আইপিএলে নজিরবিহীন মালিকানা বদল: মিত্তাল ও পুনাওয়ালার অধীনে রাজস্থান রয়্যালস

বিশ্বের সবচেয়ে প্রভাবশালী ক্রিকেট লিগ আইপিএলের অন্যতম জনপ্রিয় ফ্র্যাঞ্চাইজি রাজস্থান রয়্যালসের মালিকানায় বড় ধরনের কাঠামোগত পরিবর্তন এসেছে। দীর্ঘ সময় ধরে মালিকানার দায়িত্বে থাকা মনোজ বাদালে এবার বড় অংশীদার হিসেবে সঙ্গে পেয়েছেন ভারতের শীর্ষস্থানীয় দুই শিল্পপতিকে। ‘স্টিল ম্যাগনেট’ খ্যাত লক্ষ্মী মিত্তাল এবং বিশ্বের বৃহত্তম টিকা উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান সেরাম ইনস্টিটিউটের কর্ণধার আদর পুনাওয়ালা সম্মিলিতভাবে এই ফ্র্যাঞ্চাইজিটির নিয়ন্ত্রণভার গ্রহণ করেছেন। আজ এক যৌথ প্রেস বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে এই ঐতিহাসিক মালিকানা হস্তান্তরের বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়েছে।


২০ হাজার কোটি টাকার মেগা ডিল ও শেয়ার বিন্যাস

রাজস্থান রয়্যালসের এই মালিকানা বদলকে আইপিএল ইতিহাসের অন্যতম বৃহত্তম ব্যবসায়িক চুক্তি হিসেবে দেখা হচ্ছে। জানা গেছে, মিত্তাল ও পুনাওয়ালা সম্মিলিতভাবে প্রায় ১৬৫ কোটি মার্কিন ডলার ব্যয়ে এই মালিকানা কিনেছেন। বর্তমান বাজার মূল্যে যা প্রায় ২০ হাজার ২৫০ কোটি টাকা।

এই চুক্তির মাধ্যমে মালিকানার নতুন বিন্যাসটি নিম্নরূপ:

  • মিত্তাল পরিবার: ফ্র্যাঞ্চাইজিটির সর্বোচ্চ শেয়ার অর্থাৎ প্রায় ৭৫ শতাংশের মালিকানা এখন মিত্তাল পরিবারের অধীনে। এর ফলে লক্ষ্মী মিত্তাল এই দলের প্রধান নীতিনির্ধারক হিসেবে আবির্ভূত হলেন।

  • আদর পুনাওয়ালা: সেরাম ইনস্টিটিউটের সিইও এবং পুনাওয়ালা ফিনকর্পের চেয়ারম্যান আদর পুনাওয়ালার হাতে থাকছে ফ্র্যাঞ্চাইজির প্রায় ১৮ শতাংশ মালিকানা।

  • মনোজ বাদালে ও অন্যান্য: অবশিষ্ট অংশ বর্তমান বিনিয়োগকারীদের হাতেই থাকছে। মনোজ বাদালে তার বড় অংশের মালিকানা ছাড়লেও ফ্র্যাঞ্চাইজির বোর্ডে আগের মতোই সক্রিয় সদস্য হিসেবে যুক্ত থাকবেন।

বৈশ্বিক ক্রিকেটে ‘রয়্যালস’ ব্র্যান্ডের নতুন দিগন্ত

১৬৫ কোটি মার্কিন ডলারের এই বিশাল চুক্তিতে শুধুমাত্র আইপিএলের রাজস্থান রয়্যালস দলই অন্তর্ভুক্ত নয়; বরং এর আওতায় রয়্যালস ব্র্যান্ডের অধীনে থাকা বিশ্বের অন্য দুটি ফ্র্যাঞ্চাইজির মালিকানাও নতুনদের অধীনে চলে গেছে। এর ফলে মিত্তাল ও পুনাওয়ালা এখন থেকে নিম্নলিখিত দলগুলোরও মালিকানা ভোগ করবেন: ১. রাজস্থান রয়্যালস (আইপিএল – ভারত) ২. পার্ল রয়্যালস (এসএ২০ – দক্ষিণ আফ্রিকা) ৩. বার্বাডোজ রয়্যালস (ক্যারিবিয়ান প্রিমিয়ার লিগ – ওয়েস্ট ইন্ডিজ)

চুক্তিতে এই তিনটি ক্লাবের সম্মিলিত এন্টারপ্রাইজ ভ্যালু বা প্রাতিষ্ঠানিক মূল্যই নির্ধারণ করা হয়েছে বলে বিবৃতিতে জানানো হয়েছে।


রাজস্থানের সাথে মিত্তাল পরিবারের নাড়ির টান

ব্যবসায়িক বিনিয়োগের পাশাপাশি এই চুক্তির পেছনে আবেগীয় যোগসূত্রও কাজ করেছে। লক্ষ্মী মিত্তাল জানিয়েছেন, তার পরিবারের শিকড় ভারতের রাজস্থানে অবস্থিত। সেই নিরিখে রাজস্থান রয়্যালসকে নিজের করার সুযোগ তিনি হাতছাড়া করতে চাননি। তিনি বলেন, “আমি ক্রিকেট ভালোবাসি এবং রাজস্থানের সাথে আমার গভীর সংযোগ রয়েছে। তাই আইপিএলে আমার কাছে এই দলের চেয়ে প্রিয় আর কেউ হতে পারত না।”

অন্যদিকে, আদর পুনাওয়ালা ফ্র্যাঞ্চাইজিটির গৌরবময় ঐতিহ্য এবং দীর্ঘমেয়াদী উন্নতির বিষয়ে প্রতিশ্রুতি ব্যক্ত করেছেন। বিদায়ী মালিক মনোজ বাদালে নতুন অভিভাবকদের স্বাগত জানিয়ে বলেন, ক্রিকেটের প্রতি তাদের অনুরাগ এবং বৈশ্বিক ব্যবসার অভিজ্ঞতা রাজস্থানকে এক অনন্য উচ্চতায় নিয়ে যাবে।


১৮ বছরের শিরোপা খরা কাটানোর চ্যালেঞ্জ

২০০৮ সালে প্রয়াত কিংবদন্তি শেন ওয়ার্নের হাত ধরে আইপিএলের প্রথম আসরেই শিরোপা জিতেছিল রাজস্থান রয়্যালস। তবে সেই শুরুর সাফল্যের পর গত ১৮ বছরে রাজস্থান আর কোনো ট্রফির মুখ দেখেনি। নতুন মালিকদের হাত ধরে এই আক্ষেপ ঘুচবে বলেই ভক্তদের প্রত্যাশা।

চলমান মৌসুমে রাজস্থানের অবস্থান বেশ আশা জাগানিয়া:

  • পয়েন্ট টেবিল: এখন পর্যন্ত ১০টি ম্যাচ খেলে ১২ পয়েন্ট নিয়ে দলটি তালিকার চতুর্থ স্থানে রয়েছে।

  • শীর্ষে ওঠার লড়াই: শীর্ষে থাকা পাঞ্জাব কিংসের সাথে তাদের পয়েন্টের ব্যবধান মাত্র ১।

  • তারকা উপস্থিতি: উদীয়মান তুর্কি বৈভব সূর্যবংশীর পারফরম্যান্স এবং সিনিয়রদের ধারাবাহিকতা রাজস্থানকে এই আসরের অন্যতম ফেভারিট দলে পরিণত করেছে।

নতুন মালিকপক্ষের অধীনে রাজস্থান রয়্যালস তাদের হারানো গৌরব পুনরুদ্ধার করতে পারে কি না, সেটিই এখন দেখার বিষয়। ভারতের দুই বড় করপোরেট জায়ান্টের বিনিয়োগ আইপিএলের বাণিজ্যিক মানচিত্রে রাজস্থানকে আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে দিল বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।

Leave a Comment