চার মাসে সাতবার ডাক অভিষেক শর্মার নজিরবিহীন পতন

টি-টোয়েন্টি ক্রিকেটে ভারতের অন্যতম আগ্রাসী ওপেনার হিসেবে পরিচিত অভিষেক শর্মা ২০২৫ সালে এমন এক পরিসংখ্যানের কেন্দ্রে চলে এসেছেন, যা একই সঙ্গে বিস্ময় ও সমালোচনার জন্ম দিয়েছে। মাত্র চার মাসের ব্যবধানে সাতবার শূন্য রানে আউট হয়ে তিনি ভারতের টি-টোয়েন্টি ইতিহাসে এক বছরে সর্বোচ্চ ‘ডাক’-এর নতুন রেকর্ড গড়েছেন। এই অস্বাভাবিক ধারাবাহিকতা তার প্রতিভার পাশাপাশি ধারাবাহিকতা নিয়েও বড় প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।

বিশ্ব ক্রিকেটে বিস্ফোরক ব্যাটার হিসেবে পরিচিত অভিষেক সাম্প্রতিক টি-টোয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের শিরোপা জয়ের গুরুত্বপূর্ণ অংশ ছিলেন। তবে ব্যক্তিগত পারফরম্যান্সে তিনি প্রত্যাশা পূরণ করতে ব্যর্থ হন। টুর্নামেন্টে টানা তিন ম্যাচে শূন্য রানে আউট হওয়ার ঘটনা তখনই তাকে তীব্র সমালোচনার মুখে ফেলে। আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই ব্যর্থতার পরও তার আন্তর্জাতিক টি-টোয়েন্টি র‌্যাঙ্কিংয়ে তেমন পতন হয়নি; এখনও তিনি বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় ব্যাটারদের মধ্যে অবস্থান করছেন।

সাম্প্রতিক আইপিএল ম্যাচে সানরাইজার্স হায়দরাবাদ ও রাজস্থান রয়্যালসের মুখোমুখি লড়াইয়ে আবারও একই চিত্র দেখা যায়। আগের ম্যাচে ৭৪ রানের দৃষ্টিনন্দন ইনিংস খেলে আলোচনায় আসার পর প্রত্যাশা ছিল ধারাবাহিক বড় স্কোরের। কিন্তু ইনিংসের প্রথম বলেই জোফরা আর্চারের দুর্দান্ত ডেলিভারিতে ক্যাচ তুলে দিয়ে শূন্য রানে ফিরে যান অভিষেক। এই আউটের মাধ্যমে চলতি বছরে মাত্র ১৮টি টি-টোয়েন্টি ম্যাচে তার ‘ডাক’ সংখ্যা দাঁড়ায় সাত।

এই পরিসংখ্যান তাকে ভারতীয় ক্রিকেট ইতিহাসে এক অস্বাভাবিক অবস্থানে নিয়ে গেছে। এর আগে এক বছরে সর্বোচ্চ ছয়বার শূন্য রানে আউট হওয়ার রেকর্ড ছিল গুরকিরাত সিং (২০১৩), সঞ্জু স্যামসন (২০২৪) এবং রোহিত শর্মা (২০১৮)-এর দখলে। তবে তাদের তুলনায় অভিষেক অনেক কম ম্যাচ খেলেই এই অনাকাঙ্ক্ষিত রেকর্ড ভেঙে দিয়েছেন, যা পরিস্থিতিকে আরও আলোচিত করেছে।

নিচে তুলনামূলক পরিসংখ্যান তুলে ধরা হলো—

খেলোয়াড়বছরম্যাচ সংখ্যাডাক (শূন্য রানে আউট)
অভিষেক শর্মা২০২৫১৮
রোহিত শর্মা২০১৮৩২
সঞ্জু স্যামসন২০২৪৩২
গুরকিরাত সিং২০১৩

বিশ্লেষকদের মতে, অভিষেক শর্মার ব্যাটিং স্টাইলই এই ওঠানামার মূল কারণ। তিনি শুরু থেকেই আক্রমণাত্মক মানসিকতা নিয়ে খেলেন এবং প্রথম বল থেকেই বড় শট নিতে দ্বিধা করেন না। এই ‘হাই রিস্ক, হাই রিওয়ার্ড’ কৌশল একদিকে দ্রুত রান এনে দেয়, অন্যদিকে দ্রুত উইকেট হারানোর ঝুঁকিও বাড়িয়ে দেয়।

একইসঙ্গে সানরাইজার্স হায়দরাবাদের টপ অর্ডার নিয়েও উদ্বেগ বাড়ছে। ট্রাভিস হেডও গত মৌসুমের মতো ধারাবাহিক পারফরম্যান্স দেখাতে পারছেন না, ফলে দল প্রায়শই শুরুতেই চাপে পড়ে যাচ্ছে এবং মিডল অর্ডারের ওপর অতিরিক্ত চাপ তৈরি হচ্ছে।

তবে ওই ম্যাচে হায়দরাবাদের অধিনায়ক ইশান কিষাণ অসাধারণ ইনিংস খেলে দলকে উদ্ধার করেন। ৪৪ বলে ৮টি চার ও ৬টি ছক্কায় তিনি ৯১ রানের ঝড়ো ইনিংস খেলেন। তার সঙ্গে হেইনরিখ ক্লাসেন ৪০ এবং নিতিশ কুমার রেড্ডি ২৮ রানের গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখেন, যার ফলে দল ২১৬ রানের শক্তিশালী সংগ্রহ দাঁড় করায়।

ক্রিকেট বিশেষজ্ঞদের মতে, অভিষেক শর্মার সমস্যা প্রতিভায় নয়, বরং সিদ্ধান্ত গ্রহণ ও শট নির্বাচনে। তার আক্রমণাত্মক মানসিকতা অনেক সময় তাকে ম্যাচ জেতায়, আবার অনেক সময় দ্রুত ড্রেসিংরুমে ফিরিয়ে আনে। এই অস্থিরতাই তার ক্যারিয়ারের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সব মিলিয়ে, মাত্র চার মাসে সাতবার শূন্য রানে আউট হওয়ার এই ঘটনা ভারতীয় ক্রিকেটে এক বিরল ও আলোচিত পরিসংখ্যান হিসেবে জায়গা করে নিয়েছে, যেখানে প্রতিভা, ঝুঁকি এবং অনিয়মিত পারফরম্যান্স একসঙ্গে স্পষ্টভাবে প্রতিফলিত হচ্ছে।

Leave a Comment