৩০০ আন্তর্জাতিক ম্যাচের নতুন রেকর্ডের পাতায় স্মৃতি মান্ধানা

ক্রিকেটের মক্কা খ্যাত লর্ডসের ঐতিহাসিক সবুজ গালিচায় নতুন এক রূপকথা লিখলেন ভারতের তারকা ওপেনার স্মৃতি মান্ধানা। প্রথমবারের মতো লর্ডসের মাঠে আয়োজিত আইসিসি নারী টেস্ট ম্যাচে ইংল্যান্ডের মুখোমুখি হয়ে এই অনন্য কীর্তি গড়েন তিনি। ঐতিহ্যবাহী এই ভেন্যুতে ভারতের জার্সিতে নিজের কর্মজীবনের ৩০০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলতে নেমেছেন এই বাঁহাতি ব্যাটার। এই মাইলফলক স্পর্শ করার মাধ্যমেই ইতিহাসের সর্বকনিষ্ঠ নারী ক্রিকেটার হিসেবে ৩০০টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার রাজকীয় রেকর্ডের একক মালিক বনে গেলেন তিনি।

বর্তমানে ২৯ বছর বয়সি এই স্টাইলিশ ওপেনার বিশ্ব ক্রিকেটের মাত্র দ্বাদশ নারী খেলোয়াড় হিসেবে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে ম্যাচের ট্রিপল সেঞ্চুরি পূর্ণ করলেন। ভারতের নারী ক্রিকেটের ইতিহাসে এটি অন্যতম এক গৌরবময় মুহূর্ত। দীর্ঘ পথচলার এই বিশেষ অর্জন নিয়ে স্মৃতি মান্ধানা নিজের গভীর উচ্ছ্বাস ও গর্ব প্রকাশ করেছেন। ম্যাচের ঠিক আগের দিন রাতে সতীর্থ ও টিম ম্যানেজমেন্টের কাছ থেকে তিনি প্রথম জানতে পারেন যে লর্ডসের এই টেস্টটিই হতে যাচ্ছে তাঁর ৩০০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ।

এই মাইলফলক ছোঁয়ার পর পুরোনো স্মৃতির ঝাঁপি খুলে স্মৃতি মান্ধানা বলেন, “আমি ম্যাচের আগের দিন রাতেই ৩০০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচের কথা জানতে পেরেছি। একজন খেলোয়াড় হিসেবে সব ফরম্যাট মিলিয়ে ম্যাচের নিখুঁত হিসাব রাখা আসলে সম্ভব হয় না। আমার খুব ভালো করে মনে আছে, ২০১৭ সালে মেয়েদের ওয়ানডে বিশ্বকাপের ফাইনাল এই লর্ডসের মাঠেই খেলেছিলাম। সেবারের আসরটি ব্যক্তিগতভাবে আমার মোটেও ভালো যায়নি। ওই ম্যাচের পর আমি তীব্র সংশয়ে ছিলাম যে ভারতের হয়ে আর কোনোদিন মাঠে নামার সুযোগ পাব কি না। অথচ আজ সেই লর্ডসেই আমি ভারতের হয়ে ৩০০তম আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলছি! জীবনের কাছ থেকে এর চেয়ে বেশি আর কিছু চাওয়ার থাকতে পারে না।”

লর্ডসের এই ঐতিহাসিক টেস্টে টসে জিতে ভারতকে প্রথমে ব্যাটিংয়ের আমন্ত্রণ জানান ইংল্যান্ডের অধিনায়ক ন্যাট স্কাইভার ব্রান্ট। ম্যাচটিতে ভারতের জার্সিতে সাদা পোশাকে অভিষেক হয়েছে তরুণ ক্রিকেটার শ্রী চরণীর। পাশাপাশি ভারতের মূল একাদশে ফিরেছেন উইকেটরক্ষক-ব্যাটার যস্তিকা ভাটিয়া। অন্যদিকে স্বাগতিক ইংল্যান্ড দলের হয়ে এই ম্যাচের মাধ্যমে টেস্ট ক্রিকেটে অভিষেক ঘটেছে অ্যালিস ক্যাপসি এবং ম্যাডি ভিলিয়ার্সের।

সম্প্রতি সমাপ্ত হওয়া টি-২০ বিশ্বকাপে ভারতের মেয়েদের পারফরম্যান্স ছিল বেশ হতাশাজনক। শক্তিশালী দলটি সেবার গ্রুপ পর্বের বাধা টপকাতেই ব্যর্থ হয়েছিল। তবে সেই দুঃসহ স্মৃতি ভুলে দলের সবাইকে নিয়ে সামনে এগিয়ে যেতে চান ভারতের এই সহ-অধিনায়ক। দলের মানসিকতা নিয়ে স্মৃতি বলেন, “লর্ডসে অস্ট্রেলিয়ার বিরুদ্ধে কোয়ালিফাই করার একটা সুবর্ণ সুযোগ আমাদের সামনে ছিল। কিন্তু দুর্ভাগ্যবশত আমরা সেই সুযোগটি কাজে লাগাতে পারিনি। তবে এটাই ক্রিকেটের আসল সৌন্দর্য, এখানে প্রতিনিয়ত আমাদের অতীত ভুলে সামনে এগিয়ে যেতে হয়। আমরা ব্যক্তিগতভাবে ম্যাচে শতরান করি কিংবা শূন্য রানে আউট হই না কেন, পরের দিন মাঠে নামলে প্রতিবারই একদম শূন্য থেকে শুরু করতে হয়। দলের ক্ষেত্রেও নিয়মটা একই। ভালো দিনের পাশাপাশি খারাপ দিন আসবেই, সেগুলো মেনে নিয়েই দেশের জন্য আমাদের সেরাটা দিয়ে যেতে হবে।”

টি-২০ ফরম্যাটের মারকুটে মেজাজ থেকে হুট করে লাল বলের ধ্রুপদী ক্রিকেটে মানিয়ে নেওয়াটা যে বেশ চ্যালেঞ্জিং, তা অকপটে স্বীকার করেছেন স্মৃতি। তিনি জানান, সংক্ষিপ্ত ফরম্যাট থেকে দীর্ঘতম ফরম্যাটে মনোযোগ সরাতে প্রাথমিকভাবে মাইন্ডসেটে বড় ধরনের পরিবর্তন আনতে হয়। স্মৃতির ভাষ্যমতে, “আমরা মেয়েরা খুব বেশি টেস্ট খেলার সুযোগ পাই না। এর আগে আমরা পারথে গোলাপি বলে দিবা-রাত্রির টেস্ট খেলেছি। এরপর ওয়ার্মস্লেতে ফেরাটা দারুণ ছিল। ২০১৪ সালের পর আমি আর ওখানে যাইনি, তাই অনেক পুরোনো স্মৃতি মনে পড়ে যাচ্ছিল। টি-২০ ক্রিকেটে ওপেন করার পর টেস্টের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়াটা কিছুটা কঠিন। কারণ টি-২০ তে স্ট্রাইক রেটই সব, আর লাল বলের ক্রিকেটে প্রতিটি বল দেখে-বুঝে খেলতে হয়। সম্পূর্ণ ক্রিকেটীয় ব্যাকরণ মেনে ক্রিজে অনেকটা সময় কাটানোর ধৈর্য রাখাটাই এখানে আসল পরীক্ষা।”

গত এক বছরে ব্যক্তিগত জীবনে বেশ কিছু চড়াই-উতরাই ও প্রতিকূলতার মধ্য দিয়ে যেতে হয়েছে স্মৃতি মান্ধানাকে। তবে মাঠের বাইরের সমস্ত মানসিক চাপ আর নেতিবাচকতাকে পেছনে ফেলে বাইশ গজে আবারও নিজের জাত চেনালেন এই বাঁহাতি তারকা। লর্ডসের ঐতিহাসিক আঙিনায় তাঁর এই অনন্য কীর্তি ভারতের নারী ক্রিকেটের ইতিহাসে এক নতুন প্রেরণা হিসেবে কাজ করবে।

মন্তব্য করুন