বিশ্বকাপে বাংলাদেশহীন এক অস্বস্তিকর অধ্যায়

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপের ইতিহাসে ২০২৬ সাল চিহ্নিত হয়ে থাকছে এক ব্যতিক্রমী ও বিতর্কিত অধ্যায় হিসেবে। ২০০৭ সালে দক্ষিণ আফ্রিকায় প্রথম আসর শুরুর পর থেকে টানা নয়টি বিশ্বকাপে নিয়মিত অংশগ্রহণকারী দল ছিল বাংলাদেশ। অথচ দশম আসরে এসে প্রথমবারের মতো এই বৈশ্বিক মঞ্চে দেখা যাচ্ছে না টাইগারদের। ভারত ও শ্রীলংকার যৌথ আয়োজনে শুরু হওয়া এই বিশ্বকাপে বাংলাদেশের অনুপস্থিতি শুধু দেশের ক্রিকেটপ্রেমীদের মনেই শূন্যতা তৈরি করেনি, বরং আন্তর্জাতিক ক্রিকেট রাজনীতির জটিল বাস্তবতাকেও নতুন করে সামনে এনেছে।

দীর্ঘ প্রায় দুই দশকের টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ইতিহাসে মাঠের পারফরম্যান্সের চেয়ে প্রশাসনিক ও কূটনৈতিক প্রভাব এতটা আলোচনায় আসেনি আগে। এবারের আসরে ক্রিকেটীয় দক্ষতার পাশাপাশি ক্ষমতার ভারসাম্য, বোর্ডগুলোর প্রভাব এবং আন্তর্জাতিক সংস্থার নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে প্রবলভাবে। সমালোচকদের একটি বড় অংশ মনে করছে, ভারতীয় ক্রিকেট বোর্ডের প্রভাব ক্রমেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেট কাউন্সিলের সিদ্ধান্তে ছায়া ফেলছে। সেই প্রভাবের ফলেই বাংলাদেশের মতো নিয়মিত ও অভিজ্ঞ দলকে বাইরে রেখে বিকল্প হিসেবে অন্য দলকে অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে—এমন অভিযোগও শোনা যাচ্ছে।

এই সংকটের সূত্রপাত ঘটে মোস্তাফিজুর রহমানকে আইপিএল থেকে হঠাৎ বাদ দেওয়ার ঘটনায়, যা দুই দেশের ক্রিকেট সম্পর্কের ভেতরের টানাপোড়েনকে প্রকাশ্যে নিয়ে আসে। পরবর্তী সময়ে নিরাপত্তা ঝুঁকি ও উগ্রবাদী চাপের আশঙ্কা তুলে ধরে বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড জানায়, তারা ভারতে ম্যাচ খেলতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছে না। বিসিবি প্রস্তাব দেয়, বাংলাদেশের সব ম্যাচ শ্রীলংকায় আয়োজন করা হোক। তবে আইসিসি সেই প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে এবং শেষ পর্যন্ত বাংলাদেশকে বাদ দিয়ে স্কটল্যান্ডকে অন্তর্ভুক্ত করার সিদ্ধান্ত নেয়। এই সিদ্ধান্ত আন্তর্জাতিক ক্রিকেট অঙ্গনে তীব্র বিতর্ক ও সমালোচনার জন্ম দেয়।

বাংলাদেশের প্রতি এই আচরণের প্রতিবাদে পাকিস্তানও কড়া অবস্থান নেয়। তারা ১৫ ফেব্রুয়ারির বহুল আলোচিত ভারত–পাকিস্তান ম্যাচ বর্জনের ঘোষণা দেয়। এতে বিশ্বকাপের বাণিজ্যিক ভিত্তি মারাত্মক ঝুঁকির মুখে পড়ে। ধারণা করা হচ্ছে, এই একটি ম্যাচ না হলে সম্প্রচার স্বত্ব, বিজ্ঞাপন ও টিকিট বিক্রি মিলিয়ে প্রায় ৬,১১২ কোটি টাকার সম্ভাব্য ক্ষতি হতে পারে। ফলে আইসিসির ওপর চাপ আরও বেড়ে যায়, কারণ ভারত–পাকিস্তান ম্যাচ ছাড়া বিশ্বকাপের আকর্ষণ ও আর্থিক গুরুত্ব অনেকটাই কমে যাবে।

জাতীয় মর্যাদা ও নিরাপত্তার প্রশ্নে আপসহীন অবস্থান নেওয়ায় বাংলাদেশের সিদ্ধান্ত ভবিষ্যৎ ক্রিকেট রাজনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে থাকতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা। যদিও মাঠে দল নেই, তবু বাংলাদেশ পুরোপুরি অনুপস্থিত নয়। বিশ্বকাপে আম্পায়ারের দায়িত্ব পালন করবেন শরফুদ্দৌলা ইবনে শহীদ ও গাজী সোহেল, আর ধারাভাষ্যে থাকবেন অভিজ্ঞ আতহার আলী খান।

জাতীয় দলের হতাশা লাঘব করতে বিসিবি আয়োজন করেছে ‘অদম্য বাংলাদেশ টি-টোয়েন্টি কাপ’। ধূমকেতু, দুর্বার ও দুরন্ত—এই তিন দলের অংশগ্রহণে আয়োজিত এই টুর্নামেন্ট ঘরোয়া ক্রিকেটে নতুন প্রাণ সঞ্চার করবে বলে আশা করা হচ্ছে।

আজ কলম্বোয় পাকিস্তান–নেদারল্যান্ডস ম্যাচ দিয়ে ২০ দলের বিশ্বকাপের পর্দা উঠছে। ভারত ও শ্রীলংকার আটটি স্টেডিয়ামে মোট ৫৫টি ম্যাচ অনুষ্ঠিত হবে। চার গ্রুপ থেকে সেরা দলগুলো সুপার এইট, সেমিফাইনাল পেরিয়ে ফাইনালে পৌঁছাবে। ভারত, ইংল্যান্ড, অস্ট্রেলিয়া, দক্ষিণ আফ্রিকা ও পাকিস্তান—এই পাঁচ দলকে শিরোপার প্রধান দাবিদার ধরা হচ্ছে। ইতালির অভিষেক বিশ্বকাপে যোগ করেছে নতুন মাত্রা।

বাংলাদেশের জন্য এই বিশ্বকাপ নিঃসন্দেহে বিষাদময়। আবার বিশ্বকাপও অনুভব করবে টাইগারদের অনুপস্থিতি। মাঠে না থেকেও অবস্থান, প্রতিবাদ ও আলোচনার কেন্দ্রে থেকে বাংলাদেশ যে বিশ্ব ক্রিকেটে নিজের গুরুত্ব স্মরণ করিয়ে দিয়েছে, তা অস্বীকার করার উপায় নেই।

টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপ ২০২৬: সংক্ষিপ্ত তথ্য

বিষয়তথ্য
মোট দল২০
আয়োজক দেশভারত ও শ্রীলংকা
মোট ম্যাচ৫৫
গ্রুপ সংখ্যা
প্রাইজমানি১৬০ কোটি টাকা
ফাইনালের সম্ভাব্য ভেন্যুকলম্বো / আহমেদাবাদ
বাংলাদেশের প্রতিনিধি২ জন আম্পায়ার, ১ জন ধারাভাষ্যকার

Leave a Comment