে দলের প্রধান ভরসা অভিজ্ঞ স্পিনার নাহিদা আক্তার। নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে সচেতন নাহিদা যেকোনো পরিস্থিতিতে চ্যালেঞ্জ নেওয়ার এবং বোলিং করার শক্তি দলের আছে বলে দৃঢ় আশা প্রকাশ করেছেন। গ্রুপ পর্বে অস্ট্রেলিয়া ও ভারতের সঙ্গে শক্তির ব্যবধান কিছুটা বেশি হলেও, খেলাটি টি-টুয়েন্টি ফরম্যাট হওয়ায় যেকোনো দলকে হারানোর বিশ্বাস ও সামর্থ্য বাংলাদেশ দলের রয়েছে বলে কোচ ও খেলোয়াড়রা মনে করেন।
