ক্রিকেটে অনন্য যে ত্রয়ী !!!

ক্রিকেটে অনন্য যে ত্রয়ী !!!

ক্রিকেটের যাত্রা শুরু হয় প্রায় দেড়শ বছর আগে টেস্ট ক্রিকেটের মাধ্যমে। ওয়ানডে ক্রিকেটের যাত্রা শুরু হয় ৫০ বছর আগে ১৯৭১ সালে। আর প্রথম ওয়ানডে বিশ্বকাপ হয় ১৯৭৫ সালে। পেশাদার ক্রিকেট খেলা সবারই স্বপ্ন থাকে দেশের জার্সিতে বিশ্বকাপ খেলা, বিশ্বকাপ জেতা। অনেকেই সেই স্বপ্ন পূরণ করতে পারেন, অনেকেই আবার একাধিকবার এমনটি করতে পেরেছেন, আবার অনেকেই পারেন না। অনেক রথী-মহারথী আছেন যারা আফসোসই করে গেছেন।

যেমন নিজদের ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপে এসে শচীন, ইমরান খাঁনরা পেরেছেন। ক্লাইভ লয়েড, ভিভ রিচার্ডস, স্টিভ ওয়াহ কিংবা মাইকেল ক্লার্করা দুই বার করে পেরেছেন। আবার ৯২ তে কিউই গ্রেট মার্টিন ক্রো পারতে পারতেও পারলেন না, ভাগ্যের কাছেই হার মানলেন। ব্রায়ান লারা, মাহেলা জয়াবর্ধানে, সৌরভ গাঙ্গুলী, রাহুল দ্রাবিড়, কুমার সাঙ্গাকারা, জ্যাক ক্যালিসদের মতো গ্রেটদের স্পর্শ করা হয়নি বিশ্বকাপ শিরোপা।

মুদ্রা ওপিঠে আবার ক্রিকেট ইতিহাসে মাত্র তিনজন ব্যক্তি আছেন এই কাজটি এক বার নয়, দুই বার নয়, তিন বার করে করেছেন এবং তারা তিন বারই একই সাথে ৩ টি বিশ্বকাপ জিতেছেন। এই তিনজন হলেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যানের একজন, বলা যায় ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বকালের সেরা অধিনায়কদের একজন তর্ক সাপেক্ষে সর্বকালের সেরা অধিনায়ক রিকি থমাস পন্টিং।

আরেকজন সর্বকালের অন্যতম সেরা উইকেট রক্ষক ব্যাটসম্যান এবং অস্ট্রেলিয়ার ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা ব্যাটসম্যান অ্যাডাম গিলক্রিস্ট। আর বাকি নামটা সর্বকালের অন্যতম সেরা পেস বোলার, অস্ট্রেলিয়ার হয়ে সর্বোচ্চ উইকেট শিকারী পেসার গ্ল্যান ম্যাকগ্রা।

রিকি পন্টিং
রিকি পন্টিং

এই তিনজনই একসাথে জিতেছেন ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ১৯৯৯ বিশ্বকাপ। দক্ষিণ আফ্রিকায় – কেনিয়া এবং জিম্বাবুয়েতে অনুষ্ঠিত ২০০৩ বিশ্বকাপ আর ওয়েস্ট ইন্ডিজে অনুষ্ঠিত ২০০৭ বিশ্বকাপ। তারা একসাথে খেলেছেনও এই তিন বিশ্বকাপ।

যেখানে ১৯৯৯ বিশ্বকাপ ছিলো প্রথম বিশ্বকাপ যেখানে এই ত্রয়ী একই সাথে স্কোয়াডে ছিলো এবং মাঠে নেমেছিলেন। কারণ এই বিশ্বকাপটি গিলক্রিস্টের ক্যারিয়ারের প্রথম বিশ্বকাপ। ওই বিশ্বকাপটি ম্যাকগ্রা এবং পন্টিং এর জন্য দ্বিতীয় বিশ্বকাপ। তারা এর আগে ১৯৯৬ বিশ্বকাপে জাতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন।

আর ২০০৭ বিশ্বকাপ ছিলো ম্যাকগ্রা এবং গিলক্রিস্ট এর শেষ বিশ্বকাপ। বিশ্বকাপ দিয়ে ক্রিকেটকেই তিনি জানান দ্য পিজিওন খ্যাত গ্ল্যান ম্যাকগ্রা। তবে গিলক্রিস্ট আরো এক বছর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট খেলেছেন। আর রিকি পন্টিং নিজের শেষ বিশ্বকাপ খেলেছেন ২০১১ উপমহাদেশের মাটিতে। তবে ক্রিকেট ছেড়েছেন আরো বছর দুয়েক।

 

ক্রিকেট

 

রিকি পন্টিং [ ক্রিকেটে অনন্য যে ত্রয়ী ]  :

বিশ্বকাপ জেতা যেখানে প্রতিটি ক্রিকেটারেরই স্বপ্ন, সেখানে তিন বার বিশ্বকাপ জয়ের অনুভূতি সত্যিই অন্যরকম। আর তার দুটিই যদি হয় অধিনায়ক হিসেবে তাহলে এই অর্জন এর শ্রেষ্ঠত্ব পরিমাপ করতে অনেক ভারী বিশেষন প্রয়োজন।

বাকী দুজনের সাথে খেলা প্রথম বিশ্বকাপ ১৯৯৯ বিশ্বকাপে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাটসম্যান হয়ে উঠলেও ক্যাপ্টেন কিংবা ভাইস ক্যাপ্টেন কোনোটাই ছিলেন না। ২০০৩ বিশ্বকাপে প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন দলকে সামনে থেকে নেতৃত্ব দিয়ে। অর্থাৎ অধিনায়ক হিসেবে পথচলা ২০০৩ সালে শুরু। প্রথম বারেই বাজিমাৎ।

অজিদের জেতান ব্যাক টু ব্যাক ২য় শিরোপা, নিজেদের ইতিহাসের ৩য় শিরোপা, নিজের ২য় শিরোপা আর অধিনায়ক হিসেবে ১ম শিরপো। সেবার হয়েছেন অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন। একই কীর্তি ২০০৭ বিশ্বকাপেও। আবারও অপরাজিত প্যান্টার এর অষ্ট্রেলিয়া। অধিনায়ক হিসেবে দ্বিতীয় শিরোপা, প্রথম দল হিসেবে অজিদের হ্যাট্রিক শিরোপা, ব্যক্তিগত ভাবে নিজের তৃতীয় শিরোপা।

এই ত্রয়ীর এক সাথে খেলা তিনটি বিশ্বকাপের প্রথমটি ছিলো ৯৯ এর ইংল্যান্ড বিশ্বকাপ। সেবার যথেষ্ট ধারাবাহিক ছিলেন তিনি। ১০ ম্যাচে ১০ ইনিংসে প্রায় ৪০ গড়ে করেন ৩৫৪ রান। ফিফটি করেছেন একটি, নেই কোনো সেঞ্চুরি। তবে প্রতিটি ম্যাচেই রান করে গিয়েছেন এই ব্যাটসম্যান।

২০০৩ সালে আরো পরিনত হয়েছেন, অধিনায়ক এর দায়িত্ব পেয়েছেন, ব্যাটেও বেড়েছে রান। বড় অবদান রেখেছেন বিশ্বকাপ জয়ে। ফাইনালে হয়েছেন ম্যান অব দ্য ম্যাচ। ১১ ম্যাচে ১০ ইনিংসে ৫১.৮৭ গড়ে করেন ৪১৫ রান। যেটি টুর্নামেন্টে ৩য় সর্বোচ্চ রান৷ ফিফটি ১ টি, সেঞ্চুরি ২ টি আর ফাইনালে খেলেন ১২১ বলে ১৪০ রানের মহা বিস্ফোরক এক ইনিংস। টুর্নামেন্টে স্ট্রাইক রেটও ছিলো ৮৭.৯২।

২০০৭ বিশ্বকাপেও হয়েছেন ৩য় সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক। ব্যাট হাতে আগের বারের চাইতে ইনিংস কমেছে তবে ব্যাট হাতে রান, স্ট্রাইক রেট এবং গড় সবই ঠিকই বেড়েছে। ১১ ম্যাচে ৯ ইনিংসে করেন ৫৩৯ রান। গড় ৬৭.৩৭। ফিফটি করেছেন ৪ টি, সেঞ্চুরি করেন ১ টি, সর্বোচ্চ ১১৩।

স্ট্রাইক রেট ৯৫.৩৯। অধিনায়ক হিসেবে আবারো পেয়েছেন বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ এবং ক্রিকেটার হিসেবে ৩য় বিশ্বকাপ। বিশ্বকাপ জিতে তিনটি বিশ্বকাপ জয়ের বিরল কীর্তি গড়েন যৌথ ভাবে গিলক্রিস্ট এবং ম্যাকগ্রার সাথে।

অ্যাডাম গিলক্রিস্ট  [ ক্রিকেটে অনন্য যে ত্রয়ী ] :

 

ক্রিকেটে অনন্য যে ত্রয়ী !!!
অ্যাডাম গিলক্রিস্ট

 

গিলক্রিস্টই ইতিহাসের একমাত্র ক্রিকেটার যিনি ৩ টি বিশ্বকাপ খেলার পরেও জানেন না বিশ্বকাপ চ্যাম্পিয়ন না হওয়ার বা সাফল্য না পাওয়ার অনূভুতি কেমন হতে পারে। ৩ বারে মিলে ম্যাফ হেরেছেন মাত্র ১ টি। সেটিও ৯৯ তে গ্রুপ পর্বে। তিন বারের সব বারই শিরোপা জিতেছেন তিনি। দুইবার অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হয়েছে দল।

১৯৯৯ তে ছিলেন দলে একেবারেই নতুন এক ক্রিকেটার৷ ব্যাট হাতে একেবারেই খারাপ সময় পার করেছিলেন প্রথম বিশ্বকাপে। ১০ ম্যাচের ১০ টি তে ইনিংস ওপেন করা এই ওপেনার করেন ২২৪ রান। ফিফটি করেছেন ২ টি। সর্বোচ্চ ৬৩ রান। গড় ২২.৪০৷ স্ট্রাইক রেট ৭৮.৮৭। তবে উইকেটে পেছনে ছিলেন বেশ সফল। ১০ ম্যাচে ১৪ ডিসমিশাল। ১২ ক্যাচ আর ২ স্ট্যাম্পিং।

২০০৩ সালে নামে প্রতি সুবিচার করেছেন ভালো ভাবেই। হয়েছেন টুর্নামেন্টের চর্তুথ সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক। ফাইনালে আউট হওয়া পর্যন্তও ছিলেন দলের হয়ে টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ রানে মালিক। ১০ ম্যাচে ১০ ইনিংসে করেন ৪০৮ রান। গড় ৪০.৮।

স্ট্রাইক রেট ছিলো চোখে পড়ার মতো প্রায় ১০৬। ফিফটি করেছেন ৪ টি। সর্বোচ্চ ৯৯। সেবার টুর্নামেন্টে গ্লাভস হাতেও সেরা ছিলেন তিনি। ১০ ইনিংস ২১ ডিসমিশাল। যা টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ। এক ম্যাচে নিয়েছেন ৬ টি ক্যাচ।

২০০৭ বিশ্বকাপে ফাইনালটা আজীবন স্মরণ রাখবে ক্রিকেট বিশ্ব। মাত্র ১০৪ বলে ১৪৯ রানে টর্নেডো এক ইনিংস খেলেন ফাইনালে। এছাড়া দলের হয়ে ৩য় সর্বোচ্চ রান। সেবার মোট ১১ ইনিংসে করেন ৪৫৩ রান। দুই ফিফটি আর এক সেঞ্চুরি। গড় ৪৫.৩। ১২ ক্যাচ আর ৫ স্ট্যাম্পিং নিয়ে এবারও সর্বোচ্চ ডিসমিশালের মালিক গিলি। এরপর আর বিশ্বকাপ খেলেননি তিনি। এই বিশ্বকাপ জিতে তিনটি বিশ্বকাপ জয়ের বিরল কীর্তি গড়েন যৌথ ভাবে পন্টিং এবং ম্যাকগ্রার সাথে।

গ্ল্যান ম্যাকগ্রা  [ ক্রিকেটে অনন্য যে ত্রয়ী ] :

 

ক্রিকেট
গ্ল্যান ম্যাকগ্রা

 

বাকী দুজনের সাথে ম্যাকগ্রারও ১৯৯৯ বিশ্বকাপ প্রথম। ১৯৯৬ বিশ্বকাপ খেললেও দল রানার্স আপ হয়। তাই ১৯৯৯ তে এসে দলকে করেন চ্যাম্পিয়ন। যেখানে অনেক বড় অবদান রাখেন তিনি। ১০ ইনিংস বল করে মাত্র ৩.৮৩ ইকোনমিতে শিকার করেন ১৮ উইকেট। যেখানে বোলিং গড় ২০.৩৮। ইনিংসে পাঁচ উইকেট নিয়েছেন একবার। সেরা বোলিং ফিগার ৫/১৪।

২০০৩ বিশ্বকাপে দলের চ্যাম্পিয়ন হওয়ায় অনেক বড় অবদান রাখেন এই পেসার। । ১১ ইনিংস বল করে শিকার করেন ২১ উইকেট। বোলিং গড় মাত্র ১৪.৭৬ আর ইকোনমি ৩.৫৬। নামিবিয়ার বিপক্ষে শিকার করেছেন ৭ উইকেট, বিনিময়ে খরচ করেছেন মাত্র ১৫ রান । যা বিশ্বকাপ ইতিহাসে এক ম্যাচে সেরা বোলিং ফিগার।

২০০৭ বিশ্বকাপে ম্যান অব দ্য টুর্নামেন্টের পুরষ্কারই জানান দেয় বল হাতে তার অবদান ৷ শিকার করেন টুর্নামেন্টে সর্বোচ্চ ২৬ উইকেট। যা ২০১৯ বিশ্বকাপ পর্যন্ত তালিকার এক নাম্বারে ছিলো। নেই কোনো ইনিংসে চার কিংবা পাঁচ উইকেট। তবুও ১১ ইনিংস শেষে ২৬ উইকেট। এর থেকেই প্রমানিত হয় কতটুকু ধারাবাহিক ছিলেন তিনি। সেরা বোলিং ৩/১৪, গড় ১৩.৭৩, ইকোনমি ৪.৪১। এই বিশ্বকাপের ফাইনাল দিয়ে ক্রিকেট কে বিদায় জানান এই গ্রেট ক্রিকেটার।

লেখকঃ ইশতিয়াক শাওন, ক্রীড়া গুরুকুল

আরও পড়ুন:

 

মন্তব্য করুন