আইপিএলের পাওয়ারপ্লেতে দিল্লির সর্বনিম্ন রানের লজ্জা ও ব্যাটিং বিপর্যয়

ইন্ডিয়ান প্রিমিয়ার লিগের (আইপিএল) ১৯তম আসরে দিল্লি ক্যাপিটালসের ওপর দিয়ে যেন এক বিধ্বংসী ঝড় বয়ে যাচ্ছে। একের পর এক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনা ও বিব্রতকর রেকর্ডের সম্মুখীন হয়ে ফ্র্যাঞ্চাইজিটি এখন খাদের কিনারায়। গত শনিবার (২৫ এপ্রিল) পাঞ্জাব কিংসের বিপক্ষে ২৬৪ রানের বিশাল পুঁজি গড়েও হারের তেতো স্বাদ পেতে হয়েছিল তাদের। পাঞ্জাবের সেই জয়টি আইপিএল তো বটেই, স্বীকৃত টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের ইতিহাসে সফলভাবে সর্বোচ্চ রান তাড়া করে জয়ের এক অনন্য বিশ্বরেকর্ড গড়ে। সেই একই ম্যাচে ক্যাচ নিতে গিয়ে মাথায় ও ঘাড়ে গুরুতর আঘাত পান দিল্লির দক্ষিণ আফ্রিকান পেসার লুঙ্গি এনগিডি। আঘাত এতটাই গুরুতর ছিল যে, তাঁকে তাৎক্ষণিকভাবে অ্যাম্বুল্যান্সে করে হাসপাতালে স্থানান্তর করতে হয়। সেই মানসিক ও শারীরিক ধাক্কা কাটিয়ে ওঠার আগেই আজ সোমবার (২৭ এপ্রিল), ২০২৬ তারিখে অরুণ জেটলি স্টেডিয়ামে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর বিপক্ষে ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়ে আইপিএলের ইতিহাসের সবচেয়ে লজ্জাজনক রেকর্ডের মালিক হয়েছে দিল্লি ক্যাপিটালস।

পাওয়ারপ্লেতে আইপিএল ইতিহাসের সর্বনিম্ন রানের বিশ্বরেকর্ড

ঘরের মাঠে আজ টসে হেরে ব্যাটিং করতে নেমে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর বোলারদের তোপের মুখে পড়ে স্বাগতিক দিল্লি। ভুবনেশ্বর কুমার ও জশ হ্যাজলউডের বিধ্বংসী বোলিং স্পেলের সামনে দিল্লির টপ অর্ডার ব্যাটাররা কার্যত অসহায় আত্মসমর্পণ করেন। নির্ধারিত প্রথম ৬ ওভারের পাওয়ারপ্লে শেষে দিল্লির সংগ্রহ দাঁড়ায় মাত্র ১৩ রান। এটি আইপিএলের ১৯ বছরের ইতিহাসে পাওয়ারপ্লেতে কোনো দলের করা সর্বনিম্ন রানের নতুন রেকর্ড। এর আগে এই বিব্রতকর রেকর্ডের যৌথ ভাগীদার ছিল সানরাইজার্স হায়দরাবাদ ও রাজস্থান রয়্যালস। ২০২২ সালের আসরে হায়দরাবাদ এবং ২০০৯ সালের আসরে রাজস্থান রয়্যালস পাওয়ারপ্লেতে ১৪ রান সংগ্রহ করেছিল। আজ সেই রেকর্ড ভেঙে ১৩ রানে থমকে গিয়ে এক লজ্জার ইতিহাস গড়ল দিল্লি।

পাওয়ারপ্লেতে দিল্লির ব্যাটিং বিপর্যয়ের চিত্রটি ছিল অভাবনীয়:

  • উইকেট পতন: প্রথম ৬ ওভারের মধ্যেই মাত্র ৮ রানে ৬ জন ব্যাটার সাজঘরে ফিরে যান।

  • ব্যাটারদের ব্যক্তিগত স্কোর: প্রথম ছয়জন ব্যাটারের ব্যক্তিগত রান কোনো টেলিফোন নম্বরের মতো দেখচ্ছিল—যথাক্রমে ০, ১, ১, ০, ৫ এবং ০।

  • বোলারদের একচ্ছত্র আধিপত্য: পাওয়ারপ্লের পুরো ৬ ওভার বোলিং করেছেন কেবল ভুবনেশ্বর কুমার ও জশ হ্যাজলউড। তারা দুজনেই ৩টি করে উইকেট শিকার করে দিল্লির ব্যাটিং মেরুদণ্ড চূর্ণ করে দেন।


সর্বনিম্ন রানে অলআউট হওয়ার শঙ্কা ও ‘ইমপ্যাক্ট’ প্রতিরোধ

অবিশ্বাস্য দ্রুততায় ৬ উইকেট হারিয়ে দিল্লি ক্যাপিটালস আইপিএল ইতিহাসে সর্বনিম্ন রানে অলআউট হওয়ার চরম ঝুঁকিতে পড়ে যায়। উল্লেখ্য যে, আইপিএলের ইতিহাসে সর্বনিম্ন রানে অলআউট হওয়ার রেকর্ডটি বর্তমানে রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরুর দখলে; ২০১৭ সালে কলকাতা নাইট রাইডার্সের বিপক্ষে তারা মাত্র ৪৯ রানে অলআউট হয়েছিল। সেই চরম লজ্জা এড়াতে দিল্লি কর্তৃপক্ষ কৌশলগত পরিবর্তন হিসেবে তাদের ‘ইমপ্যাক্ট প্লেয়ার’ কোটায় ব্যাটার অভিষেক পোড়েলকে মাঠে নামাতে বাধ্য হয়।

অভিষেক পোড়েল উইকেটে এসে একপ্রান্ত আগলে রেখে ব্যাটিং বিপর্যয় সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেন। তাঁর ধৈর্যশীল ও দায়িত্বশীল ব্যাটিংয়ের কল্যাণেই দিল্লি ক্যাপিটালস শেষ পর্যন্ত সর্বনিম্ন রানের রেকর্ডের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার লড়াই চালিয়ে যাচ্ছে। প্রতিবেদনটি লেখা পর্যন্ত ১৩ ওভার শেষে দিল্লির সংগ্রহ দাঁড়িয়েছে ৮ উইকেটে ৬৪ রান। অভিষেক পোড়েল ২৩ রানে অপরাজিত থেকে একাকী প্রতিরোধ গড়ে তুলেছেন এবং তাঁকে ক্রিজে সঙ্গ দিচ্ছেন স্পিনার কুলদীপ যাদব (১*)।


দিল্লির সাম্প্রতিক পরিস্থিতির ব্যবচ্ছেদ ও পরিসংখ্যান

দিল্লি ক্যাপিটালসের জন্য গত কয়েকদিন ছিল চরম নাটকীয় ও হতাশাজনক। ২৬৪ রানের পাহাড়সম স্কোর গড়েও জয় না পাওয়া এবং গুরুত্বপূর্ণ স্ট্রাইক পেসার লুঙ্গি এনগিডির চোট দলের আত্মবিশ্বাসে বড় ধাক্কা দিয়েছে। এনগিডির অনুপস্থিতিতে দলের বোলিং আক্রমণ যখন খর্বশক্তি, তখন ঘরের মাঠে ব্যাটারদের এমন দিশেহারা পারফরম্যান্স ফ্র্যাঞ্চাইজিটিকে খাদের কিনারায় ঠেলে দিয়েছে। বিশেষ করে অধিনায়ক অক্ষর প্যাটেলের উইকেট পতনের পর বেঙ্গালুরু শিবিরের বাঁধভাঙা উদযাপন ছিল দেখার মতো, যা দিল্লির অসহায়ত্বকেই ফুটিয়ে তুলছিল।

আইপিএল পাওয়ারপ্লেতে সর্বনিম্ন স্কোরের তুলনামূলক চিত্র:

দলরান/উইকেটপ্রতিপক্ষসাল
দিল্লি ক্যাপিটালস১৩/৬রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু২০২৬
সানরাইজার্স হায়দরাবাদ১৪/৩রাজস্থান রয়্যালস২০২২
রাজস্থান রয়্যালস১৪/২রয়্যাল চ্যালেঞ্জার্স বেঙ্গালুরু২০০৯

পাওয়ারপ্লেতে ৬ উইকেট হারিয়ে মাত্র ১৩ রান তোলা টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটের ব্যাকরণেই বিরল। দিল্লির ব্যাটারদের এই সম্মিলিত ব্যর্থতা আগামী ম্যাচগুলোতে দলের রণকৌশলে বড় ধরনের পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিচ্ছে। অরুণ জেটলি স্টেডিয়ামের দর্শকদের জন্য আজকের দিনটি ছিল এক অবিশ্বাসের রাত, আর দিল্লির সমর্থকদের জন্য চরম গ্লানির। এখন দেখার বিষয়, ইমপ্যাক্ট প্লেয়ার অভিষেক পোড়েলের ব্যাটে ভর করে দিল্লি শেষ পর্যন্ত সম্মানজনক কোনো সংগ্রহে পৌঁছাতে পারে কি না।

Leave a Comment