দুর্ভাগ্যের এমন রেকর্ড ক্রিকেট বিশ্বে আর কারও নেই!

ঢাকা, ১০ মার্চ, ২০২৫ (বাসস): ক্রিকেট ইতিহাসে এমন ট্র্যাজিক হিরো বিরল, যিনি প্রতিবারই লড়েছেন একা, দলকে টেনেছেন বিপর্যয় থেকে, তবু শেষ পর্যন্ত হার দেখেছেন। দক্ষিণ আফ্রিকার ডেভিড মিলার সেই নামটি এখন এক অনন্য দৃষ্টান্ত—যে দৃষ্টান্তে গর্ব নয়, রয়েছে অবিশ্বাস্য এক দুর্ভাগ্যের ছায়া।

নিউজিল্যান্ডের দেওয়া বিশাল ৩৬৩ রানের লক্ষ্য তাড়া করতে নেমে দক্ষিণ আফ্রিকার ইনিংস থেমে যায় ৩১২ রানে। অথচ এই ইনিংসের মূলে ছিলেন একাই ডেভিড মিলার, যিনি মাত্র ৬৭ বলে ১০০ রানের বিস্ময়কর সেঞ্চুরি করেন। কিন্তু দলকে জেতাতে পারেননি।
একই দৃশ্য দেখা গিয়েছিল ২০২৩ সালের ওয়ানডে বিশ্বকাপ সেমিফাইনালে, যখন অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে মিলার করেছিলেন অনবদ্য এক সেঞ্চুরি—তবুও দক্ষিণ আফ্রিকা ছিটকে গিয়েছিল ফাইনালের দোরগোড়া থেকে।

দুই নকআউট ম্যাচ, দুই সেঞ্চুরি, দুই পরাজয়—এই নিয়তির পুনরাবৃত্তিই মিলারকে বানিয়ে দিয়েছে ক্রিকেটের সবচেয়ে দুর্ভাগা সেঞ্চুরিয়ান।

দুর্ভাগ্যের এমন রেকর্ড

এক অনন্য কিন্তু বেদনাময় বিশ্বরেকর্ড

আইসিসির ওয়ানডে টুর্নামেন্টের ইতিহাসে নকআউট পর্বে দুবার সেঞ্চুরি করে দুবার হারা একমাত্র খেলোয়াড় এখন ডেভিড মিলার। ২৬ বছরের বিশ্ব ক্রিকেটেও এমন নজির আর নেই।

এমনকি কিংবদন্তিদের যুগেও কেউ এমন “হতভাগ্য রেকর্ড”-এর মালিক হননি। ১৯৯৬ বিশ্বকাপজয়ী শ্রীলঙ্কান তারকা সনাৎ জয়সুরিয়া নকআউট ম্যাচে তিনবার দলীয় সর্বোচ্চ রান করেছিলেন, কিন্তু প্রতিবারই হেরেছিল শ্রীলঙ্কা। মিলারের কাহিনিও তেমনই—ব্যক্তিগত মহিমা ছাপিয়ে গেছে দলের ব্যর্থতা।

পরিসংখ্যানে মিলারের মহত্ত্ব

এই হতাশার মাঝেও রয়েছে একাধিক রেকর্ডের আলো। আইসিসি ইভেন্টের নকআউট ম্যাচে অন্তত ৩০০ রান করা ব্যাটারদের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ব্যাটিং গড় (১৫৩) এখন মিলারের। তার নিচে আছেন পাকিস্তানের কিংবদন্তি সাঈদ আনোয়ার (১২৮.৩৩)। এই তালিকায় ভারতের, ইংল্যান্ডের কিংবা অস্ট্রেলিয়ার কোনো ব্যাটারই ১০০-এর গড় ছুঁতে পারেননি।

আরও আছে এক চমকপ্রদ অর্জন— চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির ইতিহাসে দ্রুততম সেঞ্চুরি (৬৭ বলে) এখন ডেভিড মিলারের। এই ইনিংসের মাধ্যমে তিনি ছাড়িয়ে গেছেন ইংল্যান্ডের জশ ইংলিশ (৭৭ বলে, ২০২৫) এবং ভারতের আগ্রাসী ওপেনার বীরেন্দ্র শেবাগকে (২০০২, ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৭৮ বলে সেঞ্চুরি)

ম্যাচের পটভূমি

দুবাই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত সেই ম্যাচের শুরু থেকেই নিউজিল্যান্ড ব্যাটাররা ছড়িয়েছিলেন আগুন—৩৬৩ রানের বিশাল লক্ষ্য দাঁড় করান। জবাবে দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটিং লাইনআপ ভেঙে পড়ে শুরুতেই। একে একে ফেরেন কুইন্টন ডি কক, রিজা হেন্ড্রিকস ও ক্লাসেন। দলের রান যখন ১৫ ওভারে ৮৯/৪, তখন কেবল একাই লড়াই শুরু করেন মিলার।

প্রথমে মার্করামকে নিয়ে ছোট জুটি, তারপর কোয়েটজারকে সঙ্গে নিয়ে এগিয়ে যান। কিন্তু যখনই মনে হচ্ছিল দক্ষিণ আফ্রিকা ম্যাচে ফিরছে, তখনই সঙ্গী হারান তিনি। শেষ পর্যন্ত একক প্রচেষ্টায় তিনি দলকে ৩০০ রানের ঘরে তুললেও জেতাতে পারেননি।

৬৭ বলে ১০০—তার ইনিংসটি ছিল ছক্কা ও চার মেশানো এক ক্লাসিক ব্যাটিংয়ের প্রদর্শনী। কিন্তু ক্রিকেট কখনো কখনো ন্যায্য হয় না—সেই সত্যটিই আবারও স্মরণ করিয়ে দিল এই ম্যাচ।

বিশ্লেষণ: “চোকার্স” তকমা কেন কাটে না?

দক্ষিণ আফ্রিকা দলকে নিয়ে একটি প্রবাদ বহুদিন ধরেই প্রচলিত—“চোকার্স অব ওয়ার্ল্ড ক্রিকেট”। ১৯৯২ থেকে শুরু করে ২০২৫ পর্যন্ত তারা অন্তত ১০টি বড় টুর্নামেন্টের নকআউটে হেরে গেছে, যেখানে একাধিকবার ছিল জয়ের সম্ভাবনা। মিলারের এই ইনিংস সেই হতাশার ধারাবাহিকতাকেই নতুন রূপে স্মরণ করাল।

ক্রিকেট বিশ্লেষকদের মতে, দক্ষিণ আফ্রিকার সমস্যাটা কেবল দক্ষতার নয়, মানসিক দৃঢ়তারও। “মিলার একাই যেন লড়ছেন পুরো দেশের জন্য,” মন্তব্য ক্রিকেটবিশ্লেষক হার্শা ভোগলের। “কিন্তু ক্রিকেট একটি দলীয় খেলা—যখন বাকিরা ভেঙে পড়েন, তখন এক জনের সেঞ্চুরিও যথেষ্ট হয় না।”

এক ট্র্যাজিক হিরোর কাহিনি

ডেভিড মিলার দীর্ঘদিন ধরে দক্ষিণ আফ্রিকার মধ্যম সারির মেরুদণ্ড। ২০০৭ সালে আন্তর্জাতিক অভিষেকের পর থেকে তার ব্যাটে এসেছে অসংখ্য ম্যাচ-উইনিং ইনিংস, কিন্তু বড় টুর্নামেন্টে তার ভাগ্য যেন প্রতিবারই প্রতিকূলে। যেভাবে ২০২৩ সালের বিশ্বকাপে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সেঞ্চুরি করেও হেরেছিলেন, ২০২৫ সালেও সেই ভাগ্যবৃত্তান্তের পুনরাবৃত্তি ঘটল।

তিনি নিজেও ম্যাচ শেষে বলেন,

“সংখ্যা বা রেকর্ড নয়, আমি শুধু চাইতাম দল জিতুক। কিন্তু কিছু গল্পের পরিণতি হয়তো আগেই লেখা থাকে।”

ক্রিকেটের ইতিহাসে সেঞ্চুরির সংখ্যা গণনা করা যায়, কিন্তু মনভাঙা ইনিংসের ব্যথা মাপা যায় না। ডেভিড মিলার আজ রেকর্ডবুকে নাম তুলেছেন—কিন্তু তার হৃদয়ে হয়তো সেই নামের কোনো মূল্য নেই। যেখানে অন্যরা জয়ের উল্লাসে ভাসে, সেখানে তিনি পরিসংখ্যানের শৃঙ্খলে বন্দি এক দুর্ভাগ্যবান নায়ক

সত্যিই—দুর্ভাগ্যের এমন রেকর্ড ক্রিকেট বিশ্বে আর কারও নেই!

Leave a Comment