গতি না কমিয়ে নাহিদকে আগলে রাখার পরামর্শ ডোনাল্ডের

মিরপুর টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে ৪০ রানে ৫ উইকেট নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রে উঠে এসেছেন বাংলাদেশের তরুণ পেসার নাহিদ রানা। তাঁর এই দুর্দান্ত পারফরম্যান্স শুধু দেশেই নয়, আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অঙ্গনেও ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে। নাহিদের এমন সাফল্যে উচ্ছ্বসিত প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন বাংলাদেশের সাবেক বোলিং কোচ এবং দক্ষিণ আফ্রিকার কিংবদন্তি পেসার অ্যালান ডোনাল্ড। ক্রিকেটভিত্তিক ওয়েবসাইট ‘ক্রিকব্লগ’-কে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি জানিয়েছেন, নাহিদের এই পারফরম্যান্স তাঁর কাছে অপ্রত্যাশিত নয়, বরং শুরু থেকেই তিনি এই পেসারের বিশেষ সামর্থ্য সম্পর্কে আশাবাদী ছিলেন।

বাংলাদেশ জাতীয় দলের বোলিং কোচ হিসেবে দায়িত্ব পালনকালে নাহিদ রানাকে খুব কাছ থেকে পর্যবেক্ষণের সুযোগ পান অ্যালান ডোনাল্ড। তিনি স্মৃতিচারণ করে বলেন, চট্টগ্রামে তিন দিনের একটি কন্ডিশনিং ক্যাম্পে প্রথমবার নাহিদকে নেটে দেখেই তিনি বিশেষভাবে মুগ্ধ হয়েছিলেন। তাঁর মতে, নাহিদের সহজাত গতি, স্বাভাবিক বোলিং অ্যাকশন এবং উচ্চতার কারণে পিচ থেকে অতিরিক্ত বাউন্স আদায়ের সক্ষমতা তাঁকে আলাদা করে চিনিয়েছে।

ডোনাল্ডের ভাষায়, উইকেটের বিশেষ সহায়তা ছাড়াই শরীরের স্বাভাবিক শক্তি থেকে এমন গতি তৈরি করা বিরল প্রতিভার পরিচায়ক। তিনি উল্লেখ করেন, এই ধরনের গতি কোচিংয়ের মাধ্যমে শেখানো সম্ভব নয়, এটি স্বাভাবিকভাবে পাওয়া এক বিশেষ সক্ষমতা।

তিনি আরও জানান, নাহিদের লাইন-লেংথ এবং স্বাভাবিক রিদমও তাঁকে তখনই আকৃষ্ট করেছিল। এ কারণেই চট্টগ্রামের পর তাঁকে ঢাকায় নেটে আরও কাছ থেকে পর্যবেক্ষণের জন্য ডাকা হয়েছিল। ডোনাল্ড বলেন, তৎকালীন প্রধান কোচ রাসেল ডোমিঙ্গো তখনই নাহিদকে জাতীয় দলে অন্তর্ভুক্তির বিষয়ে গুরুত্ব দিয়ে বিবেচনা করেছিলেন।

তবে সে সময় জাতীয় দলে তাসকিন আহমেদ, এবাদত হোসেন এবং শরীফুল ইসলামের মতো অভিজ্ঞ ও ফর্মে থাকা পেসারদের উপস্থিতির কারণে নাহিদের সুযোগ পাওয়া সম্ভব হয়নি। ডোনাল্ডের মতে, প্রতিযোগিতাপূর্ণ পেস আক্রমণে জায়গা পাওয়া কঠিন ছিল, তবে তাঁর সম্ভাবনা নিয়ে কখনোই সন্দেহ ছিল না।

মিরপুর টেস্টের পঞ্চম দিনের বিকেলের বোলিং স্পেল বিশেষভাবে মুগ্ধ করেছে এই দক্ষিণ আফ্রিকান কিংবদন্তিকে। তাঁর মতে, নাহিদ গতি ও আক্রমণাত্মক বোলিংয়ের মাধ্যমে প্রতিপক্ষ ব্যাটিং লাইনআপকে চাপে ফেলে দিয়েছেন, যা ভবিষ্যতের জন্য বড় সম্ভাবনার ইঙ্গিত বহন করে।

নাহিদকে পরামর্শ দিতে গিয়ে ডোনাল্ড বলেন, এই মুহূর্তে তাঁর সবচেয়ে বড় শক্তি হলো গতি। শুরুতে কিছু রান দেওয়া, ওয়াইড হওয়া বা মার খাওয়া স্বাভাবিক। তবে তাঁর মতে, ভুল বল হলেও সেটি যেন ১৪৮ থেকে ১৫০ কিলোমিটার গতির মধ্যে থাকে। কারণ এমন গতির বোলারের বিরুদ্ধে ব্যাটাররা কখনোই স্বাচ্ছন্দ্যে খেলতে পারে না।

নিজের এবং অস্ট্রেলিয়ার সাবেক গতিতারকা ব্রেট লির ক্যারিয়ারের উদাহরণ টেনে ডোনাল্ড বলেন, তাঁরাও ক্যারিয়ারের শুরুতে প্রচুর রান দিয়েছেন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে লাইন-লেংথ এবং নিয়ন্ত্রণে উন্নতি এসেছে। নাহিদের ক্ষেত্রেও একই প্রক্রিয়া ধীরে ধীরে ঘটবে বলে তিনি মনে করেন।

ডোনাল্ডের মতে, তরুণ এই পেসারের ক্ষেত্রে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তাঁর স্বাভাবিক গতি কোনোভাবেই কমতে দেওয়া যাবে না। তিনি বলেন, টিম ম্যানেজমেন্টের উচিত তাঁকে নিজের স্বাভাবিক গতিতে বোলিং করার পূর্ণ স্বাধীনতা দেওয়া, অতিরিক্ত নিয়ন্ত্রণ চাপিয়ে না দেওয়া।

সাক্ষাৎকারের শেষাংশে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ডের (বিসিবি) প্রতি গুরুত্বপূর্ণ পরামর্শও দেন ডোনাল্ড। তিনি বলেন, নাহিদ রানার মতো প্রতিভাবান পেসারকে সঠিকভাবে পরিচালনা করাই এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। তাঁকে সব ফরম্যাটে খেলানো হলেও প্রয়োজন অনুযায়ী পর্যাপ্ত বিশ্রাম দিতে হবে।

ডোনাল্ডের ভাষায়, এমন সম্ভাবনাময় ম্যাচ-উইনারকে দীর্ঘমেয়াদে ধরে রাখতে হলে সুপরিকল্পিত ব্যবস্থাপনা জরুরি। যথাযথ যত্ন ও সঠিক পরিকল্পনা থাকলে নাহিদ রানা দীর্ঘ সময় ধরে বাংলাদেশ ক্রিকেটকে গুরুত্বপূর্ণ সেবা দিতে সক্ষম হবেন বলেই তাঁর বিশ্বাস।

Leave a Comment