ক্রিকেটার নাসির হোসেন ও তাঁর স্ত্রী তামিমা সুলতানা তাম্মির বহু আলোচিত বিয়ে-সংক্রান্ত ফৌজদারি মামলায় আদালত আজ এক চূড়ান্ত রায় প্রদান করেছেন। আজ বুধবার (১০ জুন) বেলা ১২টায় ঢাকার অতিরিক্ত চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট জশিতা ইসলামের আদালত এই মামলার রায় ঘোষণা করেন। রায়ে বিজ্ঞ আদালত আসামিদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ প্রমাণিত না হওয়ায় ক্রিকেটার নাসির হোসেন এবং তামিমা সুলতানা তাম্মিকে সম্পূর্ণ খালাস প্রদান করেছেন। সংশ্লিষ্ট আদালতের বেঞ্চ সহকারী আশুতোষ ভৌমিক রায়ের এই বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে সংবাদমাধ্যমকে নিশ্চিত করেন।
তবে এই রায়ের পর বাদীপক্ষের আইনজীবী ইসরাত হাসান তীব্র অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। তিনি সাংবাদিকদের জানিয়েছেন যে, তারা আদালতের এই রায়ে সন্তুষ্ট নন। বাদীপক্ষ মনে করে, সাক্ষ্য ও প্রমাণের ভিত্তিতে অভিযোগ স্পষ্ট হয়েছে এবং তাঁরা এই রায়ের বিরুদ্ধে অতি দ্রুত উচ্চ আদালতে আপিল দায়ের করবেন। মামলার শুরু থেকেই নাসির হোসেনের পক্ষে আইনজীবী আজিজুর রহমান দুলু এবং তামিমা সুলতানার পক্ষে আইনজীবী মোসলেহ উদ্দিন জসীম আইনি লড়াই পরিচালনা করেন এবং তাঁরা শুনানিতে সকল অভিযোগ অস্বীকার করে আসামিদের নির্দোষ দাবি করে খালাস প্রার্থনা করেছিলেন।
মামলার বিবরণ এবং নথিপত্র থেকে জানা যায়, ২০১১ সালের ২৬ ফেব্রুয়ারি তামিমা সুলতানা তাম্মির সাথে রাকিব হোসেন নামের এক ব্যক্তির প্রথম বিয়ে সম্পন্ন হয়েছিল। তাঁদের সেই দাম্পত্য জীবনে একটি কন্যাসন্তানও জন্মগ্রহণ করে। পরবর্তীতে ২০২১ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে ক্রিকেটার নাসির হোসেনের সাথে তামিমা সুলতানা তাম্মির বিয়ের বেশ কিছু ছবি সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়লে বিষয়টি দেশজুড়ে ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। এর পরিপ্রেক্ষিতে একই বছরের ২৪ ফেব্রুয়ারি ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে একটি মামলা দায়ের করেন তামিমার সাবেক স্বামী রাকিব হোসেন। মামলায় অভিযোগ করা হয়েছিল যে, তাঁদের মধ্যকার প্রথম বৈবাহিক সম্পর্ক আইনগতভাবে সমাপ্ত বা বিচ্ছেদ হওয়ার আগেই তামিমা ক্রিকেটার নাসিরের সাথে দ্বিতীয়বার বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন। তবে শুরু থেকেই নাসির ও তামিমা এই অভিযোগ সম্পূর্ণ অস্বীকার করে দাবি করে আসছিলেন যে, পূর্বের বৈবাহিক সম্পর্ক দেশের প্রচলিত আইন অনুযায়ী যথাযথভাবে শেষ হওয়ার পরই তাঁরা সম্পূর্ণ বৈধ উপায়ে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হয়েছেন।
মামলাটির তদন্ত শেষে ২০২১ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর তৎকালীন তদন্ত কর্মকর্তা শেখ মিজানুর রহমান আদালতে একটি তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল করেন। উক্ত প্রতিবেদনে নাসির হোসেন, তামিমা সুলতানা তাম্মি এবং তামিমার মা সুমি আক্তারকে অভিযুক্ত করা হয়েছিল। পরবর্তীতে ২০২২ সালের ৯ ফেব্রুয়ারি আদালত নাসির ও তামিমার বিরুদ্ধে সুনির্দিষ্ট অভিযোগ গঠন করে আনুষ্ঠানিক বিচার শুরুর নির্দেশ দেন, তবে তামিমার মা সুমি আক্তারকে এই মামলা থেকে স্থায়ীভাবে অব্যাহতি প্রদান করা হয়।
নিচে এই মামলার দীর্ঘ আইনি প্রক্রিয়ার ধারাবাহিক সময়ক্রম ও মূল ঘটনাবলি একটি ছকের মাধ্যমে বিস্তারিত উপস্থাপন করা হলো:
নাসির-তামিমা দম্পতির মামলার আইনি প্রক্রিয়ার ধারাবাহিক বিবরণ
| ক্রমিক নং | বিশেষ ঘটনার বিবরণ | সুনির্দিষ্ট তারিখ ও সময় |
| ১ | তামিমা সুলতানা ও রাকিব হোসেনের প্রথম বিয়ে | ২৬ ফেব্রুয়ারি, ২০১১ |
| ২ | ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে মামলা দায়ের | ২৪ ফেব্রুয়ারি, ২০২১ |
| ৩ | আদালতে তদন্ত প্রতিবেদন দাখিল | ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২১ |
| ৪ | নাসির ও তামিমার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন | ৯ ফেব্রুয়ারি, ২০২২ |
| ৫ | আদালতে মামলার আনুষ্ঠানিক সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু | ২০ মার্চ, ২০২৩ |
| ৬ | মোট ১০ জনের সাক্ষ্যগ্রহণ সমাপ্তি | ১৬ এপ্রিল, ২০২৫ |
| ৭ | উভয় পক্ষের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন সম্পন্ন | ৬ মে, ২০২৬ |
| ৮ | আদালতের চূড়ান্ত রায় ও আসামিদের খালাস | ১০ জুন, ২০২৬ (দুপুর ১২টা) |
আদালতের নথিসূত্রে জানা যায়, ২০২৩ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি আসামিপক্ষের দায়ের করা রিভিশন আবেদন বিজ্ঞ আদালত কর্তৃক খারিজ হয়ে যাওয়ার পর একই বছরের ২০ মার্চ থেকে এই মামলার সাক্ষ্যগ্রহণ শুরু হয়। দীর্ঘ বিচারিক প্রক্রিয়ায় আদালত মোট ১০ জন সাক্ষীর গুরুত্বপূর্ণ সাক্ষ্য গ্রহণ করেন। ২০export৫ সালের ১৬ এপ্রিল সাক্ষ্যগ্রহণ প্রক্রিয়া সমাপ্ত হওয়ার পর, চলতি বছরের মার্চ মাসে আসামিদের আত্মপক্ষ সমর্থনের ওপর শুনানি অনুষ্ঠিত হয় এবং তামিমা সুলতানা নিজের পক্ষে আদালতে সাফাই সাক্ষ্য প্রদান করেন। অবশেষে গত ৬ মে উভয় পক্ষের আইনজীবীদের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ হওয়ার পর আদালত রায়ের জন্য আজকের দিন অর্থাৎ ১০ জুন ধার্য করেছিলেন। দীর্ঘ শুনানি ও তথ্য-প্রমাণ পর্যালোচনা শেষে আজ আদালত এই দম্পতিকে খালাস দেওয়ার মাধ্যমে মামলার পরিসমাপ্তি ঘটান।
