বাজে মৌসুম শেষে কলকাতার পাঁচ ক্রিকেটারকে বিদায়ের প্রস্তুতি

ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের তথা ভারতের ঘরোয়া টি-টোয়েন্টি ক্রিকেট প্রতিযোগিতার সদ্য সমাপ্ত আসরটি কলকাতা নাইট রাইডার্সের জন্য অত্যন্ত হতাশাজনক ছিল। আসর শুরুর পূর্ব থেকেই চোটের কারণে কলকাতার দলটির খেলোয়াড়েরা, বিশেষ করে বোলিং বিভাগ মারাত্মকভাবে ভুগেছে। এর সাথে বাংলাদেশের শীর্ষ বোলার মুস্তাফিজুর রহমানকে নিলাম থেকে কেনার পরও আন্তর্জাতিক বাধ্যবাধকতার কারণে পুরো টুর্নামেন্টে দলে না পাওয়ার মাশুল কেকেআর কর্তৃপক্ষকে হারে হারে টের পেতে হয়েছে। শেষ পর্যন্ত প্রতিযোগিতার পয়েন্ট তালিকায় সাত নম্বরে থেকে আসর শেষ করায় ফ্র্যাঞ্চাইজি কর্তৃপক্ষ দলের সার্বিক পারফরম্যান্সে মোটেও সন্তুষ্ট নয়। এই ব্যর্থতার দায়ে আগামী আসরের জন্য স্কোয়াডের অন্তত পাঁচজন ক্রিকেটারকে দল থেকে স্থায়ীভাবে ছেড়ে দেওয়ার চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে যাচ্ছে কলকাতা নাইট রাইডার্স কর্তৃপক্ষ।

অধিনায়ক আজিঙ্কা রাহানে ও ক্যামেরুন গ্রিনের ব্যর্থতা

কলকাতা নাইট রাইডার্স দলের প্রধান ব্যর্থতার কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন ৩৭ বছর বয়সী অভিজ্ঞ ভারতীয় ব্যাটার আজিঙ্কা রাহানে। টানা দুই বছর কেকেআর দলকে নেতৃত্ব দিলেও একবারও তিনি প্রত্যাশামতো ফলাফল এনে দিতে পারেননি। তাঁর নেতৃত্বে দল গত আসরে আট নম্বরে এবং এবার সাত নম্বরে থেকে টুর্নামেন্ট শেষ করেছে। পরিস্থিতি বুঝে তাৎক্ষণিক সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষেত্রে তাঁর স্পষ্ট দুর্বলতা বারবার প্রকাশ পেয়েছে। বিভিন্ন ম্যাচে বোলারদের পরিবর্তন ও মাঠের ফিল্ডিং সাজানো নিয়ে ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের মনে প্রশ্ন উঠেছে। অভিজ্ঞতার কারণে তাঁকে নেতৃত্বের গুরুভার দেওয়া হলেও সেই সুনির্দিষ্ট জায়গায় তিনি সম্পূর্ণ ব্যর্থ হয়েছেন।

অন্যদিকে, অস্ট্রেলীয় অলরাউন্ডার ক্যামেরুন গ্রিনকে ২৫ কোটি রুপিতে দলে নিয়েছিল কলকাতা। ফ্র্যাঞ্চাইজির প্রধান নির্বাহী ভেঙ্কি মাইসোর মনে করছেন, গ্রিন তাঁর চড়া মূল্যের প্রতি বিন্দুমাত্র বিচার করতে পারেননি। ব্যাট বা বল হাতে কোনো বিভাগেই তিনি প্রত্যাশা অনুযায়ী অবদান রাখতে পারেননি। পুরো আসরে ১৪টি ম্যাচ খেলে তিনি মাত্র ৩২২ রান করেছেন। চোটের কারণে প্রথম চারটি ম্যাচে বল করতে না পারলেও পরের ১০টি ম্যাচে তিনি মাত্র ৭টি উইকেট শিকার করেন। এত বিপুল অর্থ খরচ করে এমন সাধারণ পারফরম্যান্সের কারণে তাঁকে ধরে রাখার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে।

নিচে কলকাতার দল থেকে বাদ পড়তে যাওয়া প্রধান দুই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারের পরিসংখ্যান ও বিবরণ ছকের মাধ্যমে উপস্থাপন করা হলো:

ক্রিকেটারের নাম ও ভূমিকাক্রয়ের মূল্য বা বয়সআসরের মোট ম্যাচব্যক্তিগত পারফরম্যান্স বা ব্যর্থতার ক্ষেত্র
আজিঙ্কা রাহানে (অধিনায়ক)৩৭ বছর বয়স১৪টি ম্যাচদলের বোলিং পরিবর্তন ও ফিল্ডিং সাজানোর ক্ষেত্রে ব্যর্থতা
ক্যামেরুন গ্রিন (অলরাউন্ডার)২৫ কোটি রুপি১৪টি ম্যাচব্যাট হাতে ৩২২ রান এবং ১০ ম্যাচে বল করে মাত্র ৭টি উইকেট

বৈভব আরোরা, মাথিশা পাথিরানা ও রমনদীপ সিংয়ের পারফরম্যান্স

এবার কলকাতার অন্যতম ব্যর্থ দেশীয় ক্রিকেটার ছিলেন বোলার বৈভব। ম্যাচের পর ম্যাচ দলের বোলিং বিভাগকে ডুবিয়ে টিম ম্যানেজমেন্টের আস্থার প্রতিদান দিতে তিনি ব্যর্থ হয়েছেন। অথচ হর্ষিত রানা ও মাথিশা পাথিরানাদের মতো মূল বোলারদের অনুপস্থিতিতে দলীয় কোচ অভিষেক নায়াররা বৈভবের ওপর অনেকটা ভরসা করেছিলেন। চূড়ান্ত হতাশাজনক বোলিংয়ের কারণে শেষ দিকের ম্যাচগুলোর একাদশ থেকে তাঁকে বাদ দিতে বাধ্য হয়েছিল কলকাতা কর্তৃপক্ষ।

শ্রীলঙ্কান বোলার মাথিশা পাথিরানাকে নিয়েও মোহভঙ্গ হয়েছে কর্তৃপক্ষের। ১৮ কোটি রুপি দিয়ে কেনার পরও চোটের কারণে আসরের প্রথমার্ধে তিনি দলের সাথে যোগ দিতে পারেননি। পরে দলে এলেও শারীরিক সক্ষমতা বা ফিটনেস সমস্যার কারণে তাঁকে খেলানো সম্ভব হয়নি। গত ১৬ মে গুজরাট টাইটান্সের বিপক্ষে ম্যাচে তাঁকে মাঠে নামানো হলেও মাত্র ১.২ ওভার বল করার পর তিনি পুনরায় চোট পেয়ে মাঠ ছাড়েন।

রমনদীপ সিংকে দলের প্রধান ফিনিশার বা শেষ মুহূর্তের মারকুটে ব্যাটার হিসেবে রিংকু সিংয়ের যোগ্য সঙ্গী ভাবা হয়েছিল। কিন্তু এবারের পুরো টুর্নামেন্টে তিনি বলার মতো একটি ইনিংসও খেলতে পারেননি। পুরো আসরে তিনি মাত্র ৬৮টি বল মোকাবেলা করার সুযোগ পেয়ে ৮টি চার ও ২টি ছক্কা হাঁকান। ইনিংসের শেষ দিকে ব্যাট করতে নেমে তাঁর স্ট্রাইক রেট বা রান তোলার গতি ছিল মাত্র ১২০.৫৮, যা আধুনিক টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের ব্যাকরণের সাথে সম্পূর্ণ অসামঞ্জস্যপূর্ণ এবং অচল।

নিচে অন্য তিন ব্যর্থ ক্রিকেটারের পরিসংখ্যানগত সংক্ষিপ্ত বিবরণ ছকের মাধ্যমে প্রকাশ করা হলো:

ক্রিকেটারের নাম ও ভূমিকাক্রয়ের মূল্য বা স্থলাভিষিক্তআসরের প্রধান ম্যাচ বা বলব্যর্থতার সুনির্দিষ্ট কারিগরি দিক
বৈভব আরোরা (বোলার)হর্ষিত রানার অনুপস্থিতিআসরের অধিকাংশ ম্যাচআস্থার প্রতিদান দিতে না পেরে একাদশ থেকে বাদ
মাথিশা পাথিরানা (বোলার)১৮ কোটি রুপি১৬ মে গুজরাটের বিপক্ষেচোটের কারণে মাত্র ১.২ ওভার বল করে মাঠ ত্যাগ
রমনদীপ সিং (ব্যাটার)রিংকু সিংয়ের সঙ্গী৬৮টি বল মোকাবেলাশেষ মুহূর্তে মাত্র ১২০.৫৮ রান তোলার গতি বা স্ট্রাইক রেট

ফ্র্যাঞ্চাইজির ভবিষ্যৎ পুনর্গঠন পরিকল্পনা

কলকাতা নাইট রাইডার্সের প্রধান কর্তারা মনে করছেন, দলের চোটের সমস্যা ও আন্তর্জাতিক ক্রিকেটারদের অনুপস্থিতির পাশাপাশি কিছু খেলোয়াড়ের ব্যক্তিগত অযোগ্যতাই এই বিপর্যয়ের প্রধান কারণ। ফ্র্যাঞ্চাইজিটি আগামী আসরের পূর্বে মেগা নিলামের মাধ্যমে দলটিকে নতুন করে সাজানোর পরিকল্পনা গ্রহণ করেছে। যে পাঁচজন ক্রিকেটারকে ছেড়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, তাঁদের অবমুক্তির মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থ দিয়ে আগামী আসরের জন্য আরও ভারসাম্যপূর্ণ, চোটমুক্ত এবং কার্যকরী ক্রিকেটার কেনার প্রক্রিয়া শুরু করবে কলকাতা নাইট রাইডার্স।

Leave a Comment