সাইদ আনোয়ার : ক্রিকেট মাঠে এক সিংহের অবস্থান

৯০ এর দশকেও পুরো ক্রিকেট বিশ্বকে আক্রমণাত্মক ব্যাটিংয়ে পরিচয় করানো পাকিস্তানি ক্রিকেটারদের মধ্যে প্রথম ক্রিকেটার, সাইদ আনোয়ার। তেমন ফুটওয়ার্ক ছাড়া শুধু মাত্র হ্যান্ড-আই কোঅর্ডিনেশনে প্রতিপক্ষ বোলারদের তুলোধুনো করে ছাড়তেন আনোয়ার। সাইদ আনোয়ারের খেলা সেই সুদর্শন শটগুলো যেনো আজো ৯০ এর দশকের ক্রিকেটপ্রেমীদের স্মৃতির মণিকোঠায় বেচে আছে।

সাইদ আনোয়ারঃ ক্রিকেট মাঠে এক সিংহের অবস্থান
ভারতের বিপক্ষে সাইদ আনোয়ার

সাইদ আনোয়ারের জন্ম ১৯৬৮ সালের ৬ই সেপ্টেম্বর কারাচিতে। ১৯৮৯ সালে তিনি কম্পিউটার সাইন্স এবং ইঞ্জিনিয়ারিংয়ে গ্র্যাজুয়েশন শেষ করেন। ১৯৮৯ সালে পাকিস্তানের প্রোফেশনাল ক্রিকেটার হওয়ার আগে তার ইচ্ছা ছিলো মাস্টার্সের জন্য যুক্তরাষ্ট্রে যাওয়া।শেষ পর্যন্ত জয় হলো ক্রিকেটের। আমেরিকা আর যাওয়া হয়নি সাইদের। অবশেষে, পাকিস্তান জাতীয় দলে ডাক পান সাঈদ আনোয়ার।  সময়ের পরিক্রমায় একজন প্রফেশনাল ক্রিকেটার হিসেবে তার ক্যারিয়ার শুরু করেন সাইদ আনোয়ার।

[ সাইদ আনোয়ারঃ ক্রিকেট মাঠে এক সিংহের অবস্থান ]

১৯৮০-৯০’র দশকে যাদের জন্ম, তাদের কাছে সাঈদ মানে কী, তা আসলে বলে বা লিখে বোঝানো মুশকিল। ১৯৮৯ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয় তার।১৯৮৯ সালের জানুয়ারিতে উইন্ডিজের বিপক্ষে ওয়ানডে অভিষেক হয় তার। প্রায় ২ বছর পরে ১৯৯০ সালের নভেম্বরে টেস্ট অভিষেক। মোট ৫৫ টেস্টে ৪৫.৫২ গড়ে সাঈদ আনোয়ারের রান ৪০৫২। সর্বোচ্চ সংগ্রহ অপরাজিত ১৮৮* রান। ২৪৭টি ওয়ানডে ম্যাচে ৩৯.২১ গড়ে মোট সংগ্রহ ৮৮২৪ রান। সর্বোচ্চ রান ১৯৪। সাইদের ওয়ানডে অভিষেকের পরের বছর ১৩ ফেব্রুয়ারির আগ পর্যন্ত পাকিস্তান নিশ্চিত ছিল না যে, তারা সাঈদকে দিয়ে ইনিংস ওপেন করাবেন কিনা। ওই সময় বেনসন অ্যান্ড হেজেস ত্রিদেশীয় সিরিজ চলছিল।

সিরিজটি শুরু হয়েছিল ১৯৮৯ সালের ডিসেম্বরে। বছরের শেষ দিনে পাকিস্তানের প্রথম ম্যাচে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৩৪ বলে ৩৩ রান করেছিলেন সাঈদ। ওই ম্যাচে সেকেন্ড ডাউনে নেমেছিলেন তিনি। এর পরের ম্যাচ ছিল অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে। একই পজিশনে খেলতে নেমে তিন রান করে আউট হন। পরের ম্যাচে খেলা হয়নি তার। এরপর অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ব্রিসবেনে তাকে ওয়ান-ডাউনে পাঠানো হয়। ওপেনার সেলিম ইউসুফ দ্রুত আউট হয়ে যাওয়ায় বলতে গেলে ইনিংসের শুরুর দিকেই তাকে মাঠে নামতে হয়েছিল। ওই ম্যাচে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ২৪ বলে বলে ৩৭ রান করেছিলেন সাঈদ।

পরের ম্যাচে তাকে ওপেনিংয়ে নামায় পাকিস্তান। সে ম্যাচে তিনি করেন ৩০ বলে ২৭ রান। এর পর দুই ম্যাচে করেন যথাক্রমে ৯৯ বলে ১২৬ এবং ৩৬ বলে ৪৩ রান। রান সংগ্রাহকের তালিকায় তিন নম্বরে থেকে সিরিজ শেষ করেন। ৯ ম্যাচে তার স্ট্রাইক রেট ছিল ১০৫.৩৯। এবং ওই সিরিজে সবচেয়ে বেশি চার-ছক্কা এসেছিল তার ব্যাট থেকে। এরপর থেকেই নিয়মিত ওপেনার হিসেবে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে মাঠ মাতাতে থাকেন সাইদ আনোয়ার।

১৯৯৬, ১৯৯৯ এবং ২০০৩- তিনটি বিশ্বকাপেই সাঈদের দুর্দান্ত পারফরম্যান্স ছিল। বিশ্বকাপের ২১টি ম্যাচে তার সংগ্রহ ছিল ৯১৫ রান। গড় রান ৫৩.৮২। এছাড়াও ৭টি টেস্ট ও ১১টি ওয়ানডেতে অধিনায়কত্বও করেছেন। তবে অসুস্থতা এবং ইনজুরির  কারণে বারবার ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে তার ক্যারিয়ার। যে কারণে তিনি ১৯৯২ সালের বিশ্বকাপজয়ী পাকিস্তান দলে থাকতে পারেননি। ১৯৯০ সালের ডিসেম্বর থেকে ১৯৯৩ সালের ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত তিনি মাত্র ৫টি ওয়ানডে খেলেছিলেন। তার মধ্যে একবারও দুই অঙ্কের রানে পৌঁছতে পারেননি।

সাইদ আনোয়ারঃ ক্রিকেট মাঠে এক সিংহের অবস্থান
সাইদ আনোয়ারঃ ক্রিকেট মাঠে এক সিংহের অবস্থান

১৯৯৬ সালে, বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন সাইদ আনোয়ার। তার স্ত্রী লুবনা আহমেদ পেশায় একজন চিকিৎসক। ১৯৯৭ সালে ভারতের বিপক্ষে সাইদ আনয়ার করেন ওয়ানডে ক্রিকেটে তৎকালীন ব্যাক্তিগত সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড।

১৩ বছর ধরে সাঈদ আনোয়ারের করা ১৯৪ ওয়ানডেতে সর্বোচ্চ রানের রেকর্ড হিসেবে অক্ষত ছিল। জিম্বাবুয়ের চার্লস কভেন্ট্রিও একই স্কোর করেছিলেন। তাদের যুগ্ম রেকর্ড ভেঙে দেন ভারতের ক্রিকেট কিংবদন্তি শচীন টেন্ডুলকার।

২০১০ সালে দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে অপরাজিত ২০০ রানের ইনিংস খেলেন শচিন। ওয়ানডে ক্রিকেটের ইতিহাসে সেটাই প্রথম ডাবল সেঞ্চুরি। ভারত-বাংলাদেশ-শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে সাঈদ আনোয়ারের পারফরম্যান্স বরাবরই ভালো।

তার ক্যারিয়ারের ৩১টি আন্তর্জাতিক সেঞ্চুরির মধ্যে ১৫টি এসেছে এই তিন দেশের বিপক্ষে। ১৯৯৭ সালে তিনি উইজডেন পত্রিকার বিচারে বর্ষসেরা ক্রিকেটার হয়েছিলেন।

২০০১ সালে মুলতানে বাংলাদেশের বিপক্ষে পাকিস্তানের ঐতিহাসিক টেস্ট জয় এখনও আলোচনার ঝড় তোলে। এই টেস্টের শেষ দিনে এক পারিবারিক বিপর্যয়ে তছনছ হয়ে যায় সাঈদ আনোয়ারের জীবন। দীর্ঘ অসুখের পরে মারা যায় তার ৩ বছরের শিশুকন্যা বিসমাহ।

এরপর থেকে সাঈদ আনোয়ারের কাছে জীবনের অর্থই পাল্টে যায়। ক্রিকেট ছেড়ে সাঈদ মন দেন ধর্মপ্রচারে। তার একমাত্র সঙ্গী হয় ধর্মপুস্তক। সন্তানশোক ভুলতে ধর্মের বাণীতেই সান্ত্বনার আশ্রয় খুঁজে পেয়েছিলেন তিনি। ২০০৩ সালে আবার ক্রিকেটে ফিরেছিলেন সাঈদ আনোয়ার। খেলেছিলেন বিশ্বকাপ। জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে নিজের বিশ্বকাপের শেষ ম্যাচে করেছিলেন ৪০ রান যদিও সে ম্যাচটি পরবর্তীতে বৃষ্টিবিঘ্নিত হয়ে পরিত্যাক্ত হয়।

সাইদ আনোয়ারঃ ক্রিকেট মাঠে এক সিংহের অবস্থান
১৯৯৯ বিশ্বকাপে সাইদ আনোয়ার

শেষ ম্যাচের আগের ম্যাচ ছিল ভারতের বিপক্ষে। সেই ম্যাচে‌ পাকিস্তান ৬ উইকেটে হারলেও আনোয়ার সেঞ্চুরি করেছিলেন। সেই ইনিংস তিনি উৎসর্গ করেছিলেন বিসমাহর স্মৃতির উদ্দেশ্যে। ১৯৯৬, ১৯৯৯ এবং ২০০৩।

তিনটি বিশ্বকাপেই সাঈদ আনোয়ারের দু্র্ধর্ষ পারফরম্যান্স ছিল। বিশ্বকাপের ২১টি ম্যাচে তার সংগ্রহ ছিল ৯১৫ রান। গড় ৫৩.৮২।৭টি টেস্ট এবং ১১টি ওয়ানডেতে অধিনায়কত্বও করেছেন সাঈদ আনোয়ার।

তবে অধিনায়ক হিসেবে তিনি কোনোদিন সে ভাবে সাফল্য পাননি। বর্তমানে ক্রিকেট রাজ্য থেকে অনেক দূরে ইসলামের সুশীতল ছায়ায় আশ্রয়গ্রহণ করে দীন প্রচারে নিরলস দিন কাটাচ্ছেন এক সময়ের এই মারকুটে ওপেনার।

আরও পড়ুন:

মন্তব্য করুন