আচরণবিধি লঙ্ঘনে আইসিসির শাস্তির মুখে নাহিদ রানা

বাংলাদেশ জাতীয় ক্রিকেট দলের ডানহাতি দ্রুতগতির পেসার নাহিদ রানা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের (আইসিসি) আচরণবিধি (কোড অব কন্ডাক্ট) অমান্য করায় আনুষ্ঠানিকভাবে তিরস্কৃত হয়েছেন। অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে হোম সিরিজের প্রথম ওয়ানডে ম্যাচ চলাকালীন মাঠের ভেতর অনাকাঙ্ক্ষিত এক আচরণ করায় ক্রিকেটের বৈশ্বিক নিয়ন্ত্রক সংস্থা এই শাস্তি ঘোষণা করে। তিরস্কারের পাশাপাশি আইসিসির শৃঙ্খলা নীতি অনুযায়ী এই তরুণ পেসারের নামের পাশে একটি ডিমেরিট পয়েন্টও যোগ করা হয়েছে।

ঘটনার বিবরণ ও আইসিসির সুনির্দিষ্ট অভিযোগ

মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে অনুষ্ঠিত বাংলাদেশ ও অস্ট্রেলিয়ার মধ্যকার সিরিজের প্রথম ওয়ানডে ম্যাচটিতে এই অপ্রীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়। ম্যাচের একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্তে সফরকারী অস্ট্রেলিয়ান ব্যাটার জশ ইংলিসকে আউট করার পর নাহিদ রানা তীব্র আগ্রাসী মনোভাব প্রদর্শন করেন।

নাহিদের বিরুদ্ধে আনীত সুনির্দিষ্ট অভিযোগগুলো নিচে দেওয়া হলো:

  • আক্রমণাত্মক ভঙ্গি: উইকেট নেওয়ার পরপরই নাহিদ রানা সাজঘরের দিকে ফিরে যেতে থাকা ব্যাটার জশ ইংলিসের দিকে সরাসরি এবং অত্যন্ত আগ্রাসী ভঙ্গিতে ছুটে যান।

  • উসকানিমূলক ভাষার ব্যবহার: আইসিসির ম্যাচ অফিশিয়ালদের পর্যবেক্ষণ ও প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই সময় বাংলাদেশি এই পেসার এমন কিছু আপত্তিকর শব্দ বা ভাষা ব্যবহার করেছিলেন, যা প্রতিপক্ষ ব্যাটারকে উসকে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট ছিল।

  • কোড অব কন্ডাক্ট লঙ্ঘন: তার এই আচরণকে ক্রিকেটের সংহতি, ঐতিহ্য এবং খেলোয়াড়সুলভ আচরণের পরিপন্থী হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। এর ফলে তার বিরুদ্ধে আইসিসির খেলোয়াড় ও খেলোয়াড় সহায়তাকারী কর্মীদের আচরণবিধির ২.৫ ধারা ভঙ্গের সুনির্দিষ্ট অভিযোগ আনা হয়।

আইসিসির বিধিমালা ২.৫: কোনো ব্যাটার আউট হওয়ার পর তাকে উদ্দেশ্য করে কোনো ধরনের উসকানিমূলক, অপমানজনক, অবমাননাকর ভাষা ব্যবহার বা অঙ্গভঙ্গি করা আইসিসির নিয়মে লেভেল-১ পর্যায়ের অপরাধ হিসেবে গণ্য হয়। এই ধরনের আচরণ মাঠের ভেতর অপ্রীতিকর ও আক্রমণাত্মক প্রতিক্রিয়ার সৃষ্টি করতে পারে, যা সম্পূর্ণরূপে নিষিদ্ধ।

ম্যাচ অফিশিয়ালদের তাৎক্ষণিক পদক্ষেপ ও শাস্তি নির্ধারণ

ম্যাচ চলাকালীন নাহিদ রানার এই অতিরিক্ত আগ্রাসন মাঠের আম্পায়ারদের নজর এড়ায়নি। ঘটনার পরপরই ম্যাচ পরিচালনার দায়িত্বে থাকা অফিশিয়ালরা বিষয়টি আমলে নেন এবং ম্যাচ রেফারির কাছে লিখিত প্রতিবেদন জমা দেন।

ম্যাচ পরিচালনাকারী অফিশিয়ালদের তালিকা:

দায়িত্বঅফিশিয়ালদের নাম
অন-ফিল্ড আম্পায়ারঅ্যালেক্স ওয়ার্ফ (ইংল্যান্ড) ও গাজী সোহেল (বাংলাদেশ)
তৃতীয় আম্পায়ার (টিভি)আহসান রাজা (পাকিস্তান)
চতুর্থ আম্পায়ারমোরশেদ আলী খান (বাংলাদেশ)
ম্যাচ রেফারিপ্রকাশ ভাট (ভারত)

আইসিসির নিয়ম অনুযায়ী, ম্যাচ অফিশিয়ালদের উত্থাপিত অভিযোগের ভিত্তিতে ম্যাচ রেফারি প্রকাশ ভাট নাহিদ রানার জন্য এই শাস্তি প্রস্তাব করেন। বাংলাদেশের এই তরুণ পেসার মাঠের আম্পায়ারদের আনা অভিযোগ এবং ম্যাচ রেফারির প্রস্তাবিত শাস্তি পুরোপুরিভাবে স্বীকার করে নেন। তিনি নিজের ভুল সানন্দে মেনে নেওয়ার কারণে এই ঘটনার জন্য আইসিসির নিয়ম অনুযায়ী আর কোনো আনুষ্ঠানিক শুনানির প্রয়োজন পড়েনি এবং বিষয়টি সেখানেই চূড়ান্তভাবে মীমাংসা হয়ে যায়।

ডিমেরিট পয়েন্ট ও ভবিষ্যৎ নিষেধাজ্ঞার সমীকরণ

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ক্রিকেটারদের মাঠের শৃঙ্খলা ও খেলোয়াড়সুলভ আচরণ বজায় রাখার জন্য আইসিসির একটি সুনির্দিষ্ট ডিমেরিট পয়েন্ট ব্যবস্থা রয়েছে। নাহিদ রানার এই শাস্তি এবং এর ফলে তৈরি হওয়া ভবিষ্যৎ সমীকরণ নিচে ব্যাখ্যা করা হলো:

  • ২৪ মাসের শৃঙ্খলা রেকর্ড: আইসিসির অফিশিয়াল রেকর্ড অনুযায়ী, গত ২৪ মাসের (দুই বছর) চক্রের মধ্যে এটি নাহিদ রানার দ্বিতীয়বারের মতো শৃঙ্খলাভঙ্গের ঘটনা। প্রথম ওয়ানডের এই নতুন ডিমেরিট পয়েন্টটি যোগ হওয়ার পর বর্তমানে তার ঝুলিতে মোট ডিমেরিট পয়েন্টের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে দুইয়ে।

  • আইসিসির সাসপেনশন নিয়ম: আইসিসির বিদ্যমান নিয়ম ও নীতিমালা অনুযায়ী, কোনো আন্তর্জাতিক ক্রিকেটার যদি ২৪ মাসের একটি নির্দিষ্ট চক্রের মধ্যে চার বা তার বেশি ডিমেরিট পয়েন্ট লাভ করেন, তবে সেই পয়েন্টগুলো সরাসরি সাসপেনশন পয়েন্ট বা ম্যাচ নিষেধাজ্ঞায় রূপান্তরিত হয়।

  • শাস্তির নিয়মাবলী: নিয়মানুযায়ী, কোনো ক্রিকেটারের নামের পাশে দুটি সাসপেনশন পয়েন্ট জমা হলে তাকে একটি টেস্ট ম্যাচ অথবা দুটি ওয়ানডে কিংবা দুটি টি-টোয়েন্টি আন্তর্জাতিক ম্যাচ থেকে নিষিদ্ধ করার বিধান রয়েছে। খেলোয়াড় যে সংস্করণের ম্যাচ আগে খেলবেন, সেই সংস্করণ থেকেই এই নিষেধাজ্ঞা কার্যকর করা হয়।

বর্তমান পরিস্থিতি ও সতর্কতা: বর্তমান গাণিতিক সমীকরণ বিবেচনা করলে দেখা যায় যে, নাহিদ রানার মোট ডিমেরিট পয়েন্ট সংখ্যা দুই হওয়ায় তিনি এই মুহূর্তে সরাসরি কোনো ম্যাচ নিষেধাজ্ঞার ঝুঁকিতে নেই। তবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে নিজের অংশগ্রহণ নিয়মিত রাখতে এবং যেকোনো ধরনের আকস্মিক নিষেধাজ্ঞা এড়াতে ভবিষ্যৎ ম্যাচগুলোতে তাকে মাঠের আচরণ ও শৃঙ্খলার ব্যাপারে অত্যন্ত সতর্ক, সংযত ও দায়িত্বশীল ভূমিকা পালন করতে হবে।

Leave a Comment