শেফালি ভার্মার জীবনের গল্প সিনেমার চেয়েও উত্তেজনাপূর্ণ! শুরুতে ভারতের বিশ্বকাপ স্কোয়াডে তার নাম ছিল না। তবে ভাগ্য তার পাশে ছিল। যখন ইনফর্ম ওপেনার প্রতীকা রাওয়াল লিগ পর্বের শেষ ম্যাচে চোট পান, তখন শেফালির বিশ্বকাপ স্কোয়াডে আসার সুযোগ আসে। সেমিফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে তিনি জ্বলে উঠতে পারেননি, তবে ফাইনালের জন্য যেন সেরাটা জমিয়ে রেখেছিলেন। দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে তার ক্যারিয়ারসেরা ৮৭ রানের ইনিংস ও পরে দুটি গুরুত্বপূর্ণ উইকেট নিয়ে ভারতকে তাদের প্রথম নারী ক্রিকেট বিশ্বকাপ শিরোপা এনে দেন।
গত ২ নভেম্বর মুম্বাইয়ের ডিওয়াই পাতিল স্টেডিয়ামে নারী ওয়ানডে বিশ্বকাপের ফাইনালে দক্ষিণ আফ্রিকাকে ৫২ রানে হারিয়ে ভারত প্রথমবারের মতো বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়। ৭৮ বলে ৮৭ রান এবং দুটি উইকেট শিকার করে শেফালি ভার্মা নির্বাচিত হন ম্যান অফ দ্য ফাইনাল। লরা উলভার্টের ১০১ রানের দুর্দান্ত ইনিংসও প্রোটিয়াদের শিরোপা এনে দিতে পারেনি।
শেফালির আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয়েছিল মাত্র ১৬ বছর বয়সে। আগ্রাসী ব্যাটার হিসেবে তার পরিচিতি হলেও, ৫০ ওভারের ক্রিকেটে ধারাবাহিকতার অভাবে এক সময় তাকে নির্বাচকদের পছন্দের তালিকা থেকে বাদ দেওয়া হয়েছিল। তবে তার ভাগ্য যেন অন্যরকম ছিল। ওপেনার প্রতীকা রাওয়ালের চোটের কারণে শেফালিকে দলে ফিরিয়ে আনা হয়।
ফাইনালে তার ক্যারিয়ারসেরা ইনিংস খেলেন শেফালি, যা ভারতকে প্রথম বিশ্বকাপ শিরোপা এনে দেয়। রাতারাতি তিনি হয়ে যান ক্রিকেট বিশ্বে নতুন নায়ক। শেফালি বলেন, “আমি শুরু থেকেই বলেছিলাম— ঈশ্বর আমাকে কিছু ভালো করার জন্যই পাঠিয়েছেন, আর আজ সেটা প্রমাণিত হলো। সময়টা কঠিন ছিল, কিন্তু আমি নিজের ওপর বিশ্বাস রেখেছিলাম— শান্ত থাকতে পারলে আমি সবকিছুই অর্জন করতে পারব।”
শেফালি কঠিন পথ পাড়ি দিয়ে ক্রিকেটার হিসেবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তার জীবনের গল্পে রয়েছে সংগ্রাম ও অদম্য মনোবল। হরিয়ানার এক রক্ষণশীল পরিবার থেকে উঠে আসা শেফালি মাত্র ৯ বছর বয়সে ছেলেদের একটি টুর্নামেন্টে খেলেছিলেন, নিজের চুল ছোট করে ছেলেদের মতো দেখতে হতে। ২০২০ সালে এক সাক্ষাৎকারে শেফালি বলেছিলেন, “আমি বাবাকে বলেছিলাম, ভাই অসুস্থ— আমি ওর ছদ্মবেশে খেলব। জার্সিতেও ওর নাম লিখেছিলাম। আমি খেলেছিলাম এবং ম্যাচ ও সিরিজসেরা হয়েছিলাম।”
জাতীয় দলের হয়ে শেফালির অভিষেক হয় ২০১৯ সালে। তার অভিষেকের পরপরই তিনি শচীন টেন্ডুলকারের ৩০ বছরের পুরনো রেকর্ড ভেঙে ভারতের হয়ে সবচেয়ে কম বয়সে আন্তর্জাতিক অর্ধশতক করার রেকর্ড করেন। পরে তিনি ভারতের প্রথম ক্রিকেটার হন, যিনি তিনটি আন্তর্জাতিক ফরম্যাটে (টেস্ট, ওয়ানডে, টি-২০) সবচেয়ে কম বয়সে দেশের প্রতিনিধিত্ব করেছেন। ২০২৩ সালে তিনি ভারতের অনূর্ধ্ব-১৯ মহিলা দলের নেতৃত্ব দিয়ে প্রথমবারের মতো অনূর্ধ্ব-১৯ মহিলা টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ জেতান।
শেফালির বাবা সঞ্জীব ভার্মা রোহতকে একটি গয়নার দোকান চালান এবং মা প্রভীন বালা গৃহিণী। তার পরিবারে এক বড় ভাই সাহিল ভার্মা এবং ছোট বোন ন্যান্সি ভার্মা রয়েছে। শেফালির প্রথম কোচ এবং সবচেয়ে বড় সমর্থক তার বাবা। একসময় তাদের পরিবার কঠিন পরিস্থিতির মধ্যে দিয়ে যায়, যখন তার বাবা প্রতারণার শিকার হয়ে সব টাকা হারিয়ে ফেলেন। শেফালি জানিয়েছেন, এক ব্যক্তি তার বাবাকে চাকরির মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে সমস্ত টাকা হাতিয়ে নেয়।
তবে এসব প্রতিবন্ধকতা শেফালির ক্রিকেটের সাধনায় বাধা হয়ে দাঁড়াতে পারেনি। ক্রিকেট খেলার জন্য লেখাপড়ায় কখনো পিছিয়ে পড়লেও তিনি কখনো হাল ছাড়েননি। রোহতকের সেন্ট পল’স স্কুল এবং মানদীপ সিনিয়র সেকেন্ডারি স্কুলে পড়াশোনা করেছেন তিনি। ২০১৯ সালে দশম শ্রেণিতে অকৃতকার্য হলেও পরের বছর হরিয়ানা ওপেন স্কুল থেকে ৫২% নম্বর পেয়ে পাশ করেন।
বিশ্বকাপের ফাইনালের মতোই, দ্বাদশ শ্রেণির সিবিএসই বোর্ডের পরীক্ষায় শেফালি ৮০% নম্বর পেয়েছিলেন, ইংরেজিতে ১০০-এর মধ্যে ৯৩! সে সময় নিজের ফলাফল ইনস্টাগ্রামে শেয়ার করার পর তা মুহূর্তেই ভাইরাল হয়ে যায়। নির্বাচকদের প্রথমে তাকে দলে না নেওয়া সত্ত্বেও, শেফালি আবারও প্রমাণ করলেন যে তিনি আসল সময়েই সেরা পারফরম্যান্স দেখাতে পারেন।
