দ্য সুপারম্যান মিস্টার থ্রি সিক্সটি ডিগ্রি !!!

দ্য সুপারম্যান মিস্টার থ্রি সিক্সটি ডিগ্রি !

সময়টা ১৮ই জানুয়ারি, ২০১৫। জোহান্সবার্গে চলছে দক্ষিণ আফ্রিকা বনাম ওয়েস্ট ইন্ডিজের দ্বিতীয় ম্যাচ। ৪৬ তম ওভারের চতুর্থ বলটি করতে দৌড় শুরু করেছেন জেসন হোল্ডার। অপর পাশে ব্যাট হাতে প্রস্তুত ৩০ বলে ৯৮ রানে অপরাজিত থাকা এবিডি ভিলিয়ার্স। পপিং ক্রিজ পার হয়ে বলটি ছুড়লেন হোল্ডার।

ব্যাটের নিপুণ ছোঁয়ায় লং লেগ অঞ্চলে উড়িয়ে দিলেন এবি এবং অসাধারণ একটি ছক্কা। চিরচেনা হাসিমুখে অপর পাশে থাকা হাশিম আমলাকে গিয়ে জড়িয়ে ধরলেন তিনি। পুরো গ্যালারিতে সরব চিৎকার, ড্রেসিংরুমের সবাই দাঁড়িয়ে তালি দিতে লাগলেন। ৩১ বলে সেঞ্চুরি করে দ্রুততম সেঞ্চুরির রেকর্ড গড়লেন এবি ডি ভিলিয়ার্স।

দ্য সুপারম্যান মিস্টার থ্রি সিক্সটি ডিগ্রি
সুপারম্যান মিস্টার থ্রি সিক্সটি ডিগ্রি -এবি ডি ভিলিয়ার্স

এখানেই শেষ নয়। এটি মাত্র ছোট্ট একটি অংশ। এবিডির ক্রিকেট ইতিহাসে আছে হাজারো রেকর্ডের সমাহার। ওয়ানডে ক্রিকেটে শুধু দ্রুততম ১০০ নয়। দ্রুততম ৫০, ১০০, ১৫০ রান করার তিনটি রেকর্ডই এই মিস্টার ৩৬০° এর দখলে।৩১ বলে দ্রুততম সেঞ্চুরি করার আগে সেই ম্যাচেই ১৬ বলে ৫০ করে ভেঙেছেন সনাথ য়াসুরিয়ার ১৭ বলে দ্রুততম ৫০ করার রেকর্ড। প্রিয় প্রতিপক্ষ যেখানে ওয়েস্ট ইন্ডিজ সেখানে দ্রুততম ফিফটি ও সেঞ্চুরি করেই থেমে যাননি তিনি। একই প্রতিপক্ষের বিপক্ষে ৬৪ বলে ১৫০ করে ৩৯ দিনের ব্যবধানে তিনটি দ্রুততম রেকর্ডই নিজের করে নেন এই প্রোটিয়ান লিজেন্ড।

১৯৮৪ সালের ১৭ই ফেব্রুয়ারী দক্ষিণ আফ্রিকার প্রেটোরিয়াতে জন্মগ্রহণ করা আব্রাহাম বেঞ্জামিন ডি ভিলিয়ার্স এর দ্রুততম ওয়ানডে ইনিংস ও মন্থরতম টেস্ট ইনিংসের পার্থক্য দেখে আসা যাক। ওয়ানডেতে দ্রুততম ফিফটি ও সেঞ্চুরি করার ম্যাচে তিনি খেলেছিলেন ৩৩৮.৬৩ স্ট্রাইকরেটে ৪৪ বলে ১৪৯ রানের ইনিংস এবং ২০১৫ সালেই দলের প্রয়োজনে ভারতের বিপক্ষে টেস্ট ম্যাচে ১৪.৪৮ গড়ে খেলেছিলেন ২৯৭ বলে ৪৩ রানের ইনিংস। অর্থাৎ দুটো স্ট্রাইকরেটের মধ্যে পার্থক্য ৩২৪.১৫!

এবি ডি ভিলিয়ার্স এমন একজন ক্রিকেটার যিনি তার ক্যারিয়ারে ব্যাট করেছেন ১ থেকে ৮ নম্বর পর্যন্ত সকল পজিশনেই। যার মধ্যে ১ থেকে ৬ নম্বর পজিশনে নেমে প্রতিটি আলাদা আলাদা পজিশনেই করেছেন ১০০০+ রান। ব্যাটিং পজিশন এত বেশি পরিবর্তন হবার পরেও টেস্ট ও ওয়ানডে উভয় ফরম্যাটেই ৫০+ গড়ে ৫০০০ এর অধিক রান করা ক্রিকেটারদের একজন তিনি। তার সাথে রেকর্ডটির সঙ্গী বিরাট কোহলি।

২০০৪ সালের ১৭ ডিসেম্বর ডেল স্টেইনের সাথে টেস্ট ক্যাপ পাওয়া এবিডি তার টেস্ট ক্যারিয়ারে ১১৪ ম্যাচে ৫০.৬৬ গড়ে করেছেন ৮৭৬৫ রান। ২২ সেঞ্চুরি ও ৪৬ হাফ সেঞ্চুরির পাশাপাশি ৫৪.৫১ স্ট্রাইরেটে সর্বোচ্চ রান ২৭৮*।ইতিহাসের একমাত্র উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান হিসেবে ২০১৩ সালে পাকিস্তানের বিপক্ষে দশটি ডিসমিশালের পর ব্যাট হাতে করেছেন সেঞ্চুরি। ২০১৮ সালের ৩০ মার্চ অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে সাদা পোশাক কে বিদায় জানান তিনি।

মিস্টার ৩৬০° একজন ভাল ফিনিশারও বটে। যার প্রমাণ মেলে এই রেকর্ড বুকে। ওয়ানডে ক্রিকেটে ২৫ ওভারের পর ব্যাট করতে নেমে ৫টি সেঞ্চুরি করেছেন তিনি। যার ধারেকাছে কেও নেই। দুটো করে সেঞ্চুরি আছে বিরাট কোহলি ও জস বাটলারের। এছাড়াও ৪ কিংবা তার নিচের পজিশনে ব্যাট করে ২১ সেঞ্চুরির মালিক এবিডি, যা এখনো ছুয়ে দেখেননি কেও!

২০০৫ সালের ২ ফেব্রুয়ারী ওয়ানডে ক্যাপ পাওয়া এই প্রোটিয়া ব্যাটসম্যান ২২৮ ম্যাচে ১০১.০৯ স্ট্রাইকরেটে করেছেন ৯৫৭৭ রান। ৫৩.৫০ গড়ে ২৫টি সেঞ্চুরি ও ৫৩টি হাফ-সেঞ্চুরির মালিকও তিনি। ৯০০০+ রান করেও ১০০+ স্ট্রাইকরেটে ব্যাট করা একমাত্র ক্রিকেটার তিনিই।৮০০০+ রান করে সর্বোচ্চ স্ট্রাইক রেটে তার উপরে আছে শুধুমাত্র শহীদ আফ্রিদি ও বীরেন্দর শেওয়াগ। ২০১৮ সালের ১৬ ফেব্রুয়ারী চাহালের বলে বোল্ড হয়ে ওয়ানডেতে শেষ বার মাঠ ছাড়েন। এরপর ক্যারিয়ারের ইতি টানেন ক্রিকেটের এই ৩৬০°।

এবিডি তার ক্যারিয়ারে নার্ভাস নাইন্টিজ এ আউট হয়েছেন ১৪ বার। ২৪৪ ম্যাচ বেশি খেলে ২৮ বার ৯০ এর ঘরে আউট হয়ে তার উপরে আছেন শুধুমাত্র শচীন টেন্ডুলকার। এছাড়াও একটি ম্যাচে ১১ ক্যাচ নিয়ে সর্বোচ্চ ক্যাচ এবং সর্বোচ্চ ডিসমিশালের মালিকও তিনি।

২০০৬ সালের ২৪ ফেব্রুয়ারী দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে ২০তম টি-টোয়েন্টি ক্যাপ পাওয়া আব্রাহাম বেঞ্জামিন ৭৮ ম্যাচে ২৬.১২ গড়ে করেছেন ১৬৭২ রান। ১০টি অর্ধ-শতকে ১৩৫.১৬ স্ট্রাইকরেটে সর্বোচ্চ রান ৭৯*। এছাড়াও সকল ধরণের টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ৩৩২ ম্যাচে ৩৭.৭২ গড়ে করেছেন ৯৩১৮ রান। ৬৯ টি ফিফটি ও ৪ সেঞ্চুরিতে ঈর্ষণীয় স্ট্রাইক রেট ১৫০.৪৮!

টেস্ট ক্রিকেটে দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে টানা ৯৮ টি ম্যাচ খেলেছেন তিনি। যা বিশ্ব ক্রিকেটের ইতিহাসে ৬ষ্ঠ সর্বোচ্চ। আর এমন রেকর্ডের সঙ্গী হবেনই না কেন। যে ক্রিকেটার অভিষেকের পর টানা ৮৪ ইনিংসে ০ রানে আউট হননি এবং পরপর ৩ ক্যালেন্ডার ইয়ারে টানা ১২ ম্যাচে ফিফটি করেছেন, তার রেকর্ড বুকে এমন পরিসংখ্যান কোন ঘটনাই না।

ক্রিকেটের এই সুপারম্যান দক্ষিণ আফ্রিকার জার্সি গায়ে ১৪ বছরের ক্যারিয়ারে খেলেছেন ৪২০ টি ম্যাচ। ৪৮.১১ গড়ে ২০০১৪ রানের মালিক এই মিস্টার থ্রি সিক্সটি ডিগ্রী। ৭৪.৭১ স্ট্রাইকরেটে তার ক্যারিয়ারে আছে ১০৯ টি ফিফটি ও ৪৭ টি সেঞ্চুরি। বল হাতেও নিয়েছেন ৯ উইকেট। ফিল্ডিংয়ে ৪৬৩ ক্যাচের পাশাপাশি আছে ১৭টি স্ট্যাম্পিংও।

আফ্রিকান বয়েজ হাই স্কুল থেকে জীবন শুরু হওয়া আব্রাহাম বেঞ্জামিন ডি ভিলিয়ার্স বাস্তব জীবনে বড় একজন অলরাউন্ডার। স্কুল জীবনে ন্যাশনাল সাইন্স কম্পিটিশনে প্রথম হয়ে গোল্ড মেডেল পেয়েছিলেন নেলসন ম্যান্ডেলার হাত থেকে।দক্ষিণ আফ্রিকার জুনিয়র হকি দলের ক্যাম্পেও ডাক পেয়েছিলেন তিনি, পেয়েছেন সাতার প্রতিযোগিতায় পুরষ্কার। স্কুল ব্যাডমিন্টনের চ্যাম্পিয়ন এই প্লেয়ার বাবার পছন্দের রাগবীতেও ছিলেন পারদর্শী। বাড়ি থেকে দূরে যেতে না চাওয়ায় সুযোগ পাওয়া সত্ত্বেও ছেড়েছেন টেনিসের বড় এক সুযোগ। অবসরের সঙ্গী হিসেবে এখনো খেলেন গলফ।

এবি ডি ভিলিয়ার্স জাতীয় দলের জার্সি তুলে রেখেছেন তিন বছর হলো। আজও ক্রিকেটপ্রেমীরা আফ্রিকার প্লেইং ইলিভেনে খুজে বেড়ান তার নাম। প্রতিটা মুহুর্তে স্মরণ করেন ক্রিকেটের এই সুপারম্যানকে। যিনি ক্রিকেট বলকে মাঠের যেকোনো প্রান্তে পাঠানোর সক্ষমতা রাখেন। পারেন ফিল্ডিং গ্রাউন্ডে বাজপাখি মতো উড়তে। ১৪ বছরের ক্যারিয়ারে দেখিয়েছেন নানা কীর্তি। এত সকল কীর্তি ঘটিয়ে আনন্দ দেওয়া এবিডিকে আজীবন মনে রাখবে ক্রিকেট বিশ্ব।

লেখকঃ মুগ্ধ সাহা

[ স্পোর্টস গুরুকুল]

দ্য সুপারম্যান মিস্টার থ্রি সিক্সটি ডিগ্রি !!!

আরও পড়ুন:

মন্তব্য করুন