মোহাম্মদ ইউসুফঃ মুসলিম বিশ্বের এক ক্রিকেট রত্ন

পাকিস্তানের কিংবদন্তী ক্রিকেটারেদের মধ্যে এক অন্যতম নাম মোহাম্মদ ইউসুফ। বাল্যকাল থেকেই বিভিন্ন আর্থিক অভাব অনটনের মাধ্যমে বড় হওয়া ইউসুফ, জীবনে প্রবল কন্টকাকীর্ণ পথ অতিক্রম করে পেয়েছেন সাফল্যের সেই সোনালি পাহাড়। জীবনে যে কখনো কঠিন পথ দেখে থেমে থাকতে নেই, চলতে থাকতে হয় আপন গতিতে তারই এক উৎকৃষ্ট উদাহরণ মোহাম্মদ ইউসুফ।

মোহাম্মদ ইউসুফঃ মুসলিম বিশ্বের এক ক্রিকেট রত্ন
২০০৬ সালে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে সেঞ্চুরির পর

মোহাম্মদ ইউসুফের জন্ম পাকিস্তানের একটি পাঞ্জাবি ক্রিশ্চিয়ান পরিবারে। তার বাবা রেলওয়েতে কাজ করার কারণে পুরো পরিবারই থাকতেন রেলওয়ে কলোনিতে। আর্থিক অভাবের কারণে, ক্রিকেটীয় সরঞ্জাম না কিনতে পারায় ইউসুফ টেপ টেনিস ক্রিকেট খেলতেন নিয়মিত। ১২ বছর বয়সে গোল্ডেন জিমখানার হয়ে ক্রিকেট খেলা শুরু করেন ইউসুফ। তিনি লাহোরের ফরমান কলেজে অধ্যয়ন করেন এবং সেখানেই ১৯৯৪ সালের শুরু পর্যন্ত খেলতে থাকেন।

[ মোহাম্মদ ইউসুফঃ মুসলিম বিশ্বের এক ক্রিকেট রত্ন ]

মোহাম্মদ-ইউসুফের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয় ১৯৯৮ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে টেস্টের মাধ্যমে। আন্তর্জাতিক ওয়ানডে ক্রিকেটে তার অভিষেক হয় একই বছর জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে। মোহাম্মদ-ইউসুফ আন্তর্জাতিক ওয়ানডে ক্রিকেটে ৪০ গড়ে ৯০০০ এরও বেশি রান করেছেন। এছাড়াও, আন্তর্জাতিক টেস্ট ক্রিকেটে তিনি ৫০ উর্ধ্ব গড়ে ৭০০০ এরও বেশি রান করেছেন।

আন্তর্জাতিক ওয়ানডে ক্রিকেটে আউট না হয়ে ধারাবাহিকভাবে নট আউট থেকে সবচেয়ে বেশি রান করার রেকর্ড আছে তার। ২০০২ এবং ২০০৩ সালে আন্তর্জাতিক ওয়ানডে ক্রিকেটে সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক ছিলেন তিনি। আন্তর্জাতিক টেস্ট ক্রিকেটে এক বর্ষ্পঞ্জিতে সবচেয়ে বেশি রান করারও রেকর্ড রয়েছে তার। ২০০৬ সালে, তিনি আন্তর্জাতিক টেস্ট ক্রিকেটে ১৭৮৮ রান করে স্যার ভিভ রিচার্ডসের এক বছরে করা সবচেয়ে বেশি টেস্ট রানের রেকর্ডটি ভাঙেন।

২০০৫ সালের জুনে খ্রিষ্টধর্ম ছেড়ে ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয় গ্রহণ করেন মোহাম্মদ-ইউসুফ। উইজডেনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে নিজের ধর্মান্তরিত হওয়ার গল্প শুনিয়েছেন মোহাম্মদ ইউসুফ। যেখানে তিনি বর্ণনা করেছেন, কীভাবে আর কাকে দেখে অনুপ্রাণিত হয়ে ইসলামধর্ম গ্রহণ করেছেন তিনি।

মূলত ইউসুফের ইসলামধর্ম গ্রহণের পেছনে গুরুত্বপূর্ণ প্রভাব রেখেছেন পাক দলের এক সময়ের সেরা ওপেনার ও ইউসুফের সতীর্থ সাঈদ আনোয়ার।

মোহাম্মদ ইউসুফঃ মুসলিম বিশ্বের এক ক্রিকেট রত্ন
শচীন টেন্ডুলকার এবং মোহাম্মদ ইউসুফ একত্রে

এ ব্যাপারে ইউসুফ বলেছেন,

‘ইসলাম গ্রহণের ক্ষেত্রে কেউ আমাকে জোরজবরদস্তি করেনি। এখানে সত্যটা হলো, আমি সাঈদ আনোয়ারের খুব ঘনিষ্ঠ বন্ধু। ক্যারিয়ারের শুরু থেকেই মাঠ এবং মাঠের বাইরে আমাদের দারুণ বন্ধুত্ব ছিল। কিশোর বয়স থেকেই আমরা একসঙ্গে অনেক ম্যাচ খেলেছি। আমি সাঈদের সঙ্গে এত সময় কাটিয়েছি যে, ওর বাবা-মা আমাকে তাদেরই ছেলে মনে করে।”

মোহাম্মদ-ইউসুফ আরো বলেন,

“‘আমি যখন ওদের বাড়িতে যেতাম, দেখতে পেতাম তারা কী সুন্দর শান্তিপূর্ণ এবং শৃঙ্খলার মধ্যে জীবন কাটাচ্ছে। এটা আমাকে সত্যিই ভাবিয়েছে। অবাক করেছে। অনুপ্রাণিত করেছে। বিষয়টি এমন নয় যে, ধর্মপ্রাণ হওয়ার পর সাঈদ আনোয়ার এমন চরিত্রের। তার আগে থেকেই আমি ওকে দেখছি। তাদের পরিবার চমৎকার ও শান্তিপূর্ণ। এরপর ঘটে যায় সেই অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা। সাঈদের মেয়ের মারা যায়।  সাঈদ আনোয়ার পুরোপুরি ধর্মের প্রতি ঝুঁকে পড়ে।বিষয়টি আমাকে আরো আবেগী করে তোলে। এটা আমার জন্য অনেক বড় অনুপ্রেরণা ছিল।  বলতে গেলে এটাই আমার ইসলামের পথে আসার প্রধাণ কারণ।”

মোহাম্মদ ইউসুফঃ মুসলিম বিশ্বের এক ক্রিকেট রত্ন
নিজের শেষ ওয়ানডে সিরিজে ইউসুফ

মোহাম্মদ-ইউসুফ আরো বলেন, ইসলাম গ্রহণের পর পরই তার খেলার ধার আরো বেড়ে যায়। এছাড়াও, পাঁচ ওয়াক্ত নামাজ যে তার জীবন বদলে দিয়েছে এ উক্তিও করেন তিনি।  ২০০৫ সালে ধর্মান্তরিত হওয়ার পরের মৌসুমে টেস্টে বিশ্বরেকর্ড গড়েন। হ্যাট্রিক সেঞ্চুরি হাঁকান। একবছরে সর্বোচ্চ ১৭৮৮ রান করে কিংবদন্তি ক্যারিবীয় ক্রিকেটার স্যার ভিভিয়ান রিচার্ডসের রেকর্ডটি ভাঙেন।

উইজডেনকে দেয়া এক সাক্ষাৎকারে ইউসুফ বলেন,

২০০৫ সালের শেষ দিকে আমি মুসলিম হয়ে যাই এবং প্রথমবারের মতো নামাজ আদায় করি। এর পর আমি দাড়ি রাখা শুরু করি এবং নিজের মধ্যে অন্যরকম শান্তি অনুভব করি, যা আমার রাস্তায় আসা সব চ্যালেঞ্জ জিততে অনুপ্রাণিত করে। আমার বিশ্বাস—ইসলামধর্ম গ্রহণ করায় ২০০৬ সালের অসাধারণ পারফরম্যান্সকে আল্লাহর কাছ থেকে বিশেষ উপহার হিসেবে পেয়েছি।”

পাকিস্তান ক্রিকেটের জীবন্ত কিংবদন্তী মোহাম্মদ-ইউসুফ। নিজের আন্তর্জাতিক টেস্ট ক্যারিয়ারে ৯০ ম্যাচে ৭৫৩০ রান করেছেন ইউসুফ। এছাড়াও, আন্তর্জাতিক ওয়ানডে ক্রিকেটে ২৮৮ ম্যাচ খেলে তার সংগ্রহ ৯৭২০ রান। বর্ণাঢ্য ক্রিকেটীয় ক্যারিয়ারে সব ফরমেট মিলিয়ে তার সেঞ্চুরির সংখ্যা ৪৩টি।

বর্তমানে পাকিস্তান জাতীয় ক্রিকেট দলের ব্যাটিং কোচ হিসেবে কাজ করছেন মোহাম্মদ ইউসুফ। তিনি ছিলেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ধারাবাহিকতার এক মূর্ত প্রতীক। একটা সময় তিনি ঠেলাগাড়িওয়ালা থেকে নাপিতের কাজও করেছেন, তবুও নিজের অদম্য শক্তি, সাহস এবং আত্মবিশ্বাসের মাধ্যমে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন ক্রিকেট কিংব্দন্তীদের কাতারে।

 

মোহাম্মদ ইউসুফঃ মুসলিম বিশ্বের এক ক্রিকেট রত্ন

 

আরও দেখুন:

“মোহাম্মদ ইউসুফঃ মুসলিম বিশ্বের এক ক্রিকেট রত্ন”-এ 1-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন