অনুপ্রেরণার নাম মোহাম্মদ রফিক !

অনুপ্রেরণার নাম মোহাম্মদ রফিক !!!

মোহাম্মদ রফিক – এই নামটাকে কোনটা দিয়ে মূল্যায়ন উচিৎ? পরিসংখ্যান দিয়ে নাকি পরিসংখ্যান ছাড়া? পরিসংখ্যান দিয়ে মূল্যায়ন করলেও মূল্যায়ন করা যাবে অনেক বেশীই আবার তখন আফসোসও হবে অনেক। আবার চাইলেও তাকে কোনো পরিসংখ্যান ছাড়াই একজন ক্রিকেটার, একজন যোদ্ধা কিংবা একজন ব্যক্তি রফিক হিসেবেও মূল্যায়ন করা যায়।

মূলতানে সেদিন ‘মানকাডিং’ করে উমর গুলকে তিনি আউট করলেই পারতেন, ক্রিকেটের নিয়মে তা আউটই হতো। কিন্তু ‘মানকাডিং’ শব্দটাকে সেদিন তিনি রূপ দিলেন ‘ম্যান কাইন্ডিং’- এ। ক্রিকেট স্পিরিটের বাহিরে যেতে চাননি তিনি আপনি, তাই আর উমর গুলকে আউট করা হয়নি। সেদিন উমর গুলকে আউট করলেই ম্যাচের চালকের আসনে বসতো রফিকের বাংলাদেশ। লেখা হতো ‘মূলতান রূপকথা!’

মোহাম্মদ রফিক
মোহাম্মদ রফিক

কিন্তু ক্রিকেটীয় স্পিরিটের বাহিরে গিয়ে এমন রূপকথার লেখক হওয়ার বিন্দুমাত্র ইচ্ছা কিংবা আকাঙ্ক্ষা কোনোটাই ছিলো না তার। তিনি অবশ্য পরে বলেছিলেন, “এভাবে জিতলে দেশের বদনাম হতো।” সেদিন রফিক চাইলেই আমরা প্রথম টেস্ট জয়ের স্বাদ পেতাম, কিন্তু তখন পাওয়া না হলেও পরে যখন আমরা প্রথম টেস্ট জিতি সেখানেও রফিক ছিলেন।

প্রথম টেস্ট জয়ে ব্যাট হাতে ৬৯ ও ১৪ রান আর বল হাতে এক ইনিংসে ৫ উইকেট নিয়ে জয়ের অন্যতম নায়ক হয়ে আছেন আমাদের ইতিহাসে। আমরা নিজেদের প্রচেষ্টায় প্রথম যখন টেস্ট ড্র করি ম্যাচ টায় ড্র এর পিছনে সবচাইতে বড় অবদান তো ব্যাটসম্যান রফিকেরই। নয় নাম্বারে নেমে ১৫২ বলে ১১১ রান কি এক দুর্দান্ত লড়াকু ইনিংস।

প্রথমবার এর মতো ইনিংস ডিক্লেয়ারের সাহস পেয়েছিলো বাংলাদেশ, সে ম্যাচে। সেই ম্যাচ শেষে লারা সেদিন রফিক কে বলেছিলেন, “তুমিই তো ম্যান অব দ্যা ম্যাচ হচ্ছো।” কিন্তু জুরিদের চোখে কেনো তিনি ম্যাচের সেরা প্লেয়ার না সে উত্তর অজানাই রইলো।

unnamed 1526755573031 1 ক্রিকেট গুরুকুল, GOLN

শুধু প্রথম টেস্টে জয়েই নয়, রফিক ছিলেন বাংলাদেশের প্রথম ওয়ানডে জয়েও। ভূমিকা রেখেছিলেন বল হাতে ৩ উইকেট আর ওপেনিংয়ে ১১ চার আর ১ ছয়ে ৮৭ বলে ৭৭ রানের অনবদ্য এক ইনিংস। সে ম্যাচে রফিক হয়েছিলেন ম্যান অব দ্যা ম্যাচ।

বাংলাদেশের প্রথম টি টুয়েন্টি জয়েও অবদান রেখেছিলেন রফিক। ব্যাট হাতে ৩ বাউন্ডারিতে ৫ বলে ১৩ রানের ক্যামিও আর বল হাতে ২২ রান খরচায় ১ উইকেট শিকারে। তবে এই জয়ের মাধ্যমে অনন্য এক রেকর্ডই গড়ে ফেলেছিলেন রফিক।

ইতিহাসের প্রথম ক্রিকেটার হিসেবে দেশের তিন ফরম্যাটের সব গুলোর প্রথম জয়েই ছিলেন একাদশে। দীর্ঘ ১৩ বছর পর ২০১৯ সালে আফগান অলরাউন্ডার মোহাম্মদ নাবী ছোট্ট এই ক্লাবের সদস্য হয়। যে তালিকায় রফিকই প্রথম ৷

এক সময় বাংলাদেশের ইনিংসে ছক্কা হতো একটি কিংবা দুটি। একটি ছক্কা হলেও বেশীর ভাগ সময়ই সেটি আসতো রফিকের ব্যাট থেকে। রফিক খেলা ছেড়েছেন সেই ২০০৮ সালে। কিন্তু ২০১৮ পর্যন্ত টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ ছক্কার রেকর্ড এই বোলারের দখলে ছিলো। পরবর্তীতে ঐ রেকর্ড তামিম নিজের করে নিয়েছেন। একটা সময় ওয়ানডে ক্রিকেটে শুধুমাত্র রফিক আর মাশরাফি ছিলেন শেষের দিকে ঝড় তুলতে পারার মতো ব্যাটসম্যান। তবে ব্যাট হাতে শেষ কিংবা শুরু সব পজিশনে নেমেই ঝড় তুলতে পারতেন এই বাঁহাতি অলরাউন্ডার।

যে ম্যাচ জিতে বাংলাদেশ প্রথম বিশ্বকাপ খেলা নিশ্চিত করে সে ম্যাচে ব্যাট হাতে তার অবদান ১ চার আর ১ ছয়ে ৭ বলে ১৬ রান, আইসিসি ট্রফির মহাগুরুত্বপূর্ণ ফাইনালে ওপেনিংয়ে নেমে ২ বাউন্ডারি আর ২ ওভার বাউন্ডারিতে ১৫ বলে ২৫ রানের মহা গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস।

প্রথম ওয়ানডে জয়ে ওপেনিংয়ে ১১ চার আর ১ ছয়ে ৮৭ বলে ৭৭ রান, প্রথম ওয়ানডে সিরিজ জয়ে ৭ চার আর ৪ ছক্কায় ৬৬ বলে ৭২ রান। কিংবা প্রথম টি টুয়েন্টিতে ৫ বলে ১৩ রান সহ এমন অসংখ্য ধ্রুপদী ইনিংসের কারণে আধুনিক এই ধুমধাড়াক্কার ক্রিকেট মিস করে ব্যাটসম্যান মোহাম্মদ রফিককে।এক একবার এক সাক্ষাৎকারে মারকুটে এই ব্যাটসম্যান বলেছিলেন, “টি টোয়েন্টি ক্রিকেটের জন্মের আগেই আমি কিন্তু টি টোয়েন্টি ব্যাটিং করেছি।” পুরো ক্যারিয়ার জুড়ে রফিকের ব্যাটিং এই কথাটার সাক্ষ রাখে।

সাকিব আল হাসান অলরাউন্ডার হিসেবে এখন অনেক অনেক এলিট ক্লাবে প্রবেশ করছেন প্রতিনিয়তই। প্রতিনিয়তই বিভিন্ন ডাবলের কীর্তি গড়ছেন তিনি। কিন্তু ডাবল এর এলিট প্যানেলের যাত্রা বাংলাদেশ শুরু করেছিলো রফিকের কীর্তির মাধ্যমেই।

রফিক প্রথম বাংলাদেশী অলরাউন্ডার যিনি টেস্ট ক্রিকেটে ব্যাট হাতে ১০০০ রান এবং বল ১০০ উইকেট শিকারের ডাবলের মাইলফলক স্পর্শ করেছিলেন। রফিকই প্রথম বাংলাদেশী অলরাউন্ডার যিনি ওয়ানডেতে ব্যাট হাতে ১০০০ রান এবং বল হাতে ১০০ উইকেট শিকারের ডাবল স্পর্শ করেছিলেন। এই জায়গায় অলরাউন্ডার রফিকে অনন্য হয়েই থাকবেন বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে।

এমন রেকর্ড গড়ার সুযোগ বাংলাদেশ ব্যাতীত প্রতি দেশ থেকে দুজন করে ক্রিকেটার সবার আগে করার সুযোগ পেয়েছেন। আর বাংলাদেশের ক্ষেত্রেই দুটো রেকর্ডই অলরাউন্ডার রফিকের দখলে। রফিকই প্রথম বাংলাদেশী অলরাউন্ডার যিনি টেস্ট ক্রিকেটে এক ইনিংসে ৫০ রান এবং ৫ উইকেট শিকারের রেকর্ড গড়েন।

সাদা পোশাকের ক্রিকেফে প্রথম বাংলাদেশী বোলার হিসেবে ১০০ উইকেটের মাইলফলক স্পর্শ করেন বাঁ হাতি এই স্পিন জাদুকর। তেমনি ওয়ানডেতেও বাংলাদেশের প্রথম ১০০ উইকেটের মাইলফলকও রফিকের দ্বারাই প্রথম স্পর্শ করা হয়েছিলো।

তবে এতো এতো পাওয়ার মাঝে রফিক কে নিয়ে অনেক আফসোস কিংবা আক্ষেপ থেকেই যায় ভক্তদের মনে। ভুল যুক্তি দিয়ে ওয়ানডে বোলার বানিয়ে টেস্ট ক্রিকেট বসিয়ে রাখা হয়েছিলো রফিককে। যার কারণে অনেক দিন খেলতে পারেননি টেস্ট ক্রিকেট, মিস করে গেছেন অনেক ম্যাচ।

অথচ টেস্ট ক্রিকেটে ৩৩ ম্যাচ এবং ৪৮ ইনিংস বল করেই রফিকের ঝুলিতে ১০০ টেস্ট উইকেট। ফবে আরো দ্রুতই হতে পারতো এই রেকর্ড। টেস্ট ক্রিকেটে স্পিনারদের স্বর্গের মতো দিন ৪র্থ এবং ৫ম দিন। কিন্তু তখন বাংলাদেশের বেশীর ভাগ টেস্টই শেষ হতো ৩ দিনেই।

ব্যাটসম্যানদের চরম হতাশা আর ব্যর্থতার দিনে রফিকদের জন্য আর কিছুই থাকতো না। বোলাররা ৪র্থ ইনিংস বোলিংয়েরই সুযোগ পেতেন না প্রায় ম্যাচেই। পেলেও সেটি অল্প কয়েক ওভার।

পরিসংখ্যান মতে রফিকের ৩৩ টেস্টে মাত্র ১৫ বার তিনি বিপক্ষের ২য় ইনিংসে বোলিংয়ের সুযোগ পেয়েছেন। তাও প্রায় প্রতিবারই রফিক বোলিংয়ে আসার কয়েক ওভার না যেতেই ম্যাচ শেষ কিংবা ততক্ষণে প্রতিপক্ষের ইনিংস ঘোষণা।

তবে ক্রিকেট বিশ্ব দেখেছিলো প্রোটিয়া অধিনায়ক গ্রায়েম স্মিথের মহানুভবতা তা৷ রফিকের শেষ টেস্ট উইকেট তখন ৯৯*, তাই স্মিথ ডিক্লেয়ার দিতে পারছিলেন না, অপেক্ষা করছিলেন আরেকটি উইকেটের। তাই রফিকের ১০০ উইকেট পূরণের পর পরই প্রোটিয়া কাপ্তান ইনিংস ঘোষণা করেছিলেন।

রফিকের ক্যারিয়ারের শেষাংশে এসেই বাংলাদেশ পেয়েছিলো ওয়ানডে এবং টেস্ট স্ট্যাটাস। তাই খুব বেশী সময় ধরে সার্ভিস দিতে পারেননি রফিক। ক্যারিয়ারের প্রায় প্রতিটা সময়ই তিনি হয়েছিলেন উপেক্ষিত, বিশেষ করে টেস্টে৷ তবুও রফিক অনেক দিয়েছেন বাংলাদেশকে, তবে শেষমেশ অনেক ক্ষোভ আর আক্ষেপ নিয়েই বিদায় বলেছেন ক্রিকেটকে।

রফিক প্রথমবার অবসর নিয়েছিলেন ১৯৯৯ সালে। বিশ্বকাপে তাকে তিনটে ম্যাচ বসিয়ে রাখা হয়েছিলো সাইড বেঞ্চে। তার পর এই অলরাউন্ডার মন্তব্য করেছিলেন, “আমাকে যে তিন ম্যাচ বসিয়ে রাখা হলো, আমি এতই খারাপ প্লেয়ার?”

অথচ এর আগের বছরই তো রফিক বাংলাদেশকে প্রথম ওয়ানডে জেতালেন, ২ বছর আগের আইসিসি ট্রফিতে ব্যাট হাতে দুর্দান্ত সময় কাটিয়েছিলেন, ছিলো না কোনো অফ ফর্ম তবুও বসিয়ে রাখা।

তবে ক্যারিয়ারে অনেক বারই হয়েছেন নানান কারণে বিতর্কিত। কখনো নেট প্র‍্যাকটিসে, কখনো ড্রেসিংরুমে অধিনায়কের সাথে বাকবিতন্ডা, কখনো কোচের সাথে ঝামেলা, নাম এসেছিলো ফিক্সিং কেলেংকারীতে। তবে প্রমাণ মেলেনি সত্যতার।

বুড়িগঙ্গা ওপারে কেরানীগঞ্জের এক পরিবার থেকে উঠে এসেছেন রফিক। যেখানে শুধু জীবন সংগ্রামের লড়াই, সেখানে ক্রিকেট বিলাসিতার নাম। সেখান থেকেই ৮০’র দশকে পথচলা শুরু। জীবনে যুদ্ধে জয়ী হয়েছেন, মাঠের যুদ্ধেও জয়ী করেছেন। তাইতো সব চাপিয়ে মোহাম্মদ রফিক সবার কাছে এক অনুপ্রেরণার নাম, এক আবেগের নাম, এক শ্রদ্ধার নাম। যাকে মূল্যায়ন করা যায় না পরিসংখ্যান নামক অংক দিয়ে।

লেখকঃ ইশতিয়াক শাওন

[ স্পোর্টস গুরুকুল]

অনুপ্রেরণার নাম মোহাম্মদ রফিক !!!

আরও পড়ুন:

মন্তব্য করুন