ফয়সাল থেকে সাকিব আল হাসান হয়ে ওঠা.. !!!

ফয়সাল থেকে সাকিব আল হাসান, সেই ফয়সাল যে আজ ক্রিকেটে সময়ের সেরা অলরাউন্ডার। আর পুরো বাংলাদেশের অধিকাংশ ক্রিকেটেপ্রেমীর মধ্যমণি সাকিব আল-হাসান। সাকিবের বাবা মাশরুর রেজা সাহেব মাগুরার ফুটবলার হওয়ায় তিনিও চেয়েছিলেন তার মতো সাকিব ফুটবলার হোক।

অন্তত বাংলাদেশ জাতীয় ফুটবল দলে খেলুক। সাকিব আল হাসানের ছোটবেলা কেটেছে ফুটবলে কিন্তু একটু বড় হওয়ার পরেই তা পরিবর্তন হয়ে যায় ক্রিকেটে। তবে ফুটবল প্রেম এখনো আছে সাকিব-আল হাসানের। জাতীয় দলের অনুশীলনে সবসময় ফুটবল নিয়ে নানান কসরত তো এখনো করেন।

 

ফয়সাল থেকে সাকিব আল হাসান হয়ে ওঠা, মাগুরায় ১৯৮৭ সালের ২৪ মার্চ, কৃষি ব্যাংক কর্মকর্তা মাশরুর রেজা আর গৃহিণী শিরিন শারমিনের প্রথম ও একমাত্র ছেলে সন্তান হয়ে জন্ম ফয়সালের। প্রশ্ন জাগতে পারে কোন ফয়সাল? প্রশ্ন জাগারই কথা। আজকের সাকিব আল হাসানের ডাক নাম যে ফয়সাল।

 

 

সাকিব আল হাসান
সাকিব আল হাসান

ছোটবেলা সবাই কমবেশি দুষ্টুমিতে মেতে থাকে। কিন্তু সাকিব ছিলেন একদম শান্তশিষ্ট স্বভাবের। যার ধ্যানজ্ঞান ছিল ক্রিকেট আর পড়ালেখা। আর সবকিছুতে প্রথম হতে চাইতেন ফয়সাল। কে জানে? হয়তো সেই অভ্যাসের কারণেই এখনো শুধুই প্রথম কিংবা সেরা পারফর্মার হতে চান সাকিব-আল হাসান।

পাড়ার ক্রিকেটে খুব ভাল খেলতেন সাকিব-আল হাসান, পুরাদস্তুর অলরাউন্ডার। পাড়ায় সাকিব একাধারে সেরা বোলার, সেরা ব্যাটসম্যান! ভাল খেলার কল্যাণে খ্যাপ খেলে বেড়াতেন এ পাড়া থেকে ও পাড়া। নিজের এলাকা আলোকদিয়া থেকে বাসের ছাদে চড়ে যেতেন এখানে সেখান যেতেন।

একদিন চোখে পড়ে যান কোচ সাদ্দাম হোসেন গোর্কি এর। গোর্কি একটা ম্যাচে আম্পায়ার ছিলেন, খেলা দেখে গোর্কি তার ইসলামপুরপাড়া স্পোর্টিং ক্লাবে খেলার প্রস্তাব দেন সাকিব-আল হাসানকে। সেবার টেপ টেনিস ছেড়ে প্রথমবার ক্রিকেট বলে খেলেন সাকিব। পেস বোলিং করতেন! নেহাৎ মন্দ না। তবে স্পিন আরো ভাল করতেন সাকিব। গোর্কি বললেন “তুমি স্পিন বলই করো।” স্পিনই করা শুরু করলেন সাকিব। এর কিছুদিন পরেই মাগুরা লীগে অভিষেক ঘটে; প্রথম বলেই উইকেট পান সাকিব।

এভাবে চলল কিছুদিন! এরপরে বিকেএসপিতে ডাক পাওয়া সাকিব আল হাসানের। বাবা মায়ের বাধ্য সাকিব ঢাকায় যাবে কিনা তা নিয়েও ছিলেন সন্দিহান! পরে বাবা পাঠালেন বিকেএসপিতে। সেই বাবা যে কিনা সাকিব-আল হাসানের ব্যাট ভেঙ্গে ফেলতেন তিনিই কিনে দিলেন নতুন ব্যাট, বল, প্যাড, গ্লাভস, আর দামী জুতা! বাবা আর মা আর নিজের প্রিয় মাগুরা ছেড়ে সাকিব-আল হাসান চলে আসেন বিকেএসপিতে। মাত্র ১৫ বছর বয়সেই সাকিব অনূর্ধ্ব​-১৯ দলে খেলার সুযোগ পান সাকিব আল হসান।

 

ফয়সাল থেকে সাকিব আল হাসান হয়ে ওঠা.. !!!
সাকিব আল হাসান

 

২০০৫ সালে অনূর্ধ্ব​-১৯ ত্রি-দেশীয় টুর্নামেন্টের ফাইনালে মাত্র ৮৬ বলে সেঞ্চুরি করে ও তিনটি উইকেট নিয়ে দলকে জেতাতে সহায়তা করেন তিনি। এরপরেই চলে আসেন আলোচনায়। এই টুর্নামেন্টে অপর দুটি দেশ ছিল ইংল্যান্ড ও শ্রীলঙ্কা।

২০০৫ থেকে ২০০৬ সালের মধ্যে সাকিব অনূর্ধ্ব-১৯ দলের হয়ে ১৮টি একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলেন। ব্যাটে-বলে সফল ছিলেন এই অলরাউন্ডার। এরপরে বয়সভিত্তিক নানান দলে খেলার পর সাকিব-আল হাসানের জাতীয় দলে জায়গা করে নেওয়া। এখন তো গড়ে যাচ্ছেন রেকর্ডের পর রেকর্ড।

বাংলাদেশের প্রায় সব বড় বড় অর্জনে আছে অলরাউন্ডার সাকিব-আল হাসানের অবদান। তার অর্জনে সবাই উল্লাসে মেতেছে। কী ব্যাট, কী বল সব দিক দিয়ে তার কাছেই বাংলাদেশীদের প্রত্যাশা সবচেয়ে বেশি। সবার সেই রান, উইকেট আর জয়ের ক্ষুধা সাকিব মিটিয়ে যাচ্ছেন ২০০৬ সাল থেকে।

সাকিব এসে বাংলাদেশ থেকে পরিচয় করে দেয় বিশ্বসেরা শব্দের সাথে! সাকিব মানেই বিশ্বসেরা; আর বিশ্বসেরা সাকিবের নামের পাশে থাকে বাংলাদেশ। যে বিশ্বাস সাহস জোগায় যে বাংলাদেশও যেকোনো দলকে হারাতে পারে। বহুবছর ধরে টেনে নিচ্ছেন দেশকে। সাকিব আল হাসান বাংলাদেশ জিতিয়েছেন অনেক ম্যাচ, সিরিজ।

সাকিব আল হাসান
সাকিব আল হাসান

সাকিব ছিলেন গত দশকের সেরা অলরাউন্ডার। তার ধারেকাছেও ছিলেন না কেউ। শুধু গেলো এক দশেকে টেস্টে ৪২ ম্যাচে ৪২ গড়ে রান করেছেন ৩১৪৭। দশকে টেস্টে সাকিবের চেয়ে বেশি রান করেছেন ৩৬ জন ব্যাটসম্যান, এর মধ্যে মাত্র একজন সাকিবের চেয়ে কম টেস্ট খেলেছেন। তাও ব্যবধান এক টেস্ট ও রান ব্যবধান ৫১। বাকী ৩৫ জনের সবাই সাকিবের চেয়ে বেশি টেস্ট খেলেছেন। সাকিবের চেয়ে বেশি গড় ২৩ জনের, ১২ জনের ব্যাটিং গড় সাকিবের চেয়ে কম।

বল হাতে সাকিব ৪২ টেস্টে নিয়েছেন ১৬২ উইকেট। এই দশকে সাকিবের চেয়ে বেশি উইকেট নিয়েছেন ২৩ জন বোলার। অলরাউন্ডারদের মধ্যে গেলো দশকে টেস্টে ১৫০০ রান ও ১০০ উইকেট নেওয়া ক্রিকেটার সাকিব ছাড়া আর আটজন। কিন্তু ৩০০০ রান ও ১৫০ উইকেট নেওয়া একমাত্র অলরাউন্ডার বাংলাদেশের সাকিব। ওয়ানডে অলরাউন্ডারদের মধ্যে এই দশকে ২০০ রান ও ৫০ উইকেটের ডাবল পূর্ণ করেছেন মাত্র ১৫ জন। ২০০০ রানের সঙ্গে উইকেট সংখ্যা বাড়িয়ে ১০০ করা হলে সে কীর্তি মাত্র ৫ জন অলরাউন্ডারের। এই দশকে ৩০০০ রান ও ১৫০ উইকেট নেওয়া একমাত্র অলরাউন্ডার সাকিব।

অলরাউন্ডারদের মধ্যে  দশকে আন্তর্জাতিক টি২০ ক্রিকেটে ১০০০ রান ও ৫০ উইকেট রয়েছে মাত্র চারজনের। সেখানে রান ও উইকেটের বিচারে সাকিব ঢের এগিয়ে। সাকিব তুলনামূলক ম্যাচও খেলেছেন কম।ক্রিকেটের তিন ফরম্যাট মিলিয়ে গেলো দশকে সাকিব আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ২৩৮ ম্যাচে ৩৭ গড়ে রান করেছেন ৮৮৬১। তারচেয়ে বেশি রান ২০ জন ব্যাটসম্যান। আর বোলার সাকিব ২৩৮ ম্যাচে ২৯ গড়ে উইকেট নিয়েছেন ৪১৮টি। সাকিবের চেয়ে এসময়ে বেশি উইকেট ছিল ৯ জন বোলারের।

গেলো দশকে ব্যাটে বলে অলরাউন্ডার সাকিবের একচ্ছত্র আধিপত্য। তার রান আর উইকেটের অর্ধেকেরও কম ৪০০০ রান ও ২০০ উইকেটের ডাবল পূর্ণ করতে পেরেছেন আর মাত্র তিনজন অলরাউন্ডার। যেখানে সাকিব সবার ধরা ছোঁয়ার বাইরে। সাকিব এই দশকের একমাত্র অলরাউন্ডার যিনি ব্যাট হাতে ৪০০০ রান ও বল হাতে ৩০০ উইকেট পেয়েছেন। তবুও বিভিন্ন সময়ে আমাদের ক্রিকেটের পোস্টার বয়, সবচেয়ে নন্দিত ক্রিকেটার নিন্দিত হয়েছেন কখনো কখনো। তবে সব বিতর্ক পাশ কাটিয়ে সাকিব আল-হাসান ফিরেছেন এবং পারফর্মও করছেন নিয়মিত। হচ্ছেন সেরা ক্রিকেটারও।

 

ফয়সাল থেকে সাকিব আল হাসান হয়ে ওঠা.. !!!
সাকিব আল হাসান

 

আরও পড়ুন:

মন্তব্য করুন