মানসিক বিপর্যস্ততায় মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স ছাড়ার সিদ্ধান্তে হার্দিক পান্ডিয়া

ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) অন্যতম সফল ও ধনী ফ্র্যাঞ্চাইজি মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের হাত ধরেই বিশ্বক্রিকেটে অলরাউন্ডার হার্দিক পান্ডিয়ার উত্থান ঘটেছিল। তবে দীর্ঘ বিরতি শেষে নিজের পুরোনো সেই দলে ফিরে এবার চরম মানসিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হয়েছেন এই ক্রিকেটার। ফ্র্যাঞ্চাইজিটির অভ্যন্তরীণ প্রতিকূল পরিবেশ এবং মাঠ ও মাঠের বাইরের নানা অনাকাঙ্ক্ষিত বিতর্কের জের ধরে শেষ পর্যন্ত মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স ছাড়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়েছেন বর্তমান দলের এই অধিনায়ক। নির্ভরযোগ্য সূত্রের বরাত দিয়ে ভারতীয় সংবাদ সংস্থা পিটিআই (PTI) এই খবরটি নিশ্চিত করেছে।

আইপিএলের চলতি মৌসুমের খেলা এখনো পুরোপুরি শেষ না হলেও হার্দিক পান্ডিয়ার নেতৃত্বাধীন মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের পথচলা লিগ পর্বেই থমকে গেছে। টুর্নামেন্টের ১০টি দলের তীব্র প্রতিযোগিতাপূর্ণ এই আসরে পয়েন্ট টেবিলের নবম স্থান অর্জন করে বিদায় নিয়েছে রেকর্ড পাঁচবারের শিরোপাজয়ী এই দল। দলের এমন আকস্মিক বিপর্যয় এবং সামগ্রিক পরিস্থিতি পান্ডিয়াকে এই কঠিন সিদ্ধান্ত নিতে বাধ্য করেছে বলে জানা গেছে।

মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সে হার্দিক পান্ডিয়ার প্রথম অধ্যায়

ক্রিকেটার হার্দিক পান্ডিয়ার ক্যারিয়ারের স্বর্ণালী সময়ের একটি বড় অংশ জুড়ে রয়েছে মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স। ২০১৫ সাল থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত তিনি মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সে নিজের সফল প্রথম অধ্যায় পার করেন। বিশ্বের অন্যতম ধনী ক্রিকেট ফ্র্যাঞ্চাইজি হিসেবে পরিচিত মুম্বাইয়ের হয়ে এই দীর্ঘ সময়ে তিনি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ অলরাউন্ড ভূমিকা পালন করেন। এই সাত বছরের প্রথম মেয়াদে তিনি দলটির হয়ে চারবার আইপিএল শিরোপা জয়ের অনন্য গৌরব অর্জন করেন এবং দলের প্রধান চালিকাশক্তিতে পরিণত হন।

গুজরাট টাইটান্সে সাফল্য ও মুম্বাইয়ে প্রত্যাবর্তন

২০২২ সালের আইপিএল মেগা নিলামের আগে মুম্বাই ইন্ডিয়ান্স তাকে ছেড়ে দিলে হার্দিক পান্ডিয়া নবাগত ফ্র্যাঞ্চাইজি গুজরাট টাইটান্সে যোগ দেন। নতুন এই দলের অধিনায়কের দায়িত্ব পেয়েই তিনি নিজের নেতৃত্বগুণের প্রমাণ দেন এবং ২০২২ সালে প্রথমবার অংশ নিয়েই গুজরাট টাইটান্সকে আইপিএল চ্যাম্পিয়ন করার কৃতিত্ব দেখান। এর পরের বছর অর্থাৎ ২০২৩ সালের আসরেও তাঁর দূরদর্শী অধিনায়কত্বে গুজরাট টাইটান্স রানার্স-আপ হওয়ার গৌরব অর্জন করে।

টানা দুই মৌসুমে পান্ডিয়ার এমন অসাধারণ সাফল্য ও নেতৃত্বগুণে মুগ্ধ হয়ে ২০২৪ সালের আসরে বড় অঙ্কের অর্থের বিনিময়ে ট্রেডিংয়ের মাধ্যমে তাকে গুজরাট থেকে পুনরায় মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সে ফিরিয়ে আনা হয়। শুধু দলে ফেরানোই নয়, মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের দীর্ঘদিনের সফল অধিনায়ক রোহিত শর্মাকে সরিয়ে হার্দিক পান্ডিয়াকে দলটির নতুন অধিনায়ক ঘোষণা করে ফ্র্যাঞ্চাইজি কর্তৃপক্ষ।

তবে এই আকস্মিক সিদ্ধান্তটি মুম্বাই সমর্থকদের একাংশ সহজভাবে মেনে নিতে পারেনি। এর ফলে পান্ডিয়াকে তীব্র সমালোচনা ও বিরূপ প্রতিক্রিয়ার মুখোমুখি হতে হয়। এমনকি মুম্বাইয়ের ঘরের মাঠ ওয়াংখেড়ে স্টেডিয়ামে খেলা চলাকালীন গ্যালারি থেকে অনবরত দুয়োধ্বনি ও দুয়োর শিকার হতে হয় তাকে, যা তাঁর মানসিক চাপের অন্যতম বড় কারণ ছিল।

চলতি মৌসুমের ব্যর্থতা ও মানসিক চাপ

চলতি আইপিএল মৌসুমে মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের পারফরম্যান্স ছিল অত্যন্ত হতাশাজনক। এর আগের বছর রোহিত শর্মার অধীনে মুম্বাই প্লে-অফ পর্বে উঠতে সক্ষম হলেও এ বছর পান্ডিয়ার অধিনায়কত্বে দলটি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়। চলতি আসরে অধিনায়ক হিসেবে তো বটেই, ব্যক্তিগতভাবে ব্যাটে ও বলে পান্ডিয়ার পারফরম্যান্স ছিল প্রত্যাশার চেয়ে অনেক নিচে। এর পাশাপাশি পিঠের চোটের সমস্যাও তাঁর পিছু ছাড়েনি, যার কারণে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি ম্যাচে তিনি মাঠে নামতে পারেননি।

পিটিআইয়ের প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে, মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের প্লে-অফে ওঠার গাণিতিক সম্ভাবনা পুরোপুরি শেষ হয়ে যাওয়ার পরপরই পান্ডিয়া ফ্র্যাঞ্চাইজি মালিকপক্ষকে সাফ জানিয়ে দেন যে, তিনি আর এই দলে থাকছেন না। উদ্ভূত পরিস্থিতি বিবেচনা করে দলের মালিকপক্ষও তাঁর এই সিদ্ধান্তের প্রতি সম্মতি জানিয়েছে।

অভ্যন্তরীণ কোন্দল ও সিনিয়রদের অসহযোগিতার অভিযোগ

পিটিআইকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে একটি নির্ভরযোগ্য সূত্র জানিয়েছে, হার্দিক পান্ডিয়া প্রচণ্ড মানসিক চাপে ছিলেন এবং শারীরিকভাবে খুব ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন। পিঠের চোটের সমস্যা তাঁর মানসিক অবস্থাকে আরও জটিল করে তুলেছিল। প্লে-অফের আশা শেষ হওয়ার পরই তিনি সিদ্ধান্ত নেন যে এই ফ্র্যাঞ্চাইজির সঙ্গে আর সম্পর্ক রাখবেন না।

সূত্রটি আরও উল্লেখ করেছে, “বুঝতে হবে হার্দিকের বয়স বর্তমানে মাত্র ৩২ বছর। তিনি ৩০ বছর বয়সে নতুন স্বপ্ন নিয়ে মুম্বাইয়ে ফিরেছিলেন। কিন্তু প্রথম বছর থেকেই তাকে যেভাবে হেনস্তা করা হয়েছে, তা নজিরবিহীন। এবারও ভেতরের পরিস্থিতি মোটেও ভালো ছিল না। দলের ভেতর একতা বলতে কিছু ছিল না, সবাই একসঙ্গে একই পথে চলছিল না। যখন দলের অভ্যন্তরীণ পরিবেশ এমন হয়ে যায়, তখন একজন অধিনায়কের পক্ষে मानসিকভাবে টিকে থাকা অসম্ভব কঠিন হয়ে পড়ে।”

অন্য আরেকটি সূত্রের দাবি অনুযায়ী, হার্দিক পান্ডিয়া দলের কয়েকজন সিনিয়র ক্রিকেটারের আচরণে গভীরভাবে আঘাত পেয়েছেন। তাঁর ঘনিষ্ঠ মহল থেকে অভিযোগ উঠেছে যে, ভারতের জাতীয় দলের হয়ে খেলার সময় পান্ডিয়ার কাছ থেকে সর্বদা শতভাগ উজাড় করে দেওয়া পারফরম্যান্স চাওয়া হলেও, মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের হয়ে নেতৃত্ব দেওয়ার সময় সিনিয়র খেলোয়াড়দের কাছ থেকে তিনি একই ধরনের সমর্থন বা সহযোগিতা পাননি। এই দ্বিমুখী আচরণ ও একতার অভাবই মূলত তাঁর দল ছাড়ার প্রধান কারণ।

লক্ষ্ণৌ সুপার জায়ান্টসেও নেতৃত্বের রদবদল

এদিকে মুম্বাই ইন্ডিয়ান্সের এই অভ্যন্তরীণ সংকটের খবরের পাশাপাশি আইপিএলের অন্য একটি দলেও বড় পরিবর্তনের খবর পাওয়া গেছে। পয়েন্ট তালিকার একেবারে তলানিতে থেকে এবারের মরশুম শেষ করার পর লক্ষ্ণৌ সুপার জায়ান্টসের অধিনায়কত্ব ছেড়ে দিয়েছেন ভারতের অন্যতম উইকেটকিপার-ব্যাটসম্যান ঋষভ পন্ত। লক্ষ্ণৌ সুপার জায়ান্টস দলের ডিরেক্টর টম মুডি গণমাধ্যমের কাছে ঋষভ পন্তের অধিনায়কত্ব ছাড়ার এই বিষয়টি আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেছেন। এর ফলে চলতি আইপিএল আবহে ফ্র্যাঞ্চাইজিগুলোর নেতৃত্ব ও অভ্যন্তরীণ সমীকরণ নতুন মোড় নিয়েছে।

Leave a Comment