ফেয়ার প্লের কথা যিনি আজীবন বলেছেন, আজ সেই ন্যায়ের দাবিদার ইমরান।

কারাবন্দী পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক ও সাবেক প্রধানমন্ত্রী ইমরান খান–এর স্বাস্থ্য ও মানবিক অধিকার নিয়ে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে উদ্বেগ ক্রমেই জোরদার হচ্ছে। ক্রিকেট বিশ্বের ১৪ জন সাবেক আন্তর্জাতিক অধিনায়ক সম্প্রতি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ–এর কাছে এক যৌথ চিঠিতে ইমরানের জন্য ‘ন্যূনতম মানবিক মর্যাদা, সুচিকিৎসা ও স্বচ্ছ আইনি প্রক্রিয়া’ নিশ্চিত করার আহ্বান জানিয়েছেন। চিঠিটির খসড়া প্রণয়ন করেন অস্ট্রেলিয়ার সাবেক অধিনায়ক গ্রেগ চ্যাপেল

চিঠিতে স্বাক্ষরকারী অধিনায়কদের তালিকা আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ইতিহাসের এক উজ্জ্বল অধ্যায়কে একত্র করেছে। তাঁদের বক্তব্য—এটি কোনো রাজনৈতিক বিবৃতি নয়; বরং মানবিকতার প্রশ্নে একাত্মতা।

স্বাক্ষরকারী অধিনায়কদের তালিকা

ক্র. নংনামদেশউল্লেখযোগ্য ভূমিকা
ইয়ান চ্যাপেলঅস্ট্রেলিয়াসাবেক টেস্ট অধিনায়ক
গ্রেগ চ্যাপেলঅস্ট্রেলিয়াবিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক
অ্যালান বোর্ডারঅস্ট্রেলিয়াদীর্ঘমেয়াদি টেস্ট অধিনায়ক
স্টিভ ওয়াহঅস্ট্রেলিয়াবিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক
কিম হিউজঅস্ট্রেলিয়াসাবেক টেস্ট অধিনায়ক
সুনীল গাভাস্কারভারতকিংবদন্তি ওপেনার ও অধিনায়ক
কপিল দেবভারত১৯৮৩ বিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক
মাইক ব্রিয়ারলিইংল্যান্ডকৌশলী অধিনায়ক
ডেভিড গাওয়ারইংল্যান্ডসাবেক টেস্ট অধিনায়ক
১০মাইকেল আথারটনইংল্যান্ডসাবেক অধিনায়ক
১১নাসের হুসেইনইংল্যান্ডসাবেক অধিনায়ক
১২ক্লাইভ লয়েডওয়েস্ট ইন্ডিজবিশ্বকাপজয়ী অধিনায়ক
১৩জন রাইটনিউজিল্যান্ডসাবেক অধিনায়ক
১৪বেলিন্ডা ক্লার্কঅস্ট্রেলিয়ানারী ক্রিকেটের সফল অধিনায়ক

ক্রিকেট মাঠে প্রতিদ্বন্দ্বী হলেও পারস্পরিক শ্রদ্ধা তাঁদের একসূত্রে বেঁধেছে। গ্রেগ চ্যাপেল তাঁর কলামে ইমরানের সঙ্গে দীর্ঘ সম্পর্কের কথা স্মরণ করেন। ১৯৯২ সালে পাকিস্তানকে বিশ্বকাপ জেতানোর পর ইমরান দেশের মানুষকে অনুপ্রাণিত করতে ট্রফি নিয়ে দেশজুড়ে সফর করেছিলেন। নেতৃত্ব, আত্মবিশ্বাস ও লক্ষ্যভিত্তিক চিন্তাধারাই তাঁকে রাজনীতির পথে নিয়ে যায়। বহু বছরের সংগ্রামের পর তিনি দেশের সর্বোচ্চ নির্বাহী পদে অধিষ্ঠিত হন।

তবে ২০২৩ সাল থেকে তিনি কারাবন্দী। তাঁর বিরুদ্ধে একাধিক মামলা (সংখ্যা প্রায় ১৮৬ বলে বিভিন্ন সূত্রে উল্লেখ) বিচারাধীন। বয়স ও শারীরিক অবস্থার বিবেচনায় এ পরিস্থিতি কার্যত দীর্ঘমেয়াদি বন্দিত্বে রূপ নিয়েছে। বিভিন্ন প্রতিবেদনে জানা গেছে, তাঁর ডান চোখের দৃষ্টিশক্তি মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং তাঁকে নির্জন কারাবাসে রাখা হয়েছে—যা আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলোর দৃষ্টিতে উদ্বেগজনক।

চিঠিতে সাবেক অধিনায়কেরা তিনটি প্রধান দাবি উত্থাপন করেছেন—

  1. ইমরানের পছন্দমতো বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের মাধ্যমে পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা।

  2. পরিবারের সঙ্গে নিয়মিত সাক্ষাতের সুযোগ।

  3. আইনি প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও ন্যায়সংগত বিচার নিশ্চিত করা।

ভারত-পাকিস্তান রাজনৈতিক টানাপোড়েনের বাস্তবতা সত্ত্বেও সুনীল গাভাস্কার ও কপিল দেবের সমর্থন এই উদ্যোগকে বিশেষ তাৎপর্য দিয়েছে। তাঁদের মতে, ক্রিকেটের শিক্ষা ‘ফেয়ার প্লে’—ন্যায়, মর্যাদা ও সম্মান—রাষ্ট্রসীমার ঊর্ধ্বে।

ক্রিকেট দীর্ঘদিন ধরে কূটনৈতিক সম্পর্কের সেতুবন্ধ হিসেবে কাজ করেছে। মাঠের লড়াই শেষে যে সম্মান টিকে থাকে, সেটিই খেলাটির আত্মা। সাবেক অধিনায়কেরা মনে করেন, একজন সাবেক রাষ্ট্রপ্রধান ও বৈশ্বিক ক্রীড়া-আইকনের সঙ্গে মানবিক আচরণ নিশ্চিত করা সভ্য সমাজের মৌলিক দায়িত্ব।

তাঁদের ভাষায়, এটি কেবল একজন ব্যক্তির পক্ষে অবস্থান নয়; বরং ন্যায়বিচারের আলো জ্বালিয়ে রাখার প্রয়াস। ইমরান খান আজীবন যে ‘ফেয়ার প্লে’র জয়গান গেয়েছেন, আজ সেই ন্যূনতম অধিকার তাঁর প্রাপ্য—এটাই তাঁদের সম্মিলিত বার্তা।

Leave a Comment