ক্রিকেট আইনে আমূল পরিবর্তন: ‘অবৈধ’ ব্যাটের বৈধতাসহ একগুচ্ছ নতুন নিয়ম

ক্রিকেট বিশ্বের প্রাচীনতম এবং ঐতিহ্যবাহী ক্লাব, ক্রিকেটের আইনপ্রণেতা মেরিলেবোন ক্রিকেট ক্লাব (এমসিসি) সম্প্রতি খেলাটির নিয়মে এক ঐতিহাসিক পরিবর্তনের ঘোষণা দিয়েছে। আধুনিক ক্রিকেটের ক্রমবর্ধমান খরচ নিয়ন্ত্রণ, পরিবেশবান্ধব সরঞ্জাম ব্যবহার এবং খেলার স্বচ্ছতা বজায় রাখার লক্ষ্যে আইনের এই সর্বশেষ সংস্করণে ব্যাপক সংশোধনী আনা হয়েছে। ২০২৬ সালের ১ অক্টোবর থেকে আন্তর্জাতিক ও ঘরোয়া ক্রিকেটে এই পরিবর্তনগুলো কার্যকর হবে। এবারের সংশোধনীতে ৪২টি আইনের বিভিন্ন ধারায় মোট ৭৩টি পরিবর্তন আনা হয়েছে।

ল্যামিনেটেড ব্যাটের বৈধতা ও ব্যাটের খরচ হ্রাস

নতুন নিয়মের সবচেয়ে বৈপ্লবিক দিক হলো ‘ল্যামিনেটেড ব্যাট’ (টাইপ-ডি)-কে বৈধতা প্রদান। ইতিপূর্বে এ ধরনের ব্যাট অর্থাৎ একাধিক স্তরের কাঠ জোড়া দিয়ে তৈরি ব্যাট অপেশাদার বা বড়দের ক্রিকেটে নিষিদ্ধ ছিল। তবে বর্তমানে উন্নত মানের ইংলিশ উইলোর আকাশচুম্বী দাম এবং এর সংকট বিবেচনা করে এমসিসি এই সিদ্ধান্ত নিয়েছে। একটি ভালো মানের ইংলিশ উইলো ব্যাটের দাম বর্তমানে ১ লক্ষ ৫০ হাজার টাকা পর্যন্ত হতে পারে। ল্যামিনেটেড পদ্ধতিতে ব্যাটের পেছনের দিকে সস্তা কাঠ এবং সামনে উইলোর স্তর ব্যবহার করে খরচ অনেকাংশে কমিয়ে আনা সম্ভব হবে। এমসিসির মতে, এতে ব্যাটের শক্তিতে কোনো উল্লেখযোগ্য পরিবর্তন আসবে না, বরং সাধারণ মানুষের জন্য খেলাটি আরও সাশ্রয়ী হবে।

আইনের গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তনগুলো একনজরে নিচে তুলে ধরা হলো:

আইনের বিষয়পূর্ববর্তী নিয়ম / অবস্থানতুন নিয়ম (১ অক্টোবর ২০২৬ থেকে কার্যকর)
ব্যাটের গঠনল্যামিনেটেড বা স্তরীভূত ব্যাট বড়দের ক্রিকেটে ‘অবৈধ’ ছিল।ল্যামিনেটেড ব্যাট এখন অপেশাদার ও বড়দের ক্রিকেটে ‘বৈধ’।
দিনের শেষ ওভারউইকেট পড়লে দিনের খেলা সেখানেই সমাপ্ত ঘোষণা করা হতো।উইকেট পড়লেও ওভারের বাকি বলগুলো সম্পন্ন করতে হবে।
ভাষা প্রয়োগ‘ব্যাটসম্যান’ জাতীয় পুরুষবাচক শব্দের ব্যবহার ছিল।লিঙ্গ নিরপেক্ষ শব্দ হিসেবে সর্বত্র ‘ব্যাটার’ ব্যবহৃত হবে।
বানি হপ ক্যাচসীমানার বাইরে থেকে বল ঠেলে দেওয়ার ক্ষেত্রে অস্পষ্টতা ছিল।বল স্পর্শ করার পর ক্যাচ ধরতে ফিল্ডারকে সীমানার ভেতরে থাকতে হবে।
হিট উইকেটসরঞ্জামের স্পর্শে স্টাম্প ভাঙলে সাধারণত আউট ধরা হতো।ফিল্ডার বা কিপারের গায়ের ধাক্কায় স্টাম্প ভাঙলে ‘নট আউট’ হবে।
শর্ট রানকেবল ৫ রান জরিমানা এবং আম্পায়ারের সিদ্ধান্ত ছিল।ইচ্ছাকৃত শর্ট রানে ৫ রান জরিমানার পাশাপাশি ফিল্ডিং দল স্ট্রাইকার ঠিক করবে।

ফিল্ডিং ও আম্পায়ারিংয়ের নতুন ব্যাখ্যা

এবারের সংশোধনীতে বাউন্ডারি লাইনে ফিল্ডিংয়ের ক্ষেত্রে বিশেষ কড়াকড়ি আরোপ করা হয়েছে। কোনো ফিল্ডার সীমানার বাইরে থেকে লাফিয়ে বল ভেতরে ঠেলে দেওয়ার সময় কেবল একবারই বল স্পর্শ করতে পারবেন। ক্যাচ পূর্ণ করার সময় তাঁর শরীর অবশ্যই বাউন্ডারি লাইনের ভেতরে থাকতে হবে। এছাড়া উইকেটকিপারের গ্লাভস ব্যবহারের ক্ষেত্রেও নিয়ম স্পষ্ট করা হয়েছে; বোলার রান-আপ শুরু করার সময় গ্লাভস স্টাম্পের সামনে থাকতে পারলেও বল ছোড়ার মুহূর্তে তা অবশ্যই স্টাম্পের পেছনে চলে যেতে হবে।

ডেড বল ও ওভার থ্রো সংক্রান্ত আধুনিকায়ন

আগে বল উইকেটকিপার বা বোলারের হাতে গেলে তবেই ‘ডেড’ ঘোষণা করা হতো। নতুন নিয়মে আম্পায়ারকে এই ক্ষেত্রে অধিক ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। যদি বল ফিল্ডারের হাতে থাকে বা মাটিতে স্থির হয়ে পড়ে থাকে এবং আম্পায়ার নিশ্চিত হন যে খেলার ওই সেশনে আর কোনো ঘটনার সম্ভাবনা নেই, তবে তিনি বল ‘ডেড’ ঘোষণা করতে পারেন। এছাড়া, ওভার থ্রোর সংজ্ঞায় পরিবর্তন এনে বলা হয়েছে যে, উদ্দেশ্যমূলকভাবে উইকেট লক্ষ্য করে বল ছোড়া হলে তবেই তাকে ‘ওভার থ্রো’ হিসেবে গণ্য করা হবে। অনিচ্ছাকৃত মিস ফিল্ডিংকে এখন থেকে এই তালিকায় রাখা হবে না।

এমসিসির এই সুদূরপ্রসারী পরিবর্তনগুলো মূলত ক্রিকেটকে আরও জনবান্ধব এবং আধুনিক যুগের বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ করার একটি প্রয়াস। বিশেষ করে সাশ্রয়ী ব্যাটের অনুমোদন উন্নয়নশীল দেশগুলোতে ক্রিকেটকে আরও জনপ্রিয় করবে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

Leave a Comment