সিলেট আন্তর্জাতিক ক্রিকেট স্টেডিয়ামে সফরকারী পাকিস্তানের বিরুদ্ধে সিরিজের দ্বিতীয় ও শেষ টেস্ট ম্যাচের দ্বিতীয় দিনের প্রথম সেশন বা সকালের অংশটি সম্পূর্ণ নিজেদের নিয়ন্ত্রণে রেখেছে স্বাগতিক বাংলাদেশ। গতিময় পেসার তাসকিন আহমেদের জোড়া আঘাতের পর পাকিস্তানের ইনিংসে নতুন করে ধস নামিয়েছেন অফ-স্পিনার মেহেদি হাসান মিরাজ। তিনি সফরকারীদের আরও দুটি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট তুলে নিয়ে দুটি প্রতিরোধ গড়ে ওঠার আগেই তা ভেঙে দেন। এক প্রান্ত আগলে রেখে পাকিস্তানের অভিজ্ঞ তারকা ব্যাটসম্যান বাবর আজম দলের পক্ষে লড়াই চালিয়ে গেলেও ৪ উইকেট হারিয়ে ব্যাকফুটে চলে গেছে পাকিস্তান। আজ রোববার দ্বিতীয় দিনের মধ্যাহ্নভোজের বিরতিতে যাওয়ার আগে পাকিস্তানের সংগ্রহ দাঁড়িয়েছে ৪ উইকেটে ৯৬ রান।
প্রথম সেশনের খেলা ও উইকেটের পতন
আজ সকালের সেশনের শুরু থেকেই পাকিস্তানি ব্যাটসম্যানদের সম্পূর্ণ চাপে রাখার সুনির্দিষ্ট কৌশল নিয়ে বোলিং শুরু করেন বাংলাদেশের দুই পেসার তাসকিন আহমেদ ও শরিফুল ইসলাম। দিনের দ্বিতীয় ওভারের প্রথম বলেই তাসকিন আহমেদ পাকিস্তানের ওপেনার আব্দুল্লাহ ফজলকে সাজঘরে ফেরত পাঠান। মিরপুর টেস্টের দুই ইনিংসে অর্ধশতক হাঁকানো ২৩ বছর বয়সী এই ব্যাটসম্যান ব্যক্তিগত ৯ রান করে উইকেটের পেছনে ক্যাচ দেন। উইকেটরক্ষক লিটন দাস তাঁর বাঁ দিকে চমৎকারভাবে ঝাঁপিয়ে পড়ে সেই ক্যাচটি তালুবন্দী করেন। এর ঠিক এক ওভার পরে তাসকিন তাঁর দ্বিতীয় শিকার হিসেবে তুলে নেন আরেক ওপেনার আজান আওয়াইসকে। তাসকিনের করা বলটি পিচে পড়ে কিছুটা দেরিতে সুইং করলে আজান রক্ষণাত্মক খেলার চেষ্টা করেন, কিন্তু বল তাঁর ব্যাটের কানায় লেগে শর্ট লেগে দাঁড়িয়ে থাকা ফিল্ডার মুমিনুল হকের হাতে সহজ ক্যাচ হিসেবে চলে যায়। অভিষেক টেস্টেই শতক হাঁকানো আজান আওয়াইস এবার মাত্র ১৩ রান করে প্যাভিলিয়নে ফেরত যান। মাত্র ২২ রানে ২ উইকেট হারিয়ে পাকিস্তান প্রাথমিক ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়ে।
দুই ওপেনারের দ্রুত বিদায়ের পর পাকিস্তানের অধিনায়ক শান মাসুদ ও বাবর আজম মিলে ইনিংস মেরামতের চেষ্টা চালান। তারা দেখেশুনে খেলে স্কোরবোর্ডে আরও ৩৮ রান যোগ করেন। তবে এই জুটিটিকে বিপজ্জনক হয়ে উঠতে দেননি স্পিনার মেহেদি হাসান মিরাজ। শান মাসুদ মিরাজের একটি বল কাভার অঞ্চল দিয়ে খেলার চেষ্টা করলে শর্ট কাভারে দাঁড়িয়ে থাকা বদলি ফিল্ডার নাঈম হাসান দারুণ একটি ক্যাচ লুফে নেন। শান মাসুদ ৪৪ বলে ৩টি চারের সাহায্যে ২১ রান করে আউট হন।
অধিনায়কের বিদায়ের পর ক্রিজে আসা নতুন ব্যাটসম্যান সৌদ শাকিলও পিচে বেশিক্ষণ থিতু হতে পারেননি। এই বাঁহাতি ব্যাটসম্যান রান তুলতে শুরু থেকেই কিছুটা সংগ্রাম করছিলেন। স্পিনের চাপ কাটিয়ে ওঠার লক্ষ্যে তিনি মিরাজের বলে একটি সুইপ শট খেলার চেষ্টা চালান। কিন্তু বলটি তাঁর ব্যাটের কানায় লেগে শূন্যে ভেসে উঠলে উইকেটরক্ষক লিটন দাস কোনো ভুল না করে তা অনায়াসে নিজের হাতের মুঠোয় পুরেন। ২৮ বল খেলে মাত্র ৮ রান করে সৌদ শাকিল বিদায় নিলে ৭৯ রানে ৪ উইকেট হারিয়ে তীব্র সংকটে পড়ে পাকিস্তান।
সিলেট টেস্টের দ্বিতীয় দিনের মধ্যাহ্নভোজ পর্যন্ত ম্যাচের পরিসংখ্যান
বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যকার চলতি টেস্ট ম্যাচের প্রথম ইনিংসের দলীয় সংগ্রহ এবং দ্বিতীয় দিনের প্রথম সেশনের সংক্ষিপ্ত চিত্র নিচে সারণির মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:
| দলের নাম ও ইনিংসের বিবরণ | মোট রান সংখ্যা | উইকেটের পতন | ক্রিজে অপরাজিত ব্যাটসম্যান ও বোলারদের অবদান |
| বাংলাদেশ (প্রথম ইনিংস) | ২৭৮ | ১০ (অলআউট) | লিটন দাস (১২৬ রান), খুররম শেহজাদ (৪ উইকেট) |
| পাকিস্তান (প্রথম ইনিংস – চলমান) | ৯৬ | ৪ (২৯ ওভার) | বাবর আজম (৩৭ রান), সালমান আলি আগা (৬ রান) |
| বোলারদের অবদান (বাংলাদেশ) | — | — | তাসকিন আহমেদ (২ উইকেট), মেহেদি হাসান মিরাজ (২ উইকেট) |
ম্যাচের বর্তমান প্রেক্ষাপট ও লিটনের সেঞ্চুরি
প্রথম সেশনের খেলা শেষে পাকিস্তান এখনো বাংলাদেশের প্রথম ইনিংসের চেয়ে ১৮২ রানে পিছিয়ে রয়েছে। ক্রিজে বাবর আজম ৬৪ বলে ৬টি চারের সাহায্যে ৩৭ রান এবং সালমান আলি আগা ১৫ বলে ১টি চারের সাহায্যে ৬ রান করে অপরাজিত আছেন। বাবর আজম বাউন্ডারি ও একক রান নিয়ে পাকিস্তানের স্কোরবোর্ড সচল রাখার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।
এর আগে ম্যাচের প্রথম দিনে টসে জিতে প্রথমে ব্যাটিং করতে নেমে চরম ব্যাটিং বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছিল স্বাগতিক বাংলাদেশ। তবে সেই কঠিন পরিস্থিতি থেকে দলকে একাই টেনে তোলেন অভিজ্ঞ উইকেটরক্ষক ব্যাটসম্যান লিটন দাস। তিনি পাকিস্তানি বোলারদের নিখুঁতভাবে মোকাবিলা করে ১২৬ রানের একটি লড়াকু এবং চমৎকার শতক উপহার দেন। লিটন দাসের এই দুর্দান্ত শতকের ওপর ভর করেই বাংলাদেশ প্রথম ইনিংসে শেষ পর্যন্ত ২৭৮ রান সংগ্রহ করতে সক্ষম হয়েছিল। পাকিস্তানের পক্ষে সবচেয়ে সফল বোলার ছিলেন খুররম শেহজাদ, তিনি একাই ৪টি উইকেট শিকার করেন। প্রথম ইনিংসে বাংলাদেশ ২৭৮ রানে অলআউট হলেও দ্বিতীয় দিনের প্রথম সেশনে তাসকিন ও মিরাজের এই নিয়ন্ত্রিত বোলিং ও ৪টি উইকেট শিকার বাংলাদেশকে ম্যাচে অত্যন্ত সুবিধাজনক ও স্বস্তিদায়ক অবস্থানে নিয়ে গেছে।
