নারী ক্রিকেটারদের মাতৃত্বকালীন বিরতির পর নিরাপদ ও পরিকল্পিতভাবে খেলায় ফেরার সুযোগ করে দিতে এক যুগান্তকারী পদক্ষেপ নিয়েছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিল (আইসিসি)। সন্তান জন্মদানের পর খেলোয়াড়দের ক্যারিয়ার যেন থমকে না যায়, সেই লক্ষ্যে সংস্থাটি প্রকাশ করেছে ‘রিটার্ন টু প্লে পোস্ট-প্রেগন্যান্সি গাইডলাইন’।
পেশাদার ক্রিকেটের ব্যস্ত সূচির মাঝে অনেক নারী ক্রিকেটারই এখন ক্যারিয়ার ও পরিবার একসঙ্গে সামলানোর সিদ্ধান্ত নিচ্ছেন। আইসিসির এই নতুন নির্দেশিকাটি ক্রিকেটার, সদস্য দেশগুলোর ক্রিকেট বোর্ড, চিকিৎসক এবং কোচদের জন্য একটি সহায়ক কাঠামো হিসেবে কাজ করবে। এর মূল লক্ষ্য হলো সন্তান প্রসবের পর একজন নারী ক্রিকেটারের শারীরিক ও মানসিক সুস্থতা নিশ্চিত করে ধাপে ধাপে তাকে আবার প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে ফিরিয়ে আনা। বর্তমানে নারী ক্রিকেটের সামগ্রিক স্বাস্থ্য ও কল্যাণকে আইসিসি তাদের ছয়টি কৌশলগত অগ্রাধিকারের অন্যতম হিসেবে বিবেচনা করছে। এর আগে ‘১০০% ক্রিকেট’ উদ্যোগের আওতায় নারী ক্রিকেটারদের স্বাস্থ্যসচেতনতা বৃদ্ধি এবং বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে খোলামেলা আলোচনার পরিবেশ তৈরি করেছিল বিশ্ব ক্রিকেটের এই নিয়ন্ত্রক সংস্থা।
ক্রিকেটে ফেরার ‘৬ আর’ মডেল
নতুন এই নির্দেশিকায় মাতৃত্বকালীন ছুটি কাটিয়ে ক্রিকেটারদের মাঠে ফেরার প্রক্রিয়াটিকে বিজ্ঞানসম্মত এবং ঝুঁকিমুক্ত করতে ‘৬ আর’ (6 Rs) নামের একটি বিশেষ ধাপভিত্তিক মডেল প্রস্তাব করা হয়েছে। এই কাঠামোটি একজন খেলোয়াড়কে পুরোপুরি ফিট হয়ে মাঠে নামতে ধাপে ধাপে সাহায্য করবে। ধাপগুলো নিচে বিস্তারিত আলোচনা করা হলো:
রেডি (Ready): সন্তান জন্মের পর প্রাথমিক ধাপে খেলোয়াড়ের শরীরকে পুরোপুরি বিশ্রামের সুযোগ দেওয়া এবং পুনরুদ্ধারের জন্য প্রস্তুত করা।
রিভিউ (Review): বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক ও ফিজিওর মাধ্যমে খেলোয়াড়ের শারীরিক ও মানসিক স্বাস্থ্যের সার্বিক অবস্থা পরীক্ষা ও মূল্যায়ন করা।
রিস্টোর (Restore): হালকা ব্যায়াম ও থেরাপির মাধ্যমে শরীরের ভেতরের শক্তি এবং স্বাভাবিক কার্যক্ষমতা ধীরে ধীরে ফিরিয়ে আনা।
রিকন্ডিশন (Recondition): ক্রিকেটের উপযোগী নির্দিষ্ট ফিটনেস এবং শক্তি বাড়ানোর জন্য পরিকল্পিত অনুশীলন শুরু করা।
রিটার্ন (Return): পুরোপুরি ফিটনেস ফিরে পাওয়ার পর নেট সেশন এবং ঘরোয়া ম্যাচ খেলার মাধ্যমে প্রতিযোগিতামূলক ক্রিকেটে প্রত্যাবর্তন করা।
রিফাইন (Refine): আন্তর্জাতিক ম্যাচ খেলার পাশাপাশি খেলোয়াড়ের পারফরম্যান্স ও শারীরিক অবস্থা নিয়মিত পর্যবেক্ষণ করা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী অনুশীলনে পরিবর্তন আনা।
সুযোগ-সুবিধা ও বাস্তবায়ন
আইসিসির মেডিকেল অ্যাডভাইজরি কমিটির সদস্য এবং অস্ট্রেলিয়া নারী ক্রিকেট দলের অভিজ্ঞ চিকিৎসক ডা. ফিলিপা ইনজের নেতৃত্বে এই নির্দেশিকাটি তৈরি করা হয়েছে। এতে শুধু মাঠের ফিটনেস নয়, বরং একজন মায়ের মানসিক স্বস্তি ও শিশুর সুরক্ষার বিষয়টিও বিশেষভাবে বিবেচনা করা হয়েছে।
নির্দেশিকা অনুযায়ী, মা হওয়ার পর একজন ক্রিকেটারকে নমনীয় অনুশীলনের পরিবেশ দিতে হবে। এর মধ্যে রয়েছে স্টেডিয়াম বা ভেন্যুতে শিশুকে বুকের দুধ খাওয়ানোর নিরাপদ ব্যবস্থা, শিশুর দেখভালের জন্য উপযুক্ত পরিবেশ, প্রয়োজনে বিশেষ ভ্রমণ সহায়তা এবং প্রশিক্ষণ সুবিধা ব্যবহারের অবারিত সুযোগ।
ডা. ফিলিপা ইনজে এই বিষয়ে বলেন, সন্তান জন্ম দেওয়া মানেই একজন নারী ক্রিকেটারের বর্ণিল ক্যারিয়ারের ইতি ঘটে যাওয়া নয়—আইসিসি বিশ্বকে ঠিক এই বার্তাই দিতে চায়। বিভিন্ন দেশের বাস্তবতা, সংস্কৃতি ও ক্রিকেট বোর্ডের সক্ষমতা অনুযায়ী এই নির্দেশিকাটি ব্যবহার করা যাবে। তবে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো, প্রতিটি ক্রিকেটার ও তার পরিবারের প্রয়োজনকে সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার দিয়ে ব্যক্তিগতভাবে সহায়তা নিশ্চিত করা।
বাস্তব অভিজ্ঞতা ও খেলোয়াড়দের ভাবনা
আইসিসির এই মানবিক ও আধুনিক উদ্যোগকে সাধুবাদ জানিয়েছেন ওয়েস্ট ইন্ডিজের তারকা ক্রিকেটার আফি ফ্লেচার। তিনি নিজেই একজন সফল মা এবং পেশাদার ক্রিকেটার। ২০২১ সালে সন্তান জন্ম দেওয়ার পর সব বাধা পেরিয়ে তিনি আবারও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ফিরেছেন এবং দেশের হয়ে আইসিসি নারী ক্রিকেট বিশ্বকাপ ২০২৬-এ অংশ নিচ্ছেন।
নিজের কঠিন লড়াইয়ের অভিজ্ঞতা ভাগ করে নিয়ে ফ্লেচার বলেন, মা হওয়ার পর শারীরিকভাবে ফিট হয়ে ওঠা যতটা না কঠিন ছিল, তার চেয়ে মনস্তাত্ত্বিকভাবে অনেক বেশি কঠিন ছিল বুকের সন্তানকে ঘরে রেখে মাঠে ফেরা। তবে শেষ পর্যন্ত সন্তানের নিষ্পাপ মুখ আর অনুপ্রেরণাই তাকে মাঠে লড়ে যাওয়ার শক্তি জুগিয়েছে। তিনি মনে করেন, ক্রিকেট বোর্ডগুলোর জন্য আইসিসির এই সুনির্দিষ্ট নীতিমালা খেলোয়াড়দের পরিবার গঠন ও ক্রিকেট ক্যারিয়ারের মধ্যে একটি চমৎকার ভারসাম্য বজায় রাখতে সাহায্য করবে।
অন্যদিকে আইসিসির বর্তমান চেয়ারম্যান জয় শাহ নারী ক্রিকেটের এই রূপান্তর নিয়ে বেশ আশাবাদী। তিনি জানান, নারী ক্রিকেটের দীর্ঘমেয়াদি ও টেকসই উন্নয়নের জন্য খেলোয়াড়দের জীবনের প্রতিটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায়ে পাশে থাকা ক্রিকেট বোর্ডগুলোর দায়িত্ব। কোনো নারী ক্রিকেটারকে যেন মাতৃত্বের আনন্দ উপভোগ করা এবং দেশের হয়ে গৌরব বয়ে আনার মধ্যে যেকোনো একটিকে বেছে নিতে না হয়, আইসিসি সেটাই নিশ্চিত করতে চায়। নতুন এই নির্দেশিকা বিশ্বজুড়ে নারী ক্রিকেটারদের জন্য আরও অন্তর্ভুক্তিমূলক এবং বৈষম্যহীন পরিবেশ গড়ে তুলবে, যা ভবিষ্যৎ প্রজন্মের মেয়েদের ক্রিকেটে আসতে আরও বেশি উদ্বুদ্ধ করবে।
![মাতৃত্ব শেষে নারী ক্রিকেটারদের মাঠে ফেরাতে আইসিসির নতুন নির্দেশিকা 1 মাতৃত্ব শেষে নারী ক্রিকেটারদের মাঠে ফেরাতে আইসিসির নতুন নির্দেশিকা 1 Cricket Gurukul [ ক্রিকেট গুরুকুল ] GOLN](https://cricketgoln.com/wp-content/uploads/2026/06/মাতৃত্ব-শেষে-নারী-ক্রিকেটারদের-মাঠে-ফেরাতে-আইসিসির-নতুন-নির্দেশিকা-1.png)