মিসেস গান্ধীর আশীর্বাদে হাঁটতে শিখেছিল দেশের মহিলা ক্রিকেট: রাজু মুখোপাধ্যায়ের চোখে ইতিহাস

বিশ্বকাপ জয়ের পর ভারতবর্ষে মহিলা ক্রিকেটে নতুন প্রাণ সঞ্চারিত হয়েছে। দেশের সর্বত্র সমাদৃত হচ্ছেন হরমনপ্রীত কৌর, স্মৃতি মান্ধানা ও রিচা ঘোষরা। সংবর্ধনা চলছে একের পর এক। কিন্তু কি অবস্থা ছিল দেশে মহিলা ক্রিকেটের প্রথম দিনগুলোতে? সেই ইতিহাসকে কলমে ধরেছেন ক্রীড়া সাংবাদিক রাজু মুখোপাধ্যায়।

রাজু লিখেছেন, “বিগত কয়েক দিন আমি উত্তরবঙ্গে অবস্থান করেছি। শিলিগুড়িতে থাকাকালীন, বিশ্বজয়ী বাঙালি ক্রিকেটার রিচা ঘোষ নিজের জন্মশহরে ফিরেছিলেন। সেখানে যে পরিমাণ উল্লাস ও উৎসব চলছিল, তা আমি প্রত্যক্ষ করেছি। প্রথমবারের মতো বাংলার কোনও প্লেয়ার ক্রিকেট-গোল্ড নিয়ে এলেন বিশ্বকাপ থেকে। পুরুষ বা মহিলা, কোনো ক্রিকেটারই এর আগে এমন কীর্তি দেখাতে পারেননি। এক কথায়, অনবদ্য। চিরকাল ভারত ও বাংলার ক্রিকেটে রিচার নাম স্বর্ণাক্ষরে লেখা থাকবে।”

রাজু আরও বলেছেন, “রিচার উত্তরবঙ্গের মেয়েটি। শিলিগুড়ির মেয়ে। সুযোগ পেয়েছে তা কাজে লাগিয়ে বিশ্বজয়ী হয়েছে। তার পেছনে তার বাবা-মা, কোচদের অবদান বিশেষভাবে মনে রাখতে হবে। রিচা বাংলার ক্রিকেটকে এক নতুন পর্যায়ে নিয়ে গেছে।”

তিনি ব্যাখ্যা করেছেন কেন রিচার অবদান আলাদা: “কেউ যদি কম বলে বেশি রান করে দেশকে ম্যাচ জেতায়, তার গুরুত্ব আলাদা। রিচা বিশ্বকাপে বারবার সেটিই করেছেন। কম বল খেলে বেশি রান করা, যাকে বলে ফিনিশার। ভারতবর্ষে আমরা ক্রিকেটারের সংখ্যা বা সেঞ্চুরির দিকে বেশি মনোযোগ দিই। কিন্তু লোয়ার অর্ডারে নেমে কম বলে বেশি রান করা সহজ নয়। যা রিচা দেখিয়েছে, তা পৃথিবীর অনেক ক্রিকেটার করতে পারেনি।”

রাজু মুখোপাধ্যায় তুলে ধরেছেন ভারতের মহিলা ক্রিকেটের ইতিহাসও। “ভারতে প্রথম মহিলা ক্রিকেট সংস্থা প্রতিষ্ঠিত হয় ১৯৭১ সালে। নাম ছিল আইডব্লিউসিএ – ইন্ডিয়ান উইমেন্স ক্রিকেট অ্যাসোসিয়েশন। লখনউতে জন্ম নিয়েছিল এই সংস্থা। মিসেস গান্ধীর আশীর্বাদ না থাকলে আইডব্লিউসিএ সৃষ্টিই হত না। সেই সময় দেশকে দুইভাগ করা হয়েছিল, বাংলাদেশ জন্ম নিয়েছিল। মিসেস গান্ধী চাইছিলেন দেশের মহিলারা সার্বিকভাবে এগিয়ে আসুন, সব ক্ষেত্রে। আজকের ভারতীয় মহিলা ক্রিকেটের উত্থানে তার অবদান অস্বীকার করা যায় না।”

রাজু আরও লিখেছেন, “মিসেস গান্ধীকে উদ্যোগী দেখে বাংলায় এগিয়ে এসেছিলেন সিদ্ধার্থশঙ্কর রায়। তিনি ঘোষণা করেন, সিএবিতে মহিলা ক্রিকেট শুরু করতে হবে। তৎকালীন সিএবি কর্মকর্তারা তা শুনে বিস্মিত হন। কালীঘাট ক্লাবের নতুবাবু তাঁর অসাধারণ উদ্যোগের সঙ্গে মহিলা ক্রিকেটারদের জন্য মাঠ ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করেন। ট্রেনিং শুরু হয় ভোরবেলা, ছেলেদের টিম দুপুরে ট্রেনিং করত। প্রদ্যুৎ মিত্র মহিলা টিমের কোচ হিসেবে দায়িত্ব নেন। প্রশিক্ষণের ফলস্বরূপ উঠে আসে শ্রীরূপা বসু, লোপামুদ্রা ভট্টাচার্য, সন্ধ্যা মজুমদার, শর্মিলা চক্রবর্তী। দক্ষিণ ভারতের শান্তা রঙ্গস্বামী ও মুম্বইয়ের ডায়না এডুলজি। শর্মিলা, শান্তা ও ডায়না অচিরেই ভারতীয় ক্রিকেটের ত্রিমূর্তিতে পরিণত হন।”

রাজু মুখোপাধ্যায়ের কথায়, “মিসেস গান্ধীর আশীর্বাদে ভারতীয় মহিলা ক্রিকেট হাঁটতে শিখেছিল। এবং সেই শুরুর প্রেরণা আজও দেশের ক্রিকেটকে আলোকিত করে।”

Leave a Comment