মাশরাফি – লেজের দিকে ব্যাটিংয়ে অনন্য !

মাশরাফি – লেজের দিকে ব্যাটিংয়ে অনন্য !!!

মাশরাফি বিন মোর্ত্তজা নামটা এদেশের ক্রিকেটে সবচেয়ে পরিচিত একটা নামের একটা। দেশের গণ্ডি পেরিয়ে নামটা ছড়িয়েছে বিশ্ব ক্রিকেটেও। মূল পরিচয় ছিল বোলার। এরপরে নাম কামিয়েছেন দেশের সবচেয়ে সফল অধিনায়ক হিসেবে।

বাংলাদেশকে সবচেয়ে বেশি ওয়ানডে ম্যাচ জেতানো নেতা তো মাশরাফি বিন মোর্ত্তজাই। ওয়ানডে ক্রিকেটে বাংলাদেশের দ্বিতীয় সর্বোচ্চ উইকেট শিকারি এই বোলার সফল ব্যাট হাতেও। ব্যাটসম্যান মাশরাফির ব্যাটিং নিয়ে হয় না খুব একটা আলোচনা।হতে পারতেন কার্যকরী এক অল-রাউন্ডারও। ওয়ানডে ক্রিকেটে নয় নম্বর থেকে এগারো নম্বর পজিশনে ব্যাট করাদের মধ্যে মাশরাফির রয়েছে অনেক রেকর্ড। থাকছে সেসবেরই কিছু।

ওয়ানডে ক্রিকেটে নয় থেকে এগারো ব্যাটিং পজিশনে মাশরাফি ব্যাট করেছেন ৯৬ ইনিংস। এই ৯৬ ইনিংসে মাশরাফি প্রায় সাড়ে এগারো গড়ে ৮১.৭৩ স্ট্রাইক রেটে রান করেছেন ৯৮৯। প্রায় পঞ্চাশ বছরের ইতিহাসে এই পজিশনে মাশরাফি বিন মোর্ত্তজার চেয়ে বেশি রান নাই আর করো। চার, ছক্কাতেও এগিয়ে আছেন নড়াইল এক্সপ্রেস।

মাশরাফিকে পেরোবে এমন কাউকেও পাওয়ার সম্ভাবনাও নেই সহসা। সাবেক হওয়া নিউজিল্যান্ডের পেসার কাইল মিলস দ্বিতীয় সর্বোচ্চ, তার রান ৮৯৬। তৃতীয় সর্বোচ্চ পাকিস্তানের ওয়াকার ইউনুসের। এই স্পিড স্টারের রান ৮৮৮।

মাশরাফি - লেজের দিকে ব্যাটিংয়ে অনন্য !
লেজের দিকে ব্যাটিংয়ে অনন্য মাশরাফি

আরেক কিউই অল-রাউন্ডার ড্যানিয়েল ভেট্টরির রানও কাছাকাছি, ৮৬২ রান। রান করার তালিকার পঞ্চম স্থানে আছেন সাবেক ভারতীয় পেসার জহির খাঁন। তার রান ৭৬৫। সেরা পাঁচের সবাই পেসার।

এই ব্যাটিং পজিশনের কেউই নেই মাশরাফির আশেপাশে । ব্যাটিং পজিশনে সবচেয়ে বেশি বল খেলার তালিকায় এক নম্বরে আছেন ওয়াকার ইউনুস। সাবেক এই পাকিস্তানি গ্রেট খেলেছেন ১৩৫৬ বল। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ মাশরাফী খেলেছেন ১২১০ বল।

শুধু কী রান করা, মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা এগিয়ে চার আর ছক্কাতেও। শুরুতেই বাউন্ডারির হিসেব। ওয়ানডে ক্রিকেটে নয় থেকে এগারো ব্যাটিং পজিশনে মাশরাফী চার মেরেছেন ৮৬টি। মাশরাফী এখানেও অনন্য। এক মাশরাফী ছাড়া ওয়ানডে ইতিহাসে এখানে নেই কারো ৭৫ এর অধিক চার। তালিকার সেরা পাঁচের অন্যরা যথাক্রমে দুই নম্বরে ৬৮ চার মারা জহির খাঁন। সাবেক এই ভারতীয় পেসারের চার ৬৮টি।

এরপরের দুটি নাম দুই ব্ল্যাকক্যাপস ক্রিকেটারের। ৬৫ চারে তিনে কাইলস মিলস। অল-রাউন্ডার ড্যানিয়েল ভেট্টরির চার ৬১। ভারতীয় স্পিনার হারভজন সিং নয় থেকে এগারো ব্যাটিং পজিশনে চার মারার তালিকায় আছেন পাঁচ নম্বরে। ‘ভাজ্জি’ নামে খ্যাত এই বোলিং অলরাউন্ডার এই পজিশনে চার মেরেছেন ৬০টি।

 

মাশরাফি-তাসকিন এবং ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি

 

রান, চারে এক নম্বরে থাকলেও ওয়ানডে ক্রিকেটে নয় থেকে এগারো ব্যাটিং পজিশনে মাশরাফী বিন মোর্ত্তজার ছক্কা মারায় হয়েছে অবনতি। তবে খুব বেশি নয়, এক থেকে দুই। ছক্কা মারার তালিকায় সেরা কাইল মিলস।

তাসমান সাগর পাড়ের দেশ নিউজিল্যান্ডের এই পেসার ছক্কা হাঁকিয়েছেন ৩৬টি। ছয়টি ছক্কা কম হাঁকানো বাংলাদেশের মাশরাফী ৩০ ছক্কায় দ্বিতীয় স্থানে। এরপরে আরেক কিউই গতি তারকা টিম সাউদির নাম। তার ছয় ২৩টি। এক ছয় কম ভারতীয় পেসার জহির খানের।

ছক্কা মারার ট্যালিতে পঞ্চম স্থানে আরেক বাংলাদেশির নাম, তিনি আব্দুর রাজ্জাক। বাংলাদেশের সাবেক এই বাঁহাতি ছয় মেরেছেন ২১টি।

রান, চার, ছক্কায় এগিয়ে থাকলেও এই ব্যাটিং পজিশনে মাশরাফীর ব্যাট থেকে আসেনি একটা ফিফটিও। তাই ওয়ানডে ক্রিকেটে নয় থেকে এগারো ব্যাটিং পজিশনে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংসে নেই ম্যাশের নাম। সেরা পাঁচে ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্রিকেটারের জয়জয়কার। সেরা তিনের সবাই ক্যারিবিয়ান।

এক নম্বরে আছেন টি টোয়েন্টি ক্রিকেটের ফেরিওয়ালাদের একজন, তিনি আন্দ্রে রাসেল। এই মারকাটারি ব্যাটসম্যান করেছেন সর্বোচ্চ অপরাজিত ৯২ রান। ২০১১ সালে ভারতের বিপক্ষে ৯ নাম্বারে নেমে মাত্র ৬৪ বলে ৯২* রান করেন তিনি।

দুই নাম্বারে রাবি রামপল। একই বছর একই প্রতিপক্ষের বিপক্ষে এই ওয়েস্ট ইন্ডিয়ান পেসার খেলেছেন ৬৬ বলে অপরাজিত ৮৬ রানের ইনিংস।তালিকার ৩য় নামটি সাবেক ওয়েস্ট ইন্ডিজ ক্যাপ্টেন ড্যারেন সামির রয়েছে অষ্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ৫০ বলে ৮৪ রানের ইনিংস।

 

পঞ্চপান্ডবে ফাটল এবং দেশের ক্রিকেটের অস্থিতিশীল অবস্থা

 

সেরা পাঁচের অন্য দুই নাম শ্রীলঙ্কান। লংকান অল-রাউন্ডার থিসারা পেরেরার ব্যাট থেকে ২০১৪ সালে এসেছিলো ম্যাচ জেতানো ৮০*(৫৭) রান, প্রতিপক্ষ বাংলাদেশ, ব্যাটিং পজিশন ৯ নাম্বার। নয় থেকে এগারো ব্যাটিং পজিশনে সর্বোচ্চ ব্যক্তিগত ইনিংসের সেরা পাঁচে ইসুরু উদানা। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ২০১৯ সালে এই পেসারের ব্যাট থেকে এসেছিল ৭৮(৫৭) রানের ইনিংস।

মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা শুধুমাত্র নয় নম্বরে নেমে করেছেন ৭০১ রান। যেটি ওয়ানডে ইতিহাসে এই পজিশনে সর্বোচ্চ রান। শুধু কী রান? চার-ছক্কাতেও এগিয়ে মাশরাফী। এই নয় নম্বর ব্যাটিং পজিশনে মেরেছেন ৬৫ চার। যা ওয়ানডে ইতিহাসের সর্বোচ্চ।

হাঁকিয়েছেন ১৮টি ছক্কা। এখানে অবশ্য বাংলাদেশের সাবেক এই অধিনায়কের অবস্থান তৃতীয়তে। ২২ ছক্কায় সবার চেয়ে এগিয়ে কাইল মিলস। সাবেক ওয়েস্ট ইন্ডিজ কাপ্তান ড্যারেন সামি হাঁকিয়েছেন ১৯ ছয়।

দুই দশকের ক্যারিয়ার। অথচ ম্যাচ খেলেছেন অনেক কম। গোটা ক্যারিয়ারে ইনজুরি হানা দিয়েছিলো অনেক বার, তাই মিস করেছেন প্রায় ১২০ এর মতো ওয়ানডে।

মাশরাফীর টেস্ট ক্যারিয়ার ৩৬, ওয়ানডে ২২০ আর আন্তর্জাতিক টি-টুয়েন্টি ক্যারিয়ার থেমেছে ৫৪ ম্যাচে। উইকেট নিয়ে জিতিয়েছেন অসংখ্য ম্যাচ। ব্যাট হাতেও রেখে গেছেন অবদান।

টেস্টে ১২.৮৫ গড়ে ৭৯২ রান। ওয়ানডে ক্রিকেটে প্রায় ১৪ গড়ে ১৭৮৭ রান। যার বেশিরভাগই নিচের দিকে মানে টেলএন্ডার হিসেবে করেছেন। আন্তর্জাতিক টি-টুয়েন্টিতে ব্যাট বেশি হাসেনি করেছেন মোটে ৩৭৭ রান। গড়ও প্রায় ১৪। টেস্টে তিন আর ওয়ানডেতে পেয়েছেন একটি অর্ধশতক।

 

মাশরাফি-তাসকিন এবং ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি

 

পুরোপুরি সফল বল হাতে। তবে আরো বেশি অবদান রাখতে পারতেন ব্যাট হাতেও। হতে পারতেন এক মিনি অলরাউন্ডারও। ব্যাটের ঝলক দেখিয়েছেন কখনো সুযোগ পেলে। নিশ্চিত তা হতে পারতো আরো অনেক বেশি। তা হলে লাভ হতো বাংলাদেশের ক্রিকেটেরই।

তবে এক মাশরাফী বল হাতে যা অবদান রেখেছেন তাও বা কম কীসে? তবে ঐ যে পেসার পরিচয় ছাপিয়ে অলরাউন্ডার হওয়ার আক্ষেপ কী আছে মাশরাফীর? নাকি নিচে নেমে এমন সব রেকর্ডসে নিজের নাম দেখাতেই বেশি তৃপ্তির?

লেখকঃ ইশতিয়াক শাওন [ স্পোর্টস গুরুকুল ]

মাশরাফি – লেজের দিকে ব্যাটিংয়ে অনন্য !

মন্তব্য করুন