ঢাকা, ১৩ মার্চ ২০২৫ (বাসস): ঢাকা প্রিমিয়ার লিগের (ডিপিএল) প্রতিটি আসরেই ব্যাট হাতে কোনো না কোনো তরুণ ক্রিকেটারের উত্থান ঘটে। এবার সেই আলো পড়েছে পারভেজ হোসেন ইমনের ওপর। আগের ম্যাচে হাফসেঞ্চুরি করেও জয় এনে দিতে না পারার আক্ষেপটা আজ তিনি পুষিয়ে নিলেন দুর্দান্ত এক সেঞ্চুরিতে। তার ঝড়ো ব্যাটে ভর করে আবাহনী লিমিটেড ১৬২ রানের বিশাল ব্যবধানে গুলশান ক্রিকেট ক্লাবকে পরাজিত করেছে।
ইমনের ইনিংসে ছিল আগ্রাসন ও ধৈর্যের নিখুঁত মিশেল
সাভারের বিকেএসপি ৪ নম্বর মাঠে টস জিতে প্রথমে ব্যাট করতে নামে আবাহনী। ইনিংসের শুরুতেই ইতিবাচক ব্যাটিং করেন ওপেনার জিসান আলম। ৪২ বলে ৩৫ রান করে তিনিই দলকে ভালো সূচনা এনে দেন। তবে আসল প্রদর্শনী ছিল পারভেজ ইমনের ব্যাটে।
১২৪ বল মোকাবেলায় ৯টি চমৎকার চার ও ৮টি বিশাল ছক্কায় গড়া ১২৬ রানের ইনিংসটি ছিল চোখধাঁধানো। শুরুতে কিছুটা ধীরস্থির থাকলেও একবার চোখে পড়ার পর ইমন নিউজিল্যান্ডের কাইল জেমিসন ও টম ল্যাথামদের মতো উচ্চমানের বোলারদের বিপক্ষেও আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে খেলতে পারতেন—এমন এক আগ্রাসী মানসিকতা তিনি আজ দেখালেন।
তার ব্যাট থেকে আসা ৮টি ছক্কা শুধু গ্যালারিতেই নয়, আবাহনীর ড্রেসিং রুমেও এনে দেয় প্রাণচাঞ্চল্য। ইমনের এমন ইনিংসেই আবাহনীর স্কোরবোর্ড পৌঁছে যায় তিনশর ঘরে।
মধ্যম সারিতে মিঠুনের দৃঢ়তা
ইমনের সঙ্গী হিসেবে ব্যাট হাতে দায়িত্বশীল ভূমিকা রাখেন অভিজ্ঞ মোহাম্মদ মিঠুন। প্রথম ম্যাচে ব্যর্থ হলেও আজ তিনি ফিরেছেন পরিচিত ছন্দে—৬৫ বলে ৭২ রানের একটি সাবলীল ইনিংস খেলেছেন, যার মধ্যে ছিল ৬টি চার ও ২টি ছক্কা। ইমনের সঙ্গে তার ১২০ রানের জুটি আবাহনীর ইনিংসের ভিত্তি গড়ে দেয়।
শেষ দিকে অধিনায়ক মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত (২৮ বলে ৩৫) ও মাহফুজুর রাব্বি (১৪ বলে ২৮*) ঝড়ো ব্যাটিংয়ে রান তোলাকে নতুন উচ্চতায় পৌঁছে দেন। ফলাফল—৫০ ওভারে ৩১৩/৬, যা যে কোনো দলকে মানসিকভাবে পেছনে ঠেলে দেয়।
গুলশানের ব্যাটিং ধস
গত ম্যাচে মোহামেডানের বিপক্ষে ২৯৮ রান করে ১০৭ রানে জেতা গুলশান ক্রিকেট ক্লাব আজ যেন ভিন্ন দল হয়ে গেল। জবাবে ব্যাট করতে নেমে শুরু থেকেই তাদের ব্যাটিং লাইনআপ চাপে পড়ে যায়।
ওপেনার জাওয়াদ আবরার ১৮ বলে ৩৬ রানের ঝলক দেখালেও তাকে দ্রুত ফিরিয়ে দেন মৃত্যুঞ্জয় চৌধুরী। ওয়ানডাউনে খালেদ হাসান কিছুটা প্রতিরোধ গড়লেও (৫৪ বলে ৪৯), তার সঙ্গীরা উইকেটে টিকতে পারেননি।
রাকিবুল হাসানের নিয়ন্ত্রিত বাঁহাতি স্পিনে একে একে ভেঙে পড়ে মধ্যক্রম। শেষ দিকে নিহাদউজ্জামান ৩৫ বলে ৩৫ রানে কিছুটা প্রতিরোধ গড়লেও তাতে কাজ হয়নি— ৩৮.২ ওভারে ১৫১ রানে অলআউট হয় গুলশান ক্রিকেট ক্লাব।
বোলারদের আধিপত্য
আবাহনীর হয়ে সবচেয়ে সফল ছিলেন তরুণ বাঁহাতি স্পিনার রাকিবুল হাসান, তিনি ৮ ওভারে মাত্র ৪০ রান দিয়ে ৪টি উইকেট নেন। তার সঙ্গে পেসার মৃত্যুঞ্জয় চৌধুরী তুলে নেন ৩টি উইকেট, আর সহায়তা করেন মোসাদ্দেক হোসেন (১/২০)।
তাদের বোলিংয়ের শৃঙ্খলা ও বৈচিত্র্যে গুলশানের ব্যাটাররা কোনো ছন্দ খুঁজে পায়নি। বিশেষ করে মৃত্যুঞ্জয়ের ইনসুইং ডেলিভারিতে একাধিকবার বিপাকে পড়েছেন প্রতিপক্ষ ওপেনাররা।
টুর্নামেন্ট পরিস্থিতি
এই জয়ের ফলে তিন ম্যাচে দ্বিতীয় জয় তুলে নিল আবাহনী লিমিটেড। তারা এখন ৪ পয়েন্ট নিয়ে টেবিলের শীর্ষ তিনে অবস্থান করছে। অন্যদিকে, গুলশান ক্রিকেট ক্লাব সমানসংখ্যক ম্যাচে ১ জয় নিয়ে পয়েন্ট তালিকার নিচের দিকে নেমে গেছে।
ম্যাচ-পরবর্তী প্রতিক্রিয়া
ম্যাচ শেষে পারভেজ ইমন বলেন,
“আগের ম্যাচে ভালো খেলেও জিততে পারিনি, আজ সেটিই প্রেরণা হিসেবে নিয়েছিলাম। উইকেট ব্যাটিংয়ের পক্ষে ছিল, তাই শুরুতে সময় নিয়ে পরে শট খেলেছি।”
অধিনায়ক মোসাদ্দেক হোসেন সৈকত বলেন,
“আমাদের টিমওয়ার্কই জয়ের মূল কারণ। তরুণরা এগিয়ে আসছে, সেটিই সবচেয়ে ইতিবাচক দিক।”
আবাহনীর এই জয় শুধু একটি বড় ব্যবধানের জয় নয়, বরং আত্মবিশ্বাস ফিরে পাওয়ারও প্রতীক। যেভাবে পারভেজ ইমন তার ইনিংসে আগ্রাসন, ধৈর্য ও টেকনিকের সমন্বয় ঘটিয়েছেন— তা ইঙ্গিত দিচ্ছে, দেশের ঘরোয়া ক্রিকেটে হয়তো আবারও উঠে আসছে নতুন এক তারকা।
আবাহনী এখন দৃঢ় ভঙ্গিতে এগিয়ে যাচ্ছে টুর্নামেন্টের পরবর্তী ধাপে, আর গুলশান ক্রিকেট ক্লাবকে ভাবতে হচ্ছে—কোথায় হারিয়ে গেল আগের ম্যাচের সেই উজ্জ্বল ছন্দ।
