হার্শাল গিবসঃ এক আগ্রাসী ক্ষুধার্ত বাঘ

হার্শেল গিবস, এক সময়ের মাঠ্ কাপানো ব্যাটার। হার্শাল গিবসের মারকুটে ব্যাটিং যেন এক সময়ের ক্রিকেট প্রেমীদের আনন্দের খোরাক হয়ে থাকত। উইন্ডিজের কিংবদন্তী ব্যাটার স্যার ভিভ রিচার্ডসকে আদর্শ মানতেন হার্শাল গিবস। তাই তো, স্যার ভিভ রিচার্ডসের আদর্শ মেনেই আগ্রাসী ব্যাটিংয়ে দর্শক সমর্থকদের জিইয়ে রাখতেন হার্শাল গিবস।

হার্শাল গিবসের জন্ম জন্ম ১৯৭৪ সালের ২৩ ফেব্রুয়ারি, দক্ষিণ আফ্রিকার কেপটাউনে। ছোটবেলা থেকেই দারুণ প্রতিভাবান ছিলেন তিনি। স্কুল দলের হয়ে রাগবি, ফুটবল আর ক্রিকেট তিনটি খেলাই খেলেছেন চুটিয়ে। একবার রাগবি খেলতে গিয়ে বাঁ হাঁটুর লিগামেন্ট ছিঁড়ে গিয়েছিল। এরপর থেকে ক্রিকেটই তাঁর ধ্যানজ্ঞান, ক্রিকেটেই গড়েন বসতি।

হার্শাল গিবসঃ এক আগ্রাসী ক্ষুধার্ত বাঘ
গিবস এবং কার্স্টেন জুটি

১৯৯৬ সালের অক্টোবরে নাইরোবিতে আয়োজিত চার জাতি টুর্নামেন্টে স্বাগতিক কেনিয়ার বিপক্ষে  একদিনের আন্তর্জাতিক ম্যাচের মাধ্যমে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয় তার। তবে,  অভিষেক ম্যাচে গিবস করেছিলেন মাত্র ১৭ রান।

এরপর ভারত সফরে গিয়ে আন্তর্জাতিক  টেস্ট অভিষেকটাও একই বছর হয় কলকাতার ইডেন গার্ডেনে। তবে, টেস্ট অভিষেকেও স্মরণীয়  কিছু করতে পারেন নি গিবস। তার অভিষেক ম্যাচের দুই ইনিংসে করেছিলেন মাত্র ৩১ ও ৯ রান।

[ হার্শাল গিবসঃ এক আগ্রাসী ক্ষুধার্ত বাঘ ]

১৯৯৯ সালের জানুয়ারিতে পোর্ট এলিজাবেথে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে হাঁকান ক্যারিয়ারের প্রথম আন্তর্জাতিক ওয়ানডে সেঞ্চুরি । সে ম্যাচে, তিনি ১২৫ রান করেন। এর দেড় মাস পরেই  ক্রাইস্টচার্চে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে হাকান প্রথম আন্তর্জাতিক টেস্ট সেঞ্চুরি। সে ম্যাচে তিনি ২১১ রান করেন। ওয়েলিংটনের বেসিন রিজার্ভে ঠিক তার পরের টেস্টেই খেলে ফেলেন ১২০ রানের আরেক অনবদ্য ইনিংস।

১৯৯৯ বিশ্বকাপের প্রোটিয়া দলটা ছিল বেশ শক্তিশালী ও দারুণ ভারসাম্যপূর্ন। সেই দলের অপরিহার্য অংশ ছিলেন হার্শেল গিবস। টুর্নামেন্টের ৯ ম্যাচে ১ সেঞ্চুরি আর ২ ফিফটিতে তিনি সংগ্রহ করেন ৩৪১ রান।

ওপেনিং জুটিতে গিবসের সঙ্গী ছিলেন বাঁহাতি গ্যারি কার্স্টেন। লেফট হ্যান্ড-রাইট হ্যান্ড কম্বিনেশনে দারুণ জমেছিল দুজনের কেমিস্ট্রি। হার্ডহিটার গিবসের ‘মারমার কাটকাট’ ব্যাটিং স্টাইলের সাথে চমৎকার মানিয়ে গিয়েছিল কার্স্টেনের শান্ত সৌম্য ধীরস্থির খেলার ধরন। প্রায় প্রতি ম্যাচেই দলকে দারুণ সূচনা এনে দিতেন তাঁরা।

‘৯৯ বিশ্বকাপে একটি বিশেষ কারণে সমালোচিতও হয়েছিলেন গিবস। হেডিংলিতে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সুপার সিক্সের গুরুত্বপূর্ন এক ম্যাচে ফিল্ডিংয়ে একটি অতি সহজ সুযোগ হাতছাড়া করেছিলেন গিবস। ল্যান্স ক্লুজনারের বলে স্টিভ ওয়াহর ‘ইনসাইড এজ’ থেকে ওঠা একটি সহজ ক্যাচ ফেলে দিয়েছিলেন মিড উইকেটে দাঁড়ানো ফিল্ডার হার্শেল গিবস। কথিত আছে, গিবসের হাতে জীবন ফিরে পেয়ে স্টিভ নাকি বলেছিলেন, “বাছা, তুমি তো বিশ্বকাপটাই ফেলে দিলে”! পরে অবশ্য জানা গেছে ওটা একটা গুজব ছাড়া কিছুই নয়।

বলাবাহুল্য, ব্যক্তিগত ৫৬ রানে পাওয়া সেই ‘জীবন’ কাজে লাগিয়ে সেঞ্চুরি করেছিলেন স্টিভ এবং ম্যাচটাও জিতেছিল তাঁর দলই। গিবসের ‘শিশুতোষ’ ভুলের মাশুল গোটা দলকেই গুনতে হয়েছিল বিশ্বকাপের সেমিফাইনাল থেকে বাদ পড়ার মধ্য দিয়ে! কেননা ওই ম্যাচ না জিতলে অস্ট্রেলিয়ার সেমিতে ওঠাই হত না! সেমিফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার সাথে নাটকীয়ভাবে ম্যাচ ‘টাই’ করে বিশ্বকাপ থেকে বিদায় নিতে হয়েছিল খালি হাতে।

হার্শাল গিবসঃ এক আগ্রাসী ক্ষুধার্ত বাঘ
গিবসের ক্যাচ মিসের সেই দৃশ্য

ওয়েস্ট ইন্ডিজ সফরে ড্রেসিংরুমে মাদক সেবনের ‘গুরুতর’ অভিযোগ ওঠে গিবসের বিরুদ্ধে। আরও কয়েকজন সতীর্থের সাথে মিলে নিষিদ্ধ নেশা জাতীয় দ্রব্য ‘মারিজুয়ানা’ সেবনের দায়ে অভিযুক্ত গিবসকে আর্থিক জরিমানাও করা হয়েছিল। তবে গিবসের বিরুদ্ধে সবচাইতে ভয়ংকর অভিযোগটা উঠেছিল পাতানো খেলা নিয়ে।

অধিনায়ক হ্যান্সি ক্রনিয়ের সাথে ম্যাচ ফিক্সিং কেলেঙ্কারিতে গিবসের নামটাও জড়িত থাকার অভিযোগ প্রমাণিত হলে বিতর্কের ঝড় ওঠে ক্রিকেট দুনিয়ায়। অভিযোগের শুনানিতে গিবস অবশ্য নিজে মুখে স্বীকার করেছিলেন সবকিছু। ক্রনিয়ের প্রস্তাবেই ২০০০ সালে ভারতের বিপক্ষে একটি ওয়ানডেতে ১৫ হাজার মার্কিন ডলারের বিনিময়ে অল্প রানে (২০ রানের কমে) নিজের উইকেট ছুঁড়ে আসতে রাজি হয়েছিলেন গিবস!

কিন্তু মজার ব্যাপার হল, তিনি খেলার সময় সেই অনৈতিক চুক্তির কথা বেমালুম ভুলে যান এবং অল্প রানে আউট হওয়ার বদলে করে বসেন ৭২ রান! যে কারণে তিনি কোন টাকাও পান নি। তবে দক্ষিণ আফ্রিকান ক্রিকেট বোর্ড মোটেই হালকাভাবে নেয় নি বিষয়টা। ছয় মাসের জন্য গিবসকে সব রকমের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে খেলার ওপর নিষেধাজ্ঞা জারি করেছিল তারা।

ছয় মাসের বিরতি শেষে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে গিবস ফিরে আসেন একজন ধারাবাহিক রান সংগ্রাহকের ভূমিকায়। দলে নিজের হারানো জায়গাটা ফিরে পেতে খুব বেশি সময় লাগে নি তাঁর।

হার্শাল গিবসঃ এক আগ্রাসী ক্ষুধার্ত বাঘ
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সেঞ্চুরির পর গিবস

এরপর, একের পর মারকুটে ইনিংস খেলে নিজেকে নিয়ে গেছেন এক অনন্য উচ্চতায়। ২০০৬ সালে জোহানেসবার্গে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সেই ঐতিহাসিক রান চেজের কথা কোনদিন ভোলা সম্ভব নয়। অস্ট্রেলিয়ার করা ৪৩৪ রান তাড়া করতে নেমে অধিনায়ক গ্রায়েম স্মিথের (৫৫ বলে ৯০) সঙ্গে তৃতীয় উইকেট জুটিতে মাত্র ২০ ওভারে তুলেছিলেন ১৮৭ রান! চোখ জুড়ানো অপূর্ব সব স্ট্রোকের পসরা সাজিয়ে ২১ চার ও ৭ ছক্কায় গিবস খেলেছিলেন ১১১ বলে ১৭৫ রানের বিস্ফোরক এক ইনিংস। অসম্ভব এক লক্ষ্যকেও সেদিন সম্ভব মনে করাতে বাধ্য করিয়েছিল যে ইনিংস!

১৪ বছরের বর্নাঢ্য ক্যারিয়ারে সব ধরনের আন্তর্জাতিক ক্রিকেট মিলিয়ে গিবস রান করেছেন ১৪০০০ এর উপরে। দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেট ইতিহাসে তৃতীয় সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক তিনি। এছাড়া দুর্দান্ত ফিল্ডার হিসেবে আলাদা ‘খ্যাতি’ অর্জন করা গিবসের ঝুলিতে রয়েছে ২১০ টি ক্যাচও।

আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে টপ অর্ডার (মূলত ওপেনার) ব্যাটসম্যান হিসেবে খেলেছেন ৯০ টেস্ট এবং ২৪৮ ওয়ানডে। টেস্টে ১৫৪ ইনিংসে ৪১.৯৫ গড়ে তিনি রান করেছেন ৬১৬৭। ২৬টি ফিফটির পাশাপাশি সেঞ্চুরি করেছেন ১৪টি যার মধ্যে ডাবল সেঞ্চুরি আছে দুটি। সর্বোচ্চ স্কোর ২২৮ পাকিস্তানের বিপক্ষে।

আর ওয়ানডেতে ২৪০ ইনিংসে ৩৬.১৩ গড়ে তাঁর সংগ্রহ ৮০৯৪ রান; স্ট্রাইক রেট ৮৩.৭৬। সেঞ্চুরি করেছেন ২১টি, ফিফটি আছে ৩৭টি। সর্বোচ্চ রান ১৭৫ অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে।

এছাড়া ২৩ ম্যাচের আন্তর্জাতিক টি২০ ক্যারিয়ারে ৩ ফিফটিসহ ১২৫.৮ স্ট্রাইক রেটে গিবসের অর্জন ৪০০ রান।

আরও পড়ুন:

মন্তব্য করুন