মিরপুর শেরে বাংলা জাতীয় ক্রিকেট স্টেডিয়ামে ২০২৬ সালের ৮ মে শুরু হওয়া বাংলাদেশ ও পাকিস্তানের মধ্যকার দুই ম্যাচ সিরিজের প্রথম টেস্টে এক ঐতিহাসিক মাইলফলক স্পর্শ করেছেন নাজমুল হোসেন শান্ত ও মুমিনুল হক। পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট ক্রিকেটে তৃতীয় উইকেট জুটিতে নতুন রানের রেকর্ড গড়েছেন এই দুই অভিজ্ঞ ব্যাটার। এর মাধ্যমে তারা ২০০৩ সালে জাভেদ ওমর ও মোহাম্মদ আশরাফুলের গড়া দীর্ঘ ২৩ বছরের পুরনো একটি রেকর্ড ভেঙে নতুন ইতিহাস রচনা করেছেন।
মিরপুর টেস্টের সূচনা ও বিপর্যয় মোকাবিলা
ম্যাচের প্রথম দিনে টস হেরে ব্যাটিংয়ে নামা বাংলাদেশের ইনিংসের শুরুটা ছিল বিপর্যয়কর। দলীয় স্কোরবোর্ডে মাত্র ৩১ রান যোগ হতেই দুই ওপেনারকে হারিয়ে চাপে পড়ে স্বাগতিক দল। পাকিস্তানের বোলিং তোপের মুখে ইনিংসের শুরুতে এই ধস সামাল দিতে মাঠে নামেন মুমিনুল হক এবং বর্তমান অধিনায়ক নাজমুল হোসেন শান্ত।
শান্ত তার সাম্প্রতিক সাদা বলের ক্রিকেটের দুর্দান্ত ফর্মকে লাল বলের ক্রিকেটেও সফলভাবে টেনে আনেন। অন্যদিকে, মুমিনুল হক তার চিরাচরিত রক্ষণাত্মক এবং ধৈর্যশীল ব্যাটিংয়ের মাধ্যমে ইনিংস পুনর্গঠনে মনোযোগ দেন। দুইজনের সময়োপযোগী ব্যাটিংয়ে প্রাথমিক বিপর্যয় কাটিয়ে ওঠে বাংলাদেশ।
১৭০ রানের অবিচ্ছিন্ন জুটি ও নতুন রেকর্ড
তৃতীয় উইকেটে এই দুই ব্যাটার ২৫৭ বল মোকাবিলা করে ১৭০ রানের একটি শক্তিশালী ও অবিচ্ছিন্ন জুটি গড়ে তোলেন। পাকিস্তানি বোলারদের কোনো সুযোগ না দিয়ে তারা দিনের শেষ ভাগ পর্যন্ত ব্যাটিং শাসন করেন। এই ১৭০ রানের পার্টনারশিপের মাধ্যমে পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের তৃতীয় উইকেটে সর্বোচ্চ রানের নতুন রেকর্ডটি প্রতিষ্ঠিত হয়।
দীর্ঘ ২৩ বছরের পুরনো রেকর্ডের অবসান
এর আগে পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট ক্রিকেটে তৃতীয় উইকেট জুটিতে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ সংগ্রহের রেকর্ডটি ছিল ১৩০ রানের। ২০০৩ সালে পাকিস্তানের পেশোয়ার টেস্টের প্রথম ইনিংসে এই রেকর্ডটি গড়েছিলেন তৎকালীন ওপেনার জাভেদ ওমর এবং মিডল অর্ডার ব্যাটার মোহাম্মদ আশরাফুল। সেই ইনিংসে দলীয় ১৮০ রানে দ্বিতীয় উইকেটের পতনের পর তারা জুটিবদ্ধ হয়েছিলেন।
পেশোয়ার টেস্টের সেই জুটিতে জাভেদ ওমর ১১৯ রানের একটি সেঞ্চুরি এবং মোহাম্মদ আশরাফুল ৭৭ রান করেছিলেন। যদিও তাদের সেই লড়াকু জুটির পরেও বাংলাদেশ শেষ পর্যন্ত ম্যাচটি ৯ উইকেটের ব্যবধানে পরাজিত হয়েছিল। দীর্ঘ দুই দশক পর শান্ত ও মুমিনুলের ১৭০ রানের জুটি সেই পরিসংখ্যানকে অনেক পেছনে ফেলে দিল।
পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের শীর্ষ টেস্ট জুটিসমূহ
পাকিস্তানের বিপক্ষে টেস্ট ক্রিকেটে যেকোনো উইকেটে বাংলাদেশের সর্বোচ্চ রানের জুটির রেকর্ডটি এখনো তামিম ইকবাল ও ইমরুল কায়েসের দখলে। ২০১৫ সালে খুলনা টেস্টের দ্বিতীয় ইনিংসে ওপেনিং জুটিতে তারা ৩১২ রান যোগ করেছিলেন। সেই ঐতিহাসিক ইনিংসে তামিম ইকবাল ২০৬ রানের মহাকাব্যিক ডাবল সেঞ্চুরি এবং ইমরুল কায়েস ১৫০ রানের অনবদ্য ইনিংস খেলেছিলেন। প্রথম ইনিংসে ২৯৬ রানে পিছিয়ে থেকেও তাদের এই জুটির কল্যাণে বাংলাদেশ ম্যাচটি ড্র করতে সক্ষম হয়েছিল।
এক নজরে পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের সেরা তিন পার্টনারশিপ:
| উইকেট | ব্যাটারদ্বয় | রান | সাল | ভেন্যু |
| ১ম উইকেট | তামিম ইকবাল ও ইমরুল কায়েস | ৩১২ | ২০১৫ | খুলনা |
| ৩য় উইকেট | নাজমুল হোসেন শান্ত ও মুমিনুল হক | ১৭০* | ২০২৬ | মিরপুর |
| ৩য় উইকেট | জাভেদ ওমর ও মোহাম্মদ আশরাফুল | ১৩০ | ২০০৩ | পেশোয়ার |
তৃতীয় উইকেটে শান্ত-মুমিনুলের বৈশ্বিক সাফল্য
নাজমুল হোসেন শান্ত ও মুমিনুল হকের মধ্যকার ব্যাটিং রসায়ন টেস্ট ক্রিকেটে এর আগেও বাংলাদেশকে বড় সাফল্য এনে দিয়েছে। সকল প্রতিপক্ষের বিপক্ষে টেস্ট ক্রিকেটে তৃতীয় উইকেট জুটিতে বাংলাদেশের সর্বকালের সর্বোচ্চ রানের রেকর্ডটিও এই দুই ব্যাটারেরই দখলে।
২০২১ সালে শ্রীলঙ্কার পাল্লেকেলেতে অনুষ্ঠিত টেস্টের প্রথম ইনিংসে তারা তৃতীয় উইকেটে ২৪২ রানের বিশাল এক পার্টনারশিপ গড়েছিলেন। সেই ম্যাচে শান্ত ১৬৩ এবং মুমিনুল ১২৭ রান করেন, যার ফলশ্রুতিতে টেস্টটি ড্র হয়েছিল। বর্তমান পাকিস্তানের বিপক্ষে জুটির ১৭০ রান তাদের ক্যারিয়ারের এবং বাংলাদেশের টেস্ট ইতিহাসের অন্যতম সেরা অর্জন হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
পরিসংখ্যানগত গুরুত্ব ও উপসংহার
২৩ বছর পর পুরনো রেকর্ড ভেঙে যাওয়া এটিই প্রমাণ করে যে, আধুনিক টেস্ট ক্রিকেটে বাংলাদেশের ব্যাটারদের মধ্যে দীর্ঘ সময় ক্রিজে টিকে থেকে বড় সংগ্রহের দিকে যাওয়ার মানসিকতা ও সামর্থ্য বৃদ্ধি পেয়েছে। বিশেষ করে শুরুর ধাক্কা সামলে নিয়ে যেভাবে তারা দলের নিয়ন্ত্রণ গ্রহণ করেছেন, তা দলগত আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধিতে সহায়ক হবে। মিরপুর টেস্টের বাকি দিনগুলোতে এই জুটির ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে বাংলাদেশ বড় কোনো সংগ্রহের দিকে এগিয়ে যেতে পারে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়।
পুরনো পরিসংখ্যান অনুযায়ী, পাকিস্তানের বিপক্ষে বাংলাদেশের ৩য় উইকেটে এই নতুন রেকর্ডটি দীর্ঘ সময় ধরে স্মরণীয় হয়ে থাকবে। এটি কেবল একটি রানের মাইলফলক নয়, বরং এটি বাংলাদেশের টেস্ট ক্রিকেটের ধারাবাহিকতা ও উন্নতির প্রতিফলন। মুমিনুল ও শান্তর এই অবিচ্ছিন্ন জুটি ম্যাচের পরবর্তী দিনগুলোতে আরও শক্তিশালী অবস্থান তৈরি করবে বলে ক্রীড়া বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
![পাকিস্তানের বিপক্ষে শান্ত ও মুমিনুলের নতুন ব্যাটিং রেকর্ড 1 পাকিস্তানের বিপক্ষে শান্ত ও মুমিনুলের নতুন ব্যাটিং রেকর্ড Cricket Gurukul [ ক্রিকেট গুরুকুল ] GOLN](https://cricketgoln.com/wp-content/uploads/2026/05/পাকিস্তানের-বিপক্ষে-শান্ত-ও-মুমিনুলের-নতুন-ব্যাটিং-রেকর্ড.png)