সানিয়া মির্জা : ভারতীয় টেনিসের হৃদস্পন্দন

ভারতের সবচেয়ে সফল টেনিস তারকা সানিয়া মির্জা।মূলত, ভারতীয় উপমহাদেশে টেনিসকে জনপ্রিয় করে তোলার মূল কারিগির সানিয়া। সানিয়া মির্জা ২০০৩ থেকে ২০১৩ সাল পর্যন্ত প্রায় এক দশকের বেশি সময় ধরে ভারতীয় টেনিস অঙ্গনে ১ নম্বরে অবস্থান করা সর্বোচ্চ রেকর্ডধারী ভারতীয় খেলোয়াড়।

 

সানিয়া মির্জা
সানিয়া মির্জা

 

সানিয়া মির্জার জন্ম ১৯৮৫ সালের ১৬ নভেম্বর ভারতের মুম্বাই শহরে। সানিয়া মির্জার বাবা ইমরান মির্জা একজন বিল্ডার ও ক্লাব ক্রিকেটার ছিলেন এবং তার মা নাসিমা মির্জা প্রিন্টিং ব্যাবসায় নিয়োজিত ছিলেন।সানিয়ার জন্মের পরই তার পরিবার ভারতের হায়দ্রাবাদ শহরে স্থানান্তরিত হয়।সেখানেই সানিয়ার ছোট বোন আনাম মির্জার জন্ম হয়। সানিয়া মির্জার ছোটবেলা অন্যান্য শিশুদের মতোই সাধারণ ছিল। তিনি স্কুলে যেতে এবং পড়াশোনা করতে ভীষণ পছন্দ করতেন। মাত্র ছয় বছর বয়সে তিনি প্রথম টেনিস র্যাকেট স্পর্শ করেন এবং এরপর থেকে এই র্যাকেটই তার জীবনের অংশ হয়ে উঠে।

[ সানিয়া মির্জা : ভারতীয় টেনিসের হৃদস্পন্দন ]

প্রথমে সানিয়ার বাবা ইমরান মির্জা তাকে ট্রেনিং করালেও, পরবর্তীতে রজার অ্যান্ডারসনের কাছে তিনি ট্রেনিং নিতে শুরু করেন। ছোটবেলা থেকেই বিভিন্ন রকমের কটু কথার সম্মুখীন হতে হয় সানিয়াকে।তবুও দমে যাননি সানিয়া। লড়াই করে গেছেন বুক চিতিয়ে। নিজের চেষ্টা এবং কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে জয় করেছেন সকল প্রতিকুলতা। সানিয়া মির্জা বিশ্বের সেরা ডাবলস টেনিস খেলোয়াড়দের মধ্যে অন্যতম।আন্তর্জাতিক টেনিস ক্যারিয়ারে বেশ কিছু সাফল্য রয়েছে তার।

সানিয়া তার আন্তর্জাতিক টেনিস ক্যারিয়ারে মোট ৩ টি ডাবলস গ্রান্ড স্ল্যাম টাইটেল জিতেছেন। ২০০৩ সালে তিনি প্রথম উইম্বলডন ডাবলস গ্র্যান্ড  স্ল্যাম টাইটেল জিতেন। সেখানে, তার পার্টনার ছিলেন রাশিয়ার অ্যালিসা ক্লেইভানোভা। ২০০৪ সালে এশিয়ান টেনিস চ্যাম্পিয়নশীপেও তিনি চমৎকার টেনিসের প্রদর্শন করেন। সেই টুর্ণামেন্টে তিনি রানার আপ হন।সে বছর ভারতের অর্জুনা এওয়ার্ড জেতেন তিনি।

 

উইম্বল্ডন ডাবলস চ্যাম্পিয়ন ট্রফি হাতে সানিয়া মির্জা
উইম্বল্ডন ডাবলস চ্যাম্পিয়ন ট্রফি হাতে সানিয়া মির্জা

 

২০০৫ সাল সানিয়ার ক্যারিয়ারে এক অবিস্মরণীয় বছর। সে বছর, তিনি বেশ কিছু মাইলফলক স্পর্শ করেন, যা তাকে বিশ্ব টেনিসে এক নতুন উচ্চতার আসনে প্রতিষ্ঠিত করেছে। ২০০৫ সালে ইউএস ওপেন টেনিসে তিনি চতুর্থ রাউন্ডে ওঠেন যা ছিলো কোনো ভারতীয় নারী টেনিস খেলোয়াড়ের মধ্যে প্রথম। এছাড়া, একই বছর অস্ট্রেলিয়ান ওপেন টেনিসে তিনি তৃতীয় রাউন্ডে ওঠেন। একই বছরে তিনি ভারতের হায়দ্রাবাদে অনুষ্ঠিত হায়দ্রাবাদ ওপেন টেনিসে চ্যাম্পিয়ন হন।

যার মাধ্যমে ডব্লিউটিএ সিংগেলস টাইটেল জেতা প্রথম ভারতীয় নারী টেনিস খেলোয়াড় হন তিনি। এ বছর তিনি ডব্লিউটিএ নিউ কামার অব দ্যা ইয়ার এওয়ার্ডে লাভ করেন সানিয়া। ২০০৬ এশিয়ান গেমসে নারী এককে রৌপ্য পদক অর্জন করেন। এছাড়াও, একই টুর্ণামেন্টে তিনি দ্বৈত এককে স্বর্ণপদক অর্জন করেন যেখানে তার পার্টনার ছিলেন লিন্ডার পিস। ২০০৬ সালে তিনি ভারতের “পদ্মশ্রী” উপাধিতে ভূষিত হন।

২০০৭ ইউএস ওপেনে তিনি নারী এককে তৃতীয় রাউন্ড পর্যন্ত টুর্ণামেন্টে টিকে থাকেন।এছাড়াও, সেই টুর্ণামেন্টে মিক্সড ডাবলস ভারতের মহেশ ভূপাতির সংগে কোয়ার্টার ফাইনাল খেলেন। ২০০৮ সালে তিনি ভারতের চেন্নাইয়ের এমজিয়ার এডুকেশনাল এন্ড রিসার্চ ইন্সটিটিউট থেকে সম্মান্সূচক ডক্টর অব লেটার্স ডিগ্রি লাভ করেন। সে বছর অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে মিক্সড ডাবলসে তিনি রানার আপ হন।

২০০৯ সালে অস্ট্রেলিয়ান ওপেনে মিক্সড ডাবলসে ভারতের মহেশ ভূপাতির সংগে তিনি প্রথম ডাবলস টাইটেল জেতেন। একই বছর ব্যাংককের অনুষ্ঠিত পাতায়া ওমেন্স ওপেন টুর্নামেন্টের ফাইনাল খেলেন তিনি। ২০১০ সাল ছিলো, সানিয়ার টেনিস ক্যারিয়ারে এক বিষাদময় বছর।

এ বছরে তিনি ইঞ্জুরিতে পড়েন  এবং ইঞ্জুরিতে পড়ার আগে বিভিন্ন টুর্ণামেন্টের প্রথম রাউন্ড থেকেই বাদ পড়েন। কিন্তু, ২০১০ এশিয়ান গেমসে ভারতের পক্ষে নারী একক এবং দ্বৈত উভয়েই তিনি ব্রোঞ্জ পদক লাভ করেন। ২০১৫ সালে মার্টিনা হিংগিসকে নিয়ে বিশ্বের ১ নং নারী দ্বৈত খেলোয়াড় হন। আন্তর্জাতিক ক্যারিয়ারে সানিয়া এশিয়ান গেমস, কমনওয়েলথ গেমস এবং আফ্রো এশিয়ান গেমস মিলিয়ে ভারতের পক্ষে মোট ১৪ টি পদক পেয়েছেন যার মধ্যে স্বর্ণ পদকের সংখ্যা ৬টি।

 

সানিয়া মির্জা এবং মার্টিনা হিঙ্গিস অস্ট্রেলিয়ান ওপেন ডাবলসের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর
সানিয়া মির্জা এবং মার্টিনা হিঙ্গিস অস্ট্রেলিয়ান ওপেন ডাবলসের চ্যাম্পিয়ন হওয়ার পর

 

২০১০ সালের ৬ নভেম্বর , সানিয়া বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন পাকিস্তান ক্রিকেট দলের সাবেক অধিনায়ক শোয়েব মালিকের সংগে।২০১৮ সালে তিনি প্রথম সন্তানের মা হন। ২০২২ টেনিস মৌসুমের পর তিনি তার বর্ণাঢ্য টেনিস ক্যারিয়ারের ইতি টানবেন।

 

সানিয়া মির্জা এবং তার পরিবার
সানিয়া মির্জা এবং তার পরিবার

 

সানিয়া মির্জারা পারেন চোখে চোখ রেখে জীবনযুদ্ধে এগিয়ে যেতে। নিজের  খেলোয়াড়ি জীবনে তাকে সইতে হয়েছে  অনেক সমালোচনা। তবুও, নিন্দুকদের বুড়ো আঙুল দেখিয়ে সমালোচনার জবাব দিয়ে গেছেন তিনি টেনিস র‍্যাকেটের মাধ্যমে । সময়ের পরিক্রময়ায় নিজেকে নিয়ে গেছেন অনন্য এক উচ্চতায়। হয়ে গেছেন ভারতীয় এক টেনিস কিংবদন্তী। সানিয়াদের মতো জীবনযুদ্ধ লড়্রাকু সৈনিকরাই আদর্শ হয়ে থাকবেন সবার জন্য।

আরও পড়ুন:

মন্তব্য করুন