দেশপ্রেম, একাগ্রতা, দৃঢ়তা ও আক্ষেপের এশিয়া কাপ ২০১৮

দেশপ্রেম, একাগ্রতা, দৃঢ়তা ও আক্ষেপের এশিয়া কাপ ২০১৮ !!!

ক্রিকেট বাঙালির রক্তের সাথে সম্পর্কিত। ১৯৭১ সালে রকিবুল হাসানের ক্রিকেট মাঠে ‘জয় বাংলা’ স্টিকার ব্যাটে লাগিয়ে যাত্রা শুরু। যুদ্ধের সময় আঙুল হারানো গেরিলা মুক্তিযোদ্ধা শহীদ জুয়েল তার বোনকে বলেছিলেন, ‘আঙুলগুলো ঠিক না হলে দেশ স্বাধীন হবার পর ক্রিকেট খেলব কি করে, বল তো!’

একটা সময় দেশ স্বাধীন হয়েছে। শুরু হয়েছে বাংলাদেশ ক্রিকেটের যাত্রা। কালের পরিক্রমায় ১৯৯৮ সালে কেনিয়াকে হারিয়ে জয়যাত্রা শুরু। ১৯৯৯ বিশ্বকাপে পাকিস্তান বধের পর থেকে বর্তমান সময় পর্যন্ত এসেছে বহু জয়ের কাব্যিক গ্রন্থ।

অনেকগুলো বিশ্বকাপ, এশিয়া কাপ কিংবা ত্রিদেশীয় কাপের সঙ্গী বাংলাদেশ। সবকিছুর উর্ধ্বে গিয়ে পুরো দলের একাগ্রতা, সংগ্রাম ও হার না মানা মানসিকতার ‘ধরে দিবানি’ প্রচেষ্টার একটা টুর্নামেন্টের কথা বলতে গেলে ফিরে যেতে হবে ২০১৮ সালের এশিয়া কাপে।

দেশপ্রেম, একাগ্রতা, দৃঢ়তা ও আক্ষেপের এশিয়া কাপ ২০১৮
দেশপ্রেম, একাগ্রতা, দৃঢ়তা ও আক্ষেপের এশিয়া কাপ ২০১৮

একটি টুর্নামেন্টে বিশাল জয়ের স্মরণীয় মুহুর্ত, বড় হারের লজ্জা, তামিমের এক হাতে ব্যাট করে যাওয়া, সাকিবের আঙুলে পচন ধরার অবস্থা হওয়ার পরেও দেশের জন্য খেলে যাওয়া, মুশফিকের একাগ্রতা, ফাইনালে শেষ বল পর্যন্ত টুটি চেপে ধরার প্রচেষ্টা, বহুমুখী এই কথাগুলোর একটি রূপ ২০১৮ এশিয়া কাপ। চলুন আজ একটু স্মৃতিচারণ করে আসি ২০১৮ সালের সেই এশিয়া কাপ থেকে। দেখে আসি কি কি ঘটেছিল সেবারের এশিয়া কাপে বাংলাদেশের সাথে।

গ্রুপ বি তে সেবার বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ ছিল শ্রীলঙ্কা ও আফগানিস্তান। অন্য গ্রুপের তিন দল ভারত, পাকিস্তান ও হংকং। প্রথম ম্যাচেই দুবাইতে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ ছিল শ্রীলঙ্কা। ম্যাচের প্রথম ওভারেই যখন মালিঙ্গার আঘাতে বাংলাদেশের টপ অর্ডারের লিটন দাশ ও সাকিব আল হাসান সাজঘরে, ঠিক তখনই দ্বিতীয় ওভারে ৩ বলে ২ রান করা তামিমের হাতে লেগে যায় লাকমলের বল।

অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে যখন তামিম হাসপাতালে, তখন আপাত বিপদ সামাল দিয়েছিলেন মুশফিক ও মিথুন৷ আবারো মালিঙ্গার বলে ৬৩ রান করা মোহাম্মদ মিথুন বিদায় নিলে ক্রিজের একপাশে থেকে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ, মোসাদ্দেক সৈকত, মেহেদী মিরাজ, মাশরাফি মুর্তজাদের যাওয়া আসা দেখেছেন মুশফিকুর রহিম। মুস্তাফিজুর রহমানকে সাথে নিয়ে সেঞ্চুরিটা পূরণ করলেও ২২৯ রানে যখন মুস্তাফিজ রহমান রানআউটে কাটা পরেন, ঠিক তখনই বাংলাদেশের শেষটা দেখে ফেলেছিলেন সকলে।

শ্রীলঙ্কা যখন ইনিংস ব্রেকের বিরতি নিতে সাজঘরে ফিরছিলেন, তখনই সবাইকে অবাক করে ভাঙা হাত নিয়ে মাঠে নেমে যান তামিম। ভাঙা হাত নিয়ে লাকমলকে মোকাবিলা করে অনন্য নজির গড়েন দেশসেরা এই ওপেনার। রানটা যখন ২২৯ এ আটকে যেতো, তখন সতীর্থ তামিমের এমন দেশপ্রেমে মুশফিক হয়ে উঠলেন আরো ভয়ঙ্কর। মাত্র ১৫ বলে রান নিয়ে গেলেন ২২৯ থেকে ২৬১ তে! ১৪৪ করে নিজের সেরা ওয়ানডে ইনিংসটাই খেলে ফেলেছিলেন তিনি।

তামিম মন্ত্রে বাংলাদেশ যখন উজ্জ্বীবিত, তখন ব্যাট হাতে পুরোটাই ভঙ্গুর টিম শ্রীলঙ্কা। ব্যাট হাতে ৩০ রানের কোটা পেরোতে পারেননি কেউই। মাশরাফি, মুস্তাফিজ, মিরাজ দুইটি ও সাকিব, রুবেল, মোসাদ্দেকের একটি করে উইকেটে ১২৪ রানে অলআউট শ্রীলঙ্কাকে বাংলাদেশ পরাজিত করে ১৩৭ রানে। ম্যাচসেরা মুশফিকুর রহিম হলেও সেদিনের সব আলো কেড়েছিলেন এক হাতে ব্যাট করা তামিম।

প্রথম ম্যাচ জিতে যখন আত্মবিশ্বাসের তুঙ্গে থাকার কথা বাংলাদেশের, তখনই মুদ্রার অপর পিঠ দেখে ফেলে বাংলাদেশ। আবুধাবিতে দ্বিতীয় ম্যাচে আফগানিস্তানের বিপক্ষে সাকিব ৪ উইকেট নিলেও বাকিদের ব্যর্থতায় ২৫৫ রান সংগ্রহ করে আফগানিস্তান।

কিন্তু ব্যর্থতার চূড়ান্ত রূপ দেখা তখনো বাকি বাংলাদেশের। ব্যাট হাতে যেন শ্রীলঙ্কার ব্যর্থতাকেও পেছনে ফেললো বাংলাদেশ। ১১৯ রানে অল-আউট হয়ে আগের ম্যাচে ১৩৭ রানে জয় পাওয়া বাংলাদেশ পরের ম্যাচেই আফগানিস্তানের সাথে হারের স্বাদ পেলো ১৩৬ রানে!

দেশপ্রেম, একাগ্রতা, দৃঢ়তা ও আক্ষেপের এশিয়া কাপ ২০১৮
দেশপ্রেম, একাগ্রতা, দৃঢ়তা ও আক্ষেপের এশিয়া কাপ ২০১৮

শ্রীলঙ্কাকেও হারিয়ে দিয়ে গ্রুপ বি এর চ্যাম্পিয়ন হয় আফগানিস্তান ও দ্বিতীয় দল হিসেবে সুপার ফোরে জায়গা পায় বাংলাদেশ। অন্যদিকে গ্রুপ এ তে ২ ম্যাচ জিতে টেবিল টপার ভারতের সাথে দ্বিতীয় দল পাকিস্তান। সুপার ফোরে বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ যথাক্রমে ভারত, আফগানিস্তান ও পাকিস্তান।

শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে জয়ের কারণে সুপার ফোরে ওঠার ভাগ্য হলেও ম্যাচ জয়ের ভাগ্য তখনো সুপ্রসন্ন হয়নি বাংলাদেশের। আবুধাবি থেকে দুবাই পাড়ি দিয়েও সুপার ফোরের প্রথম ম্যাচে ব্যর্থ বাংলাদেশ। ভারতের বিপক্ষে মেহেদী হাসান মিরাজের ৪২ রান ছাড়া বলার মতো কোন রান করতে পারেননি কেউই।

১৭৩ রানে বাংলাদেশকে গুটিয়ে দেন রবীন্দ্র জাদেজা, ভুবনেশ্বর কুমার ও জ্যাসপ্রিত বুমরাহ। ক্যাপ্টেন রোহিত শর্মার ৮৩ রানে ভর করে মাত্র ৩ উইকেট হারিয়ে জয়ের বন্দরে পৌছে যায় টিম ইন্ডিয়া।

গ্রুপপর্বে বড় হারের লজ্জা পেয়ে ও সুপার ফোরে প্রথম ম্যাচ হেরে বাংলাদেশের যখন দেয়ালে পিঠ ঠেকে গেল, তখন ঘুরে দাঁড়ানোর সেরা চেষ্টাটাই করলো মাশরাফি বাহিনী। সুপার ফোরে নিজেদের দ্বিতীয় ম্যাচে আফগানিস্তানের বিপক্ষে আবুধাবিতে ব্যাট করতে নামে বাংলাদেশ।

নাজমুল ইসলাম অপুর অভিষেকের দিনে মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের ৭৪, ইমরুল কায়েসের ৭২ রানের সাথে লিটন দাশ ও মুশফিকুর রহিমের খন্ড খন্ড স্কোরে ২৪৯ রানের নরবড়ে পুজি পায় বাংলাদেশ। বল হাতে নিজেদের সেরাটা দিতে না পারলেও নিয়ন্ত্রিত বোলিং এ ৫০ ওভার শেষে মাত্র ৩ রানের জয় নিয়ে মাঠ ছাড়ে বাংলাদেশ। ৭৪ রান ও ১ উইকেট নিয়ে ম্যাচসেরা হয়েছিলেন মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ।

সুপার ফোরের শেষ ম্যাচে জিতলে ফাইনাল এমন সমীকরণে মাঠে নামে বাংলাদেশ ও পাকিস্তান। অঘোষিত এই ফাইনালের আগে বাংলাদেশ শিবিরে হানা দেয় ইঞ্জুরি। সাকিব হাতে বড় রকমের ইঞ্জুরি নিয়েও খেলেছেন ম্যাচের পর ম্যাচ। আফগানিস্তানের সাথে ম্যাচের পর সহ্য করতে না পেরে ফিরে গেছেন দেশে। ডাক্তার জানিয়েছিলেন, “আর কয়েক ঘন্টা দেরি করলেই ধরতে পারতো পচন!” তবুও সাকিব শেষ মুহুর্ত পর্যন্ত খেলেছিলেন। দেশের জন্য, লাল সবুজের জন্য।

আবুধাবিতে টস জিতে পাকিস্তানের বিপক্ষে ব্যাট করতে নামা বাংলাদেশের টপ অর্ডার বরাবরের মতোই ব্যর্থ। আবারো দলের হাল ধরেন মুশফিকুর রহিম ও মোহাম্মদ মিথুন। ৯৯ রানে মুশফিকুর রহিম ও ৬০ রানে মোহাম্মদ মিথুন ফিরলে বাকিদের ছোট সংগ্রহে ২৩৯ রানের সংগ্রহ পেয়েছিল বাংলাদেশ।

ম্যাচের দ্বিতীয় ইনিংসে ক্যাপ্টেন ফ্যান্টাস্টিক মাশরাফি দেখিয়েছিল তার আসল নৈপুণ্য। শুধুমাত্র ক্যাপ্টেন মাশরাফিই দলের জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ, সেই ম্যাচের বোলিং বিশ্লেষণ করলেই দেখা যায়। নিজে উইকেটশূন্য থাকলেও মুস্তাফিজুর রহমানের ৪, মেহেদী মিরাজের ২ ও রুবেল হোসেন, মাহমুদউল্লাহ রিয়াদ ও সৌম্য সরকারের ১ উইকেটে ২০২ রানে থেমে যায় পাকিস্তান। ২০১৫ সালে টানা ৩ ম্যাচের জয়ের পর ২০১৮ সালে এসে ৪র্থ ম্যাচেও জয় পায় টিম টাইগার্স। ৩৭ রানের জয়ে ম্যাচসেরা হন মুশফিকুর রহিম।

দেশপ্রেম, একাগ্রতা, দৃঢ়তা ও আক্ষেপের এশিয়া কাপ ২০১৮
দেশপ্রেম, একাগ্রতা, দৃঢ়তা ও আক্ষেপের এশিয়া কাপ ২০১৮

ফাইনালের মঞ্চে আবারো ভারতের মুখোমুখি বাংলাদেশ। ইঞ্জুরির জন্য দলে নেই পঞ্চপান্ডবের দুই পান্ডব সাকিব আল হাসান ও তামিম ইকবাল। একটি ম্যাচে ৪১ করা বাদে পুরো এশিয়া কাপে ধারাবাহিক ব্যর্থ লিটন দাশকে যখন ড্রপ করার সিদ্ধান্ত আসে, তখনই ক্যাপ্টেন ফ্যান্টাস্টিক মাশরাফি দেখান তার ভেলকি।

লিটনকে একপ্রকার জোর করে দলে রাখার পাশাপাশি পুরো ব্যাটিং অর্ডার করে ফেলেন এলোমেলো। লিটন দাশের সাথে ওপেনিংয়ে তরুন অলরাউন্ডার মেহেদী হাসান মিরাজ। ওপেনিংয়ে ব্যর্থ সৌম্য সরকারকে নিয়ে আসেন ৭ নাম্বার পজিশনে। ফাইনাল ম্যাচে বাংলাদেশের ২২২ রান সংগ্রহের পথে পরিবর্তন আনা ব্যাটিং অর্ডারের এই ৩ জন ছাড়া আর কেউই পেরোতে পারেননি ১০ রানের কোটা।

লিটন দাশের ১২১, মেহেদী হাসান মিরাজের ৩২ ও সৌম্য সরকারের ৩৩ রান ছাড়া আর কোন বলার মতো স্কোর ছিলনা বাংলাদেশের ব্যাটারদের। লিটন দাশের সেঞ্চুরির পর মাশরাফির উদযাপনই বলে দিয়েছিল, লিটনের সাফল্যের আসল বীজটা বপন করে দিয়েছেন ক্যাপ্টেন ফ্যান্টাস্টিক নিজেই।

২২৩ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে ধীরগতিতেই চলছিল ভারতের ব্যাটিং। ১৬৭ রানে ধোনি ৫ম ব্যাটসম্যান হিসেবে আউট হলে জয়টা ছুতে চাচ্ছিল বাংলাদেশই। কিন্তু টেল এলেন্ডারের ধারাবাহিক ব্যাটিং এ শেষ বলে গিয়ে ৩ উইকেটের জয় নিশ্চিত করে ভারত। ভারত জিতলেও ম্যাচসেরা হন লিটন দাশ ও টুর্নামেন্ট সেরার পুরষ্কার জেতেন শিখর ধাওয়ান।

আবারো একটি ফাইনাল হার, আবারো স্বপ্নভঙ্গ কোটি বাঙালির। একটা ট্রফির আশা যেন আরো দীর্ঘায়িত হয়েছিল বাংলার ক্রিকেটে। কিন্তু দিনশেষে এই এশিয়া কাপটা আমাদের জন্য লিখা থাকবে স্মৃতির পাতায় রঙিন অক্ষরে। কারণ এই এশিয়া কাপই আমাদের মনে করবে তামিমের ভাঙা হাতে ব্যাট করার জন্য, সাকিবের পচতে যাওয়া হাত নিয়েও ক্রিকেট খেলার জন্য কিংবা মাশরাফির বুদ্ধিদীপ্ত ক্যাপ্টেন্সির জন্য।

(লেখকঃমুগ্ধ সাহা, ক্রীড়া গুরুকুল)

[দেশপ্রেম, একাগ্রতা, দৃঢ়তা ও আক্ষেপের এশিয়া কাপ ২০১৮]

 

দেশপ্রেম, একাগ্রতা, দৃঢ়তা ও আক্ষেপের এশিয়া কাপ ২০১৮

 

মন্তব্য করুন