আমাদের আজকের আলোচনার বিষয় টেস্ট ম্যাচ – ক্লাসিক্যাল ক্রিকেট ।
টেস্ট ম্যাচ – ক্লাসিক্যাল ক্রিকেট

যতদূর জানা যায়, মেলবোর্ন ক্রিকেট গ্রাউন্ডে অস্ট্রেলিয়া ও ইংল্যান্ডের মধ্যে ক্রিকেটের প্রথম টেস্ট ম্যাচটি অনুষ্ঠিত হয়েছিল এবং এতে অস্ট্রেলিয়া ৪৫ রানে জয়লাভ করে। সাধারণত ‘টেস্ট স্ট্যাটাস’ পাওয়া দেশগুলোর মধ্যে টেস্ট ম্যাচ অনুষ্ঠিত হয়।
ক্রিকেটের সর্বোচ্চ কর্তৃপক্ষ International Cricket Council (ICC) বিভিন্ন দেশকে যোগ্যতার ভিত্তিতে ‘টেস্ট স্ট্যাটাস’ দিয়ে থাকে। সাধারণত টেস্ট ম্যাচগুলো দুই দেশের মধ্যে সিরিজ হিসাবে খেলা হয়। এটা এক থেকে সাত ম্যাচ পর্যন্ত হতে পারে। সব ম্যাচগুলো স্বাগতিক দেশের মাঠেই অনুষ্ঠিত হয়। টেস্ট খেলায় খেলোয়াড়েরা সবসময় সাদা পোশাক পরিধান করে এবং খেলায় লাল রংয়ের বল ব্যবহৃত হয়।
প্রতি দলে ১১ জন খেলোয়াড় নিয়ে ৫ দিন ব্যাপী এই ম্যাচ চলে। প্রতি দিনের খেলাকে তিন সেশনে (প্রতি সেশন = দুই ঘন্টা) ভাগ করা হয়। অর্থাৎ বিভিন্ন বিরতি বাদ দিয়ে মোট খেলার (সক্রিয়) সময় ৬ ঘন্টা। এছাড়া ৪০ মিনিট মধ্যাহ্ন ভোজ, চা- বিরতির জন্য ২০ মিনিট এবং ইনিংস পরিবর্তনে ১০ মিনিট।
কোনো ধরনের বাধা বিঘ্ন না ঘটলে প্রতিদিন ৯০ ওভার খেলা হয়। উল্লেখ্য, সেশন ও বিরতির সময় দুর্যোগ আবহাওয়া বা অন্য কোন কারণে পরিবর্তন করা যেতে পারে। টেস্ট ম্যাচ সবসময় দিনের বেলায় খেলতে হয়, যদিও বিভিন্ন কারণ ও শর্তসাপেক্ষে ইদানিং day-night-এ টেস্ট ম্যাচ খেলার আইন পাশ হয়েছে। এখানে দুই দলে প্রতিযোগীতা হয় ইনিংস ভিত্তিতে। প্রতি ইনিংসে একদল ব্যাটিং ও অন্য দল বোলিং করে। একটি টেস্ট ম্যাচে সাধারণত চার ইনিংসের খেলা হয়। অর্থাৎ প্রতিটি দল দুইবার ব্যাটিং ও দুইবার বোলিং করার সুযোগ পায়।
টেস্ট ম্যাচে জয় পরাজয় ফলাফলের জন্য ৫ দিনের মধ্যে ৪ ইনিংস খেলা সম্পন্ন করতে হয়। যদি তা না হয় দুই দলের মধ্যে রান বা উইকেটের পার্থক্য যতই হোক না কেন ফলাফল হবে “ড্র”। আলোচনার সুবিধার্থে মনে করি ‘এ- দল’ ও ‘বি- দল’-এর মধ্যে টেস্ট ম্যাচ হচ্ছে। টচে জিতে ‘এ- দল’ সিদ্ধান্ত নিল যে তাঁরা প্রথম ইনিংসে ব্যাটিং করবে।
সুতরাং ‘বি- দল’ বোলিং করবে। এই মুহুর্তে আমরা বলতে পারি শুরুটা (১ম ইনিংস) এভাবে হলেও টেস্টের নিয়ম অনুযায়ী পালাক্রমে ২য় ইনিংসে ‘বি- দল’ ব্যাটিং করবে ও ‘এ- দল’ বোলিং করবে, ৩য় ইনিংসে ‘এ- দল’ আবার ব্যাটিং করবে ও ‘বি- দল’ আবার বোলিং করবে এবং ৪র্থ বা শেষ ইনিংসে ‘বি- দল’ ব্যাটিং করবে ও ‘এ- দল’ বোলিং করবে। উল্লেখ্য, প্রতিটি ইনিংসের সর্বোচ্চ ওভারের সংখ্যা ও সময় অনির্দিষ্ট! অর্থাৎ যখন ব্যাটিং দলের সবাই আউট হয়ে যাবে অথবা ব্যাটিং দল ঘোষণা দিয়ে ইনিংসের ইতি টানবে তখনই ইনিংস শেষ বলে পরিগণিত হবে।
প্রতিটি ইনিংসের সম্ভাব্য পরিসমাপ্তি নিম্নের যে কোন একটি হতে পারে:
১. ব্যাটিং দলের সবাই আউট হয়ে গেছে অর্থাৎ ১০ উইকেট পড়ে গেছে।
২. উইকেট হাতে থাকা অবস্থায় ব্যাটিং দলের ক্যাপ্টেনের ইনিংসের সমাপ্তি ঘোষণা (Declares)। সাধারণত উইকেট হাতে থাকা অবস্থায় কোন দল যদি মনে করে যে তাঁদের যথেষ্ট রান সংগ্রহ হয়েছে তখন দলের ক্যাপ্টেন ইচ্ছা করলে declare দিতে পারে।
৩. ৪র্থ বা শেষ ইনিংসে জেতার জন্য যদি প্রয়োজনীয় রান হয়ে যায়।
৪. ম্যাচের জন্য নির্ধারিত চুড়ান্ত সময় যদি শেষ হয়ে যায়।
ডিক্লারেশন:
ব্যাটিং দলের ক্যাপ্টেন দলের সবাই আউট হওয়ার আগেই যদি স্বেচ্ছায় ইনিংসের সমাপ্তি ঘোষণা করে তখন তাকে ক্রিকেটের ভাষায় ‘Decleration’ বলে। এটি ম্যাচের যে কোনো সময় করা যায়। সাধারণত ‘Decleration’ দেওয়ার অন্যতম উদ্দেশ্য হচ্ছে ম্যাচের ফলাফল ড্র- এর পরিবর্তে জয়/পরাজয়ের মাধ্যমে নির্ধারণ করা – যেখানে ‘Decleration’ দেওয়া ব্যাটিং দলের জয়ের সম্ভাবনা বেশি থাকে।
উদাহরণ: মনে করি টসে জিতে ‘এ- দল’ ১ম ইনিংসে ব্যাটিং করে ৪০০ রান সংগ্রহ করে অল আউট হয়েছে এবং এর জন্য সময় লেগেছে দেড় দিন। ২য় দিনের মধ্যাহ্ন বিরতির পর ‘বি- দল’ ব্যাটিং শুরু করে। ৩য় দিনের মধ্যাহ্ন বিরতির আগেই সব উইকেট হারিয়ে ‘বি- দল’-এর সংগ্রহ মাত্র ২৫০ রান।
অর্থাৎ এই মুহুর্তে ‘এ- দল’ ‘বি-দল’ থেকে ১৫০ রানে এগিয়ে আছে এবং ব্যাটিং- এর মাধ্যমে ৩য় ইনিংস শুরু করেছে। ৪র্থ দিনের মধ্যাহ্ন বিরতির পর দেখা গেল ‘এ- দল’-এর সংগ্রহ ৩০০ রান এবং উইকেট হারিয়েছে মাত্র চারটি। অর্থাৎ ‘এ- দল’-এর মোট সংগ্রহ (৪০০+৩০০) ৭০০ রান এবং তারা ইচ্ছা করলে ৩য় ইনিংসের খেলা আরো অনেকক্ষণ চালিয়ে যেতে পারবে। যেহেতু ছয় উইকেট অবশিষ্ট আছে।
এখন আমরা যদি ম্যাচের সার্বিক সম্ভাব্য পরিস্থিতি নিয়ে ভাবি তাহলে ডিক্লারেশনের ব্যাপারটি পরিষ্কার হবে। এই মুহুর্তে ম্যাচের ৫ দিনের মধ্যে প্রায় চার দিন শেষ এবং বাকী আছে এক দিন থেকে কিছু বেশি। চলতি ৩য় ইনিংস শেষ হওয়ার পর আরো একটি ইনিংস (৪র্থ) বাকী যেটিতে ‘বি- দল’ ব্যাটিং করবে।
এখন ‘এ- দল’ যদি ব্যাটিং অনবরত রেখে আজকের দিনও (৪র্থ দিন) শেষ করে দেয় তবে রানের পার্থক্য হবে (৭০০-১৫০) ৫৫০ রানেরও বেশি। ৫ম দিনে শেষ ইনিংসে ব্যাটিং করতে নেমে ‘বি- দল’ ভাববে ‘এ- দল’-কে হারাতে এক দিনের মধ্যে ৫৫০- এর ওপরে রান নেওয়া তাদের পক্ষে অসম্ভব। সুতরাং রক্ষণাত্মক ব্যাটিং করে কোনরকমে ম্যাচের শেষ সময় পর্যন্ত সব উইকেট না হারিয়ে ঠিকে থেকে ম্যাচ ড্র করাই হবে বুদ্ধিমানের কাজ।
তাই ‘এ- দল’-এর উচিত হবে ৪র্থ দিন যখনই রানের পার্থক্য ৫০০-এর ওপরে যাবে তখনই ‘Decleraton’ দিয়ে ৩য় ইনিংসের সমাপ্তি টানা। তাহলে ‘বি- দল’-কে ৪র্থ দিনেই শেষ ইনিংসের ব্যাটিং করতে নামতে হবে। এতে ‘এ- দল’ ‘বি- দল’-কে অল আউট করার জন্য অর্থাৎ ৪র্থ ইনিংস শেষ করার জন্য পর্যাপ্ত সময় পাবে এবং ম্যাচে ‘এ- দল’-এর জেতার সম্ভাবণা থাকবে বেশি।
ফলো অন
প্রথম ইনিংসে ব্যাটিং দল যত রান করেছে ২য় ইনিংসে প্রতিপক্ষ দলের (১ম ইনিংসের বোলিং দল) রানের সংখ্যা তার চেয়ে ২০০- এর অধিক কম হতে পারবে না। অন্যথায় ফলো অনে পড়বে। আমরা জানি ১ম ইনিংসে ‘এ- দল’ ব্যাটিং করেছিল। মনে করি ১ম ইনিংসে ‘এ দল’ ৪০০ রান করেছে এবং ২য় ইনিংসে ‘বি- দল’ ব্যাটিং-এ নেমে মাত্র ১৯০ রান করে সাবই আউট হয়ে যায়।
যেহেতু ‘বি- দল’-এর রান সংগ্রহ খুবই কম (২১০ রান পিছিয়ে) তাই এখন ‘এ- দল’-এর ক্যাপ্টেন যদি মনে করে জেতার জন্য তাঁদের সংগ্রহকৃত ৪০০ রান যথেষ্ট এবং ইচ্ছা করলে পালাবদলের হিসাবে নিজেরা ব্যাটিং- এর মাধ্যমে ৩য় ইনিংস শুরু না করে ‘বি- দল’কে আবারো ব্যাটিং করতে (প্রত্যক্ষ্যভাবে ব্যাটিং- এর মাধ্যমে ৪র্থ ইনিংস শুরু করার জন্য) নির্দেশ দিতে পারে।
একে ক্রিকেটের ভাষায় ‘follow-on’ বলা হয়। এখন আবার ব্যাটিং-এ নেমে বি- দল’ যদি ২১০ বা তার ওপরে রান করে তবে ‘এ- দল’ আবার ব্যাটিং- যাবে। (অর্থাৎ আগে বাদে দেওয়া ৩য় ইনিংসের খেলা হবে) আর ‘বি- দল’ যদি ২১০ রান সংগ্রহ করতে না পারে তবে ‘এ- দল’ এক ইনিংস হাতে রেখে ম্যাচ জিতে যাবে এবং এটি হবে ‘বি- দল’-এর জন্য লজ্জাজনক পরাজয়। একটি টেস্ট ম্যাচের সমাপ্তি নিম্নলিখিত যে কোন একটি হতে পারে:
১) চার ইনিংসের খেলায় চতুর্থ ইনিংসে ব্যাটিং দল (‘বি- দল’) বোলিং দলের (‘এ- দল’) সর্বমোট সংগ্রহ রানের চেয়ে বেশি রান করার আগেই অল আউট হয়ে গেছে। বোলিং দল (‘এ- দল’) পার্থক্যগত রানে জিতবে। মনে করি, ৩য় ইনিংসের খেলা শেষে ‘এ- দল’-এর মোট সংগ্রহ ৬২০ রান। চতুর্থ ইনিংসের খেলা শেষে (‘বি- দল’ অল আউট) ‘বি- দল’-এর মোট সংগ্রহ ৬০০ রান। ফলাফল ‘এ- দল’ ২০ রানে জিতেছে।
২) চার ইনিংসের খেলায় চতুর্থ ইনিংসে ব্যাটিং দল (‘বি- দল’) বোলিং দলের (‘এ- দল’) সর্বমোট সংগ্রহ রানের সমান রান করে অল আউট হয়ে গেছে। ফলাফল টাই। মনে করি, ৩য় ইনিংসের খেলা শেষে ‘এ- দল’-এর মোট সংগ্রহ ৬২০ রান। অল আউট হওয়ার মুহুর্তে ‘বি- দল’-এর মোট সংগ্রহ ৬২০ রান। খেলার ফলাফল টাই। টেস্ট খেলায় এ ধরনের টাই খুবই ব্যতিক্রমী ঘটনা। (ক্রিকেট খেলায় ‘ড্র’ ও ‘টাই’-এর পার্থক্য!)
৩ ) চার ইনিংস খেলায় চতুর্থ ইনিংসে ব্যাটিং দল (‘বি- দল’) অল আউট হওয়ার আগেই বোলিং দলের (‘এ-দল’) সর্বমোট সংগ্রহ রানের চেয়ে বেশি রান করেছে। ব্যাটিং দল (‘বি- দল’) অবশিষ্ট থাকা উইকেটে জিতবে। মনে করি, ৩য় ইনিংসের খেলা শেষে ‘এ- দল’-এর মোট সংগ্রহ (১ম ইনিংস + ৩য় ইনিংস) ৬২০ রান। চতুর্থ ইনিংসের খেলায় ছয় উইকেট হারিয়ে (চার উইকেট অবশিষ্ট আছে) ‘বি- দল’-এর মোট সংগ্রহ (২য় ইনিংস + ৪র্থ ইনিংস) ৬২১ রান। ফলাফল ‘বি- দল’ চার উইকেটে জিতছে।
৪) ২য় ইনিংসের ব্যাটিং দল (‘বি- দল’) ফলো অনের কারণে ৩য় ইনিংসে আবারো ব্যাটিং-এ নেমে ১ম ইনিংসে ‘এ- দল’-এর সংগ্রহ রানের চেয়ে বেশি রান করার আগেই অল আউট হয়ে গেছে। ১ম ইনিংসের ব্যাটিং দল (‘এ-দল’) এক ইনিংস + পার্থক্যগত রানে জিতেছে। মনে করি, ১ম ইনিংসে ‘এ- দল’ ৪০০ রান করেছে এবং ২য় ইনিংসে ‘বি- দল’ ব্যাটিং- এ নেমে মাত্র ১৯০ রান করে সাবই আউট হয়ে গেছে। ৩য় ইনিংসে (ফলো অনে) আবারো ব্যাটিং- নেমে ‘বি- দল’ ২০০ রানে অল আউট। দুই ইনিংসে ‘বি- দল’-এর মোট সংগ্রহ হলো ১৯০+২০০=৩৯০ রান। তাই ফলাফল ‘এ- দল’ এক ইনিংস + ১০ রানে জিতেছে।
৫) খেলায় ফলাফল হওয়ার আগেই যদি টেস্ট খেলার মোট সময় পেরিয়ে যায় তাহলে খেলা ড্র হবে। এ অবস্থায় কোন দলের রান বেশি বা কোন দলের উইকেট বেশি ইত্যাদি গণ্য হবে না। এটি সাধারণত টেস্ট ম্যাচের শেষের দিন ঘটে থাকে। মনে করি, ৩য় ইনিংসের খেলা শেষে ‘এ- দল’-এর মোট সংগ্রহ (১ম ইনিংস + ৩য় ইনিংস) ৬২০ রান। ৫ম দিনে চতুর্থ ইনিংসের খেলায় বেলাশেষে ‘বি- দল’-এর মোট সংগ্রহ (২য় ইনিংস + ৪র্থ ইনিংস) ৬০০ রান এবং তখনো তাদের চার উইকেট অবশিষ্ট আছে। অর্থাৎ ‘বি- দল’-এর চেয়ে ‘এ- দল’-এর ২০ রান বেশি।
কিন্তু ম্যাচের চুড়ান্ত ফলাফল ড্র। কারণ ম্যাচের সময় শেষ হয়ে গেছে, কিন্তু ইনিংস তো শেষ হয়নি! তাই টেস্ট ম্যাচে অনেক সময় দেখা যায় শেষ ইনিংসে বিশেষ করে শেষের দিন ব্যাটিং দল পরাজয় এড়ানোর জন্য রান বাড়ানোর ঝুঁকি না নিয়ে কোন রকমে ম্যাচের শেষ সময় পর্যন্ত ঠিকে থাকার চেষ্টা করে।

৬) বিশেষ করে বৃষ্টি বা অন্য কোন কারণে বেশিরভাগ সময় খেলা বন্ধ থাকলে সাধারণত ম্যাচ বাতিল ঘোষণা করা হয়। তবে অনেক সময় ম্যাচ বাতিল না করে ড্র ঘোষণা করতে পারে। যদিও এ ধরনের ঘটনা খুবই বিরল।
