সিরিজ বাঁচাতে বাংলাদেশের সামনে কঠিন পরীক্ষা

জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে তিন ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে টিকে থাকার লড়াইয়ে আজ মাঠে নামছে বাংলাদেশ। হারারের ঐতিহাসিক হারারে স্পোর্টস ক্লাবে অনুষ্ঠিত দ্বিতীয় ওয়ানডে সফরকারী দলের জন্য কার্যত ‘করো কিংবা মরো’ ম্যাচ। প্রথম ম্যাচে অপ্রত্যাশিত হারের পর এখন সিরিজে সমতা ফেরানোর একমাত্র পথ জয়। আজ হারলে এক ম্যাচ হাতে রেখেই সিরিজ হারাতে হবে বাংলাদেশকে। আর জিততে পারলে শেষ ওয়ানডেটি পরিণত হবে শিরোপা নির্ধারণী লড়াইয়ে।

বাংলাদেশ সময় দুপুর দেড়টায় শুরু হতে যাওয়া ম্যাচটি ঘিরে স্বাভাবিকভাবেই বাড়তি চাপ রয়েছে টাইগারদের ওপর। শুধু সিরিজ রক্ষাই নয়, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ওয়ানডে ক্রিকেটে গড়ে ওঠা আত্মবিশ্বাস ও ধারাবাহিকতা ধরে রাখার জন্যও এই ম্যাচের গুরুত্ব অনেক বেশি।

এক সময় টানা চারটি ওয়ানডে সিরিজে পরাজয়ের হতাশা নিয়ে পথ চলতে হয়েছিল বাংলাদেশকে। ২০২৫ সালের শুরুতে সেই ব্যর্থতার ধারা দলকে মানসিকভাবে পিছিয়ে দিয়েছিল। তবে বছরের শেষ ভাগে চিত্র বদলে যায়। নিজেদের মাঠে ওয়েস্ট ইন্ডিজকে হারানোর পর পাকিস্তান, নিউজিল্যান্ড ও অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষেও সিরিজ জিতে নতুন উদ্দীপনায় ফিরেছিল বাংলাদেশ। ধারাবাহিক সাফল্যের ফলে ওয়ানডে বিশ্বকাপে সরাসরি জায়গা নিশ্চিত করার লড়াইয়েও নিজেদের অবস্থান শক্তিশালী করে দল।

কিন্তু হারারের প্রথম ওয়ানডেতে সেই ইতিবাচক যাত্রায় বড় ধাক্কা আসে। ম্যাচের শুরু থেকে বাংলাদেশ পরিকল্পনা অনুযায়ী এগোলেও শেষ পর্যন্ত ব্যাটিং ব্যর্থতায় হাতছাড়া হয় প্রায় নিশ্চিত জয়। বিশেষ করে এমন একটি ম্যাচে পরাজয় ক্রিকেট বিশ্লেষকদেরও বিস্মিত করেছে, কারণ বল হাতে বাংলাদেশ ছিল সম্পূর্ণ আধিপত্যশীল।

প্রথম ম্যাচের সবচেয়ে উজ্জ্বল দিক ছিল পেসার নাহিদ রানার অসাধারণ বোলিং। তিনি মাত্র ২১ রান দিয়ে ৬ উইকেট শিকার করে বাংলাদেশের ওয়ানডে ইতিহাসে এক ইনিংসে সেরা বোলিংয়ের নতুন রেকর্ড গড়েন। তাঁর গতি, নিয়ন্ত্রণ ও ধারাবাহিক আক্রমণাত্মক বোলিংয়ের সামনে জিম্বাবুয়ের ব্যাটিং লাইনআপ মাত্র ১৪১ রানে গুটিয়ে যায়। এমন বোলিংয়ের পর জয় প্রায় নিশ্চিত বলেই মনে হয়েছিল।

কিন্তু ১৪২ রানের সহজ লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে সম্পূর্ণ ভিন্ন চিত্র দেখা যায় বাংলাদেশের ব্যাটিংয়ে। শুরু থেকেই নিয়মিত বিরতিতে উইকেট হারাতে থাকে সফরকারীরা। কোনো ব্যাটার দায়িত্ব নিয়ে ইনিংস গড়ে তুলতে পারেননি। অযথা ঝুঁকিপূর্ণ শট, পরিস্থিতি বিবেচনায় ধৈর্যের অভাব এবং বড় জুটি গড়তে না পারার কারণে মাত্র ১১৬ রানেই অলআউট হয়ে যায় বাংলাদেশ। ফলে ২৫ রানের হতাশাজনক পরাজয় দিয়ে সিরিজ শুরু করতে হয়।

এটি অবশ্য সফরের প্রথম ব্যাটিং বিপর্যয় নয়। এর আগে একমাত্র টেস্টেও ব্যাটিং ব্যর্থতাই বাংলাদেশের হারের অন্যতম কারণ ছিল। ফলে ব্যাটিং ইউনিটের ধারাবাহিকতা এখন দলের সবচেয়ে বড় উদ্বেগের জায়গা হয়ে দাঁড়িয়েছে।

তবে জাতীয় দলের ব্যাটিং কোচ মোহাম্মদ আশরাফুল এখনই হতাশ নন। তাঁর বিশ্বাস, সাম্প্রতিক মাসগুলোতে ব্যাটাররা যে মানের ক্রিকেট খেলেছে, সেটিই তাদের প্রকৃত সামর্থ্যের প্রতিফলন। তিনি মনে করেন, প্রথম ওয়ানডেতে অনেক ভালো শটও সরাসরি ফিল্ডারের হাতে গেছে, যা দুর্ভাগ্যজনক। একই সঙ্গে হারারের কন্ডিশনের সঙ্গে দ্রুত মানিয়ে নিতে না পারাও ব্যাটিং ব্যর্থতার একটি বড় কারণ বলে মনে করেন তিনি।

আশরাফুলের ব্যাখ্যায়, বাংলাদেশের মাঠে সাধারণত ৬০ থেকে ৬৫ মিটারের বাউন্ডারিতে যেসব শট সহজেই চার বা ছক্কা হয়, হারারের ৭৩ থেকে ৭৫ মিটার দীর্ঘ বাউন্ডারিতে সেগুলো অনেক সময় ফিল্ডারের নাগালে চলে যায়। পাশাপাশি উইকেটে বাড়তি বাউন্স থাকায় টাইমিংও কঠিন হয়ে পড়ে। তাই আজকের ম্যাচে ব্যাটারদের আরও ধৈর্যশীল, হিসেবি এবং পরিস্থিতি অনুযায়ী ক্রিকেট খেলতে হবে।

বাংলাদেশের জন্য আরেকটি উদ্বেগের বিষয় সাম্প্রতিক ইতিহাস। ২০২২ সালেও জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে সর্বশেষ ওয়ানডে সিরিজে ২-১ ব্যবধানে হেরেছিল টাইগাররা। এবারও প্রথম ম্যাচে পরাজয়ের পর সেই স্মৃতি নতুন করে সামনে এসেছে। ফলে দ্বিতীয় ওয়ানডে শুধু সিরিজ বাঁচানোর লড়াই নয়, আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ারও গুরুত্বপূর্ণ উপলক্ষ।

এর মধ্যেই দলে এসেছে নতুন ধাক্কা। উইকেটরক্ষক-ব্যাটসম্যান লিটন দাস পুরোপুরি চোটমুক্ত হতে না পারায় পুরো ওয়ানডে সিরিজ থেকেই ছিটকে গেছেন। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে শেষ ওয়ানডেতে পাওয়া চোটের কারণে তিনি টি-টোয়েন্টি সিরিজ ও জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে একমাত্র টেস্টেও খেলতে পারেননি। ওয়ানডে সিরিজের জন্য সফরে গেলেও চিকিৎসক দলের পরামর্শে তাঁকে বিশ্রামে রাখা হয়েছে। তাঁর অনুপস্থিতিতে ব্যাটিং বিভাগে অভিজ্ঞতার ঘাটতি আরও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

অন্যদিকে প্রথম ম্যাচের জয়ে স্বাগতিক জিম্বাবুয়ে আত্মবিশ্বাসে ভরপুর। নিজেদের পরিচিত কন্ডিশনের সুবিধা কাজে লাগিয়ে তারা আজই সিরিজ নিশ্চিত করার লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামবে। বাংলাদেশের ব্যাটিং দুর্বলতা তারা নিশ্চয়ই আবারও কাজে লাগানোর চেষ্টা করবে।

বাংলাদেশের জন্য স্বস্তির জায়গা হলো বোলিং বিভাগ। প্রথম ম্যাচে পেস ও স্পিন—দুই বিভাগই নিজেদের দায়িত্ব সফলভাবে পালন করেছে। এখন প্রয়োজন ব্যাটিং ইউনিটের দায়িত্বশীল ও পরিণত পারফরম্যান্স। নতুন বলে উইকেট না হারিয়ে ইনিংস গড়ে তোলা, অযথা বড় শটের চেষ্টা এড়িয়ে স্ট্রাইক রোটেশন বজায় রাখা এবং অন্তত একটি বড় জুটি গড়ে তোলাই হতে পারে জয়ের ভিত্তি।

সব মিলিয়ে হারারের দ্বিতীয় ওয়ানডে বাংলাদেশের জন্য শুধুই একটি ম্যাচ নয়। এটি আত্মবিশ্বাস পুনর্গঠনের পরীক্ষা, সাম্প্রতিক সাফল্যের ধারাবাহিকতা ধরে রাখার চ্যালেঞ্জ এবং সিরিজে বেঁচে থাকার শেষ সুযোগ। আজকের ফলই নির্ধারণ করে দিতে পারে সফরের বাকি অংশে বাংলাদেশের পথ কতটা সহজ বা কঠিন হবে।

মন্তব্য করুন