আইসিসি নিয়ন্ত্রণে ভারতের বাণিজ্যিক শক্তির প্রভাব: হারমার

আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) ওপর ভারতীয় ক্রিকেট কন্ট্রোল বোর্ডের (বিসিসিআই) নিরঙ্কুশ আধিপত্য এবং বিশ্ব ক্রিকেটে বিরাজমান ক্ষমতার ভারসাম্যহীনতা নিয়ে নতুন করে বিতর্কের সূত্রপাত করেছেন দক্ষিণ আফ্রিকার অভিজ্ঞ অফ-স্পিনার সাইমন হারমার। সম্প্রতি ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম ‘দ্য গার্ডিয়ান’-কে দেওয়া একটি বিশেষ সাক্ষাৎকারে তিনি ক্রিকেটের বর্তমান ভূ-রাজনৈতিক ও বাণিজ্যিক প্রেক্ষাপট নিয়ে তার সুচিন্তিত পর্যবেক্ষণ তুলে ধরেন। হারমারের মতে, দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের শিরোপা জয়ের মতো বিশাল গৌরব অর্জন করলেও বিশ্ব ক্রিকেটের ক্ষমতার কেন্দ্রবিন্দুতে কোনো কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আসেনি।

বিসিসিআই ও আইসিসি: বাণিজ্যিক শক্তির একাধিপত্য

সাইমন হারমারের বক্তব্যে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের নিয়ন্ত্রক সংস্থা আইসিসির ওপর ভারতের একচ্ছত্র প্রভাবের বিষয়টি অত্যন্ত জোরালোভাবে উঠে এসেছে। তিনি সরাসরি অভিযোগ করেছেন যে, ভারতের সুবিশাল বাণিজ্যিক বাজার এবং অর্থের ওপর অতিনির্ভরশীলতার কারণে বর্তমানে যাবতীয় প্রশাসনিক ক্ষমতা বিসিসিআই-এর কবজায় চলে গেছে। হারমার তার সাক্ষাৎকারে উল্লেখ করেন:

“ভারতের বাণিজ্যিক শক্তির প্রভাবে যাবতীয় প্রশাসনিক ক্ষমতাও তাদের করায়ত্ত। বিসিসিআই কার্যত আইসিসিকে নিয়ন্ত্রণ করে। তবে বর্তমান বাস্তবতায় আমাদের করার মতো খুব বেশি কিছু নেই। ক্রিকেটার হিসেবে আমরা কেবল মাঠের খেলাটুকুই নিয়ন্ত্রণ করতে পারি। হয়তো ভবিষ্যতে আমরা যদি আরও বড় বড় ট্রফি জিততে পারি, তবে এই ব্যবস্থার কোনো পরিবর্তন ঘটতে পারে।”

হারমারের এই মন্তব্য বিশ্ব ক্রিকেটের সেই চিরচেনা বিতর্ককেই পুনরুজ্জীবিত করেছে, যেখানে ‘বিগ থ্রি’ তত্ত্ব এবং লভ্যাংশ বণ্টনে ভারতের বিশাল অংশীদারিত্ব নিয়ে বিভিন্ন সময় সমালোচনা হয়ে থাকে।

দক্ষিণ আফ্রিকার সাফল্য ও দলীয় অভ্যন্তরীণ শৃঙ্খলা

গত বছর ভারতের মাটিতে অনুষ্ঠিত টেস্ট সিরিজে দক্ষিণ আফ্রিকা ২-০ ব্যবধানে জয়লাভ করে, যেখানে সাইমন হারমার নিজে বল হাতে অত্যন্ত কার্যকর ভূমিকা পালন করেন। এর আগে অস্ট্রেলিয়াকে পরাজিত করে বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপের (ডব্লিউটিসি) শিরোপাও জিতেছিল প্রোটিয়ারা। হারমারের মতে, মাঠের এই ধারাবাহিক সাফল্যের পরও ক্রিকেট রাজনীতির ক্ষমতার ভারসাম্য খেলার মান বা পারফরম্যান্সের চেয়ে বাণিজ্যিক স্বার্থের ওপর বেশি নির্ভরশীল।

সাক্ষাৎকারে তিনি দক্ষিণ আফ্রিকা দলের বর্তমান সাফল্যের পেছনের মূল কারণগুলোও ব্যাখ্যা করেছেন। তার মতে, প্রোটিয়া শিবিরে কোনো একক ‘তারকা সংস্কৃতির’ চেয়ে দলীয় সংহতি অনেক বেশি শক্তিশালী। দলের কোচ শুকরি কনরাডের ভূমিকার প্রশংসা করে তিনি বলেন:

“আমাদের দলে হয়তো কয়েকজন বড় তারকা রয়েছেন, কিন্তু দলের স্বার্থ সবসময় সবার উপরে রাখা হয়। যদি কোনো ক্রিকেটার প্রত্যাশা অনুযায়ী পারফর্ম করতে না পারেন, তবে কোচ সরাসরি তাকে জবাবদিহিতার আওতায় নিয়ে আসেন। কোচের এই কঠোর ও স্বচ্ছ অবস্থান আমার অত্যন্ত পছন্দ, যদিও ব্যক্তিগতভাবে আমাকে খুব একটা এমন অপ্রীতিকর পরিস্থিতির মুখোমুখি হতে হয়নি।”

ইংল্যান্ডের স্পিন সংস্কৃতি ও কাউন্টি ক্রিকেটের সীমাবদ্ধতা

দক্ষিণ আফ্রিকার হয়ে খেলার পাশাপাশি ইংল্যান্ডের কাউন্টি ক্রিকেটেও দীর্ঘ সময় কাটানোর অভিজ্ঞতা রয়েছে হারমারের। সেই অভিজ্ঞতা থেকে তিনি ইংলিশ স্পিনারদের বর্তমান অবস্থা নিয়ে গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তার পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, ইংল্যান্ডের ক্রিকেট সংস্কৃতিতে স্পিনারদের যথাযথ মূল্যায়ন করা হয় না। সেখানে প্রতিভার অভাব না থাকলেও পরিকাঠামোগত সীমাবদ্ধতা এবং প্রথাগত মানসিকতার অভাব রয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

কাউন্টি ক্রিকেটের পরিকাঠামো নিয়ে হারমার বলেন, “ইংল্যান্ডে স্পিনারদের অন্যান্য পজিশনের খেলোয়াড়দের মতো সমান গুরুত্ব দেওয়া হয় না। সেখানে ১৮টি কাউন্টি দল রয়েছে, কিন্তু এর মধ্যে মাত্র ২ থেকে ৩টি দলে স্পিন বোলিং কোচ রয়েছে। স্পিন বোলিংয়ের মানোন্নয়ন করতে হলে প্রতিটি দলে বিশেষজ্ঞ স্পিন কোচ নিয়োগ দেওয়া এখন সময়ের দাবি।”

বিশ্ব ক্রিকেটে প্রভাব ও ভবিষ্যৎ বাস্তবতা

সাইমন হারমারের এই সাক্ষাৎকারটি এমন এক সময়ে প্রকাশিত হয়েছে যখন আইসিসির ভবিষ্যৎ আর্থিক মডেল এবং এফটিপি (ফিউচার ট্যুরস প্রোগ্রাম) নিয়ে বিভিন্ন ক্রিকেট বোর্ড তাদের অসন্তোষ প্রকাশ করে আসছে। দক্ষিণ আফ্রিকার এই স্পিনারের দাবি অনুযায়ী, যদি বড় বড় শিরোপা জয় বা মাঠের শ্রেষ্ঠত্বও ক্ষমতার কাঠামো পরিবর্তন করতে ব্যর্থ হয়, তবে তা বিশ্ব ক্রিকেটের দীর্ঘমেয়াদী নিরপেক্ষতা ও আদর্শিক ভিত্তি নিয়ে বড় প্রশ্ন তুলবে।

বর্তমানে হারমার দক্ষিণ আফ্রিকা দলের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ সদস্য হিসেবে টেস্ট ক্রিকেটে নিয়মিত প্রতিনিধিত্ব করছেন। তার বিশ্লেষণ অনুযায়ী, ক্রিকেট বিশ্বে ভারত যে পরিমাণ রাজস্ব উৎপাদন করে, তার কারণেই আইসিসি অনেক ক্ষেত্রে বিসিসিআই-এর সিদ্ধান্তের ওপর নির্ভরশীল থাকতে বাধ্য হয়। এই বাণিজ্যিক আধিপত্য বনাম খেলার গুণগত মানের ভারসাম্য রক্ষার লড়াই আগামী দিনে ক্রিকেটের নীতি নির্ধারণে প্রধান নিয়ামক হয়ে উঠবে বলে ক্রীড়া বিশ্লেষকরা মনে করছেন। হারমারের এই খোলামেলা বক্তব্য আইসিসির স্বায়ত্তশাসন এবং দক্ষিণ আফ্রিকার মতো সফল দলগুলোর প্রশাসনিক অবমূল্যায়ন নিয়ে বিশ্ব ক্রিকেটে নতুন করে বিতর্কের দ্বার উন্মোচন করেছে। প্রোটিয়ারা মাঠে আধিপত্য দেখালেও প্রশাসনিক টেবি

Leave a Comment