দেশের ক্রিকেটের অগ্রগতি ও ব্যাটিং উন্নয়নে বিসিবির দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা

বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের ব্যাটিং দুর্বলতা দূর করাসহ সার্বিক পারফরম্যান্সের মানোন্নয়নে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করছে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড (বিসিবি)। সরকারের এই উদ্যোগের ফলে বর্তমান বোর্ডের নেতৃত্বে ভবিষ্যতে দেশের ক্রিকেট আরও গতিশীল হবে এবং ব্যাটিং ইউনিট অতীতের যেকোনো সময়ের তুলনায় আরও কার্যকর ভূমিকা রাখতে সক্ষম হবে বলে আশা প্রকাশ করা হয়েছে।

মঙ্গলবার (৩০ জুন) জাতীয় সংসদে কুমিল্লা-৯ আসনের সংসদ সদস্য আবুল কালামের এক লিখিত প্রশ্নের জবাবে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী আমিনুল হক এ তথ্য জানান। ডেপুটি স্পিকার কায়সার কামালের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠিত সংসদ অধিবেশনে প্রশ্নোত্তর পর্বে বিষয়টি উত্থাপিত হয়।

তিন বিভাগের সমন্বয়ে বিশেষ গুরুত্ব

জাতীয় দলের সাম্প্রতিক ব্যাটিং বিপর্যয় ও তা কাটিয়ে ওঠার সরকারি পদক্ষেপ সম্পর্কে জানতে চাইলে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বলেন, ক্রিকেটে সাফল্যের মূল চাবিকাঠি হলো ব্যাটিং, বোলিং ও ফিল্ডিং—এই তিন বিভাগের সম্মিলিত পারফরম্যান্স। কোনো একটি নির্দিষ্ট বিভাগের ওপর নির্ভর করে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে টিকে থাকা সম্ভব নয়। এই বিষয়টি মাথায় রেখেই বিসিবি তৃণমূল থেকে শুরু করে জাতীয় স্তর পর্যন্ত একটি সমন্বিত রূপরেখা তৈরি করেছে।

খেলোয়াড়দের ভিত মজবুত করতে একদম প্রাথমিক পর্যায় অর্থাৎ বয়সভিত্তিক দল থেকে শুরু করে হাই পারফরম্যান্স (এইচপি) ইউনিট, বাংলাদেশ ‘এ’ দল এবং মূল জাতীয় দলের ক্রিকেটারদের টেকনিক্যাল, ট্যাকটিক্যাল ও মানসিক দক্ষতা উন্নয়নে বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের প্রবল চাপ সামলানোর জন্য ক্রিকেটারদের মনস্তাত্ত্বিক কাউন্সিলিংয়েরও ব্যবস্থা করা হচ্ছে বলে তিনি উল্লেখ করেন।

আধুনিক প্রযুক্তি ও আন্তর্জাতিক মানের কোচিং স্টাফ

আমিনুল হক জানান, আধুনিক ক্রিকেটের সাথে তাল মিলিয়ে চলতে বিসিবি দেশি-বিদেশি অভিজ্ঞ কোচ, ফিজিও, ট্রেইনার ও পারফরম্যান্স অ্যানালিস্ট নিয়োগ দিয়েছে। বর্তমানে শুধু মূল দলেই নয়, বরং পাইপলাইনে থাকা ক্রিকেটারদের জন্যও আধুনিক প্রযুক্তিনির্ভর বিশ্লেষণ ও নিয়মিত প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করা হয়েছে। ভিডিও অ্যানালিস্টদের মাধ্যমে ব্যাটসম্যানদের পায়ের কাজ, টেকনিক্যাল ত্রুটি এবং প্রতিপক্ষের বোলিং শক্তির ব্যবচ্ছেদ করে নিয়মিত দিকনির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। এই প্রযুক্তিনির্ভর মনিটরিং ব্যবস্থার ইতিবাচক প্রভাব ইতিমধ্যে ক্রিকেটারদের পারফরম্যান্সে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে।

সব ফরম্যাটেই বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দল এখন আগের চেয়ে অনেক বেশি প্রতিদ্বন্দ্বিতাপূর্ণ ক্রিকেট খেলছে। সাম্প্রতিক সময়ে পাকিস্তান ও অস্ট্রেলিয়ার মতো বিশ্ব ক্রিকেটের পরাশক্তিদের বিপক্ষে গুরুত্বপূর্ণ ম্যাচ এবং সিরিজ জয়ের নজির এর বড় প্রমাণ। শুধু পুরুষ দলই নয়, দেশের নারী ক্রিকেট দলও আন্তর্জাতিক অঙ্গনে দারুণ সাফল্য দেখাচ্ছে। আইসিসি নারী টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ২০২৬–এর বাছাইপর্বে পাকিস্তানকে হারিয়ে টাইগ্রেসরা যে নৈপুণ্য দেখিয়েছে, তা দেশের ক্রিকেটের জন্য অন্যতম বড় একটি অর্জন।

ঘরোয়া ক্রিকেট ও নতুন প্রতিভার আগমন

জাতীয় দলের ব্যাটিং শক্তিকে আরও টেকসই করতে ঘরোয়া ক্রিকেটের কাঠামোগত পরিবর্তনের ওপর জোর দেওয়া হচ্ছে। প্রতিমন্ত্রী বলেন, জাতীয় দলের অভিজ্ঞ ব্যাটসম্যানরা যেমন নিয়মিত গুরুত্বপূর্ণ ইনিংস খেলে দলের জয়ে অবদান রাখছেন, ঠিক তেমনি আমাদের ঘরোয়া লিগগুলো এখন নতুন ক্রিকেটার তৈরির মূল কারিগর হিসেবে কাজ করছে।

বাংলাদেশ প্রিমিয়ার লিগ (বিপিএল), ঢাকা প্রিমিয়ার লিগ (ডিপিএল) এবং বিভিন্ন স্তরের বয়সভিত্তিক ক্রিকেট প্রতিযোগিতা থেকে প্রতিবছরই একঝাঁক নতুন প্রতিভা উঠে আসছে। আন্তর্জাতিক মানের এই ঘরোয়া টুর্নামেন্টগুলোতে পারফর্ম করে তরুণ ব্যাটসম্যানরা জাতীয় দলে জায়গা করে নিচ্ছেন এবং আন্তর্জাতিক মঞ্চে নিজেদের সামর্থ্যের প্রমাণ দিচ্ছেন। নতুন ও পুরনোর এই দারুণ সংমিশ্রণ আগামী দিনে বাংলাদেশের ব্যাটিং লাইনআপকে আরও শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য করে তুলবে।

হাডুডুর ঐতিহ্য রক্ষা ও যুব ঋণের পরিধি বৃদ্ধি

ক্রিকেটের পাশাপাশি দেশের অন্যান্য খেলাধুলা ও যুব উন্নয়ন নিয়েও সংসদে আলোচনা হয়। সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সেলিনা সুলতানার এক প্রশ্নের জবাবে আমিনুল হক দুঃখ প্রকাশ করে বলেন, হাডুডু বা কাবাডি বাংলাদেশের জাতীয় খেলা হলেও বর্তমান প্রজন্মের আধুনিক জীবনযাত্রা এবং অন্যান্য খেলার প্রসারের কারণে এর জনপ্রিয়তা আগের তুলনায় কিছুটা ম্লান হয়েছে। তবে ঐতিহ্যবাহী এই খেলার গৌরব ফিরিয়ে আনতে সরকার নানামুখী উদ্যোগ নিচ্ছে।

অন্য এক প্রসঙ্গে, জামায়াতের সংসদ সদস্য সৈয়দ জয়নুল আবেদীনের প্রশ্নের জবাবে যুব ও ক্রীড়া প্রতিমন্ত্রী বেকারত্ব দূরীকরণে সরকারের গৃহীত পদক্ষেপের কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, দেশের তরুণ সমাজকে স্বাবলম্বী এবং আত্মকর্মসংস্থান সৃষ্টির লক্ষ্যে যুব উন্নয়ন অধিদপ্তরের মাধ্যমে দেশব্যাপী ব্যাপক প্রশিক্ষণ কার্যক্রম চালানো হচ্ছে। প্রশিক্ষণ সফলভাবে সমাপ্ত করার পর যুব ও যুবতীদের নিজেদের উদ্যোগ চালু করার জন্য ১ লাখ টাকা থেকে শুরু করে সর্বোচ্চ ৫ লাখ টাকা পর্যন্ত সহজ শর্তে ঋণ প্রদান করা হচ্ছে, যা গ্রামীণ অর্থনীতি সচল রাখতে বড় ভূমিকা রাখছে।

মন্তব্য করুন