বাকিরা একাই একশ, লারা একাই ১৫৩!

বাকিরা একাই একশ, লারা একাই ১৫৩!

বাংলা প্রবাদ, একাই একশ। সবাই শুনেছেন, কমবেশি ব্যবহারও করেছেন। ক্রিকেটের লেখায় বাংলা প্রবাদ কেনো? কারণটা ব্রায়ান চার্লস লারা। অন্যরা একাই একশ, রেকর্ডের বরপুত্র লারা একাই ১৫৩। দেড়শ বছরের টেস্ট ইতিহাসে টেস্ট ক্রিকেট ইতিহাসের সেরা ইনিংস কোনটি? এই নিয়ে অনেক আলোচনা হয়।

রান বন্যায় ভাসিয়ে কতো রথীমহারথী অনবদ্য সব ইনিংস খেলছেন প্রায় দেড়শ বছরের টেস্ট ইতিহাসে। তবে অনেকের মতে সেরা টেস্ট ইনিংস হচ্ছে ১৯৯৯ সালের ৩০ই মার্চ লারার অস্ট্রেলিয়ার সাথে করা অপরাজিত ১৫৩ রান। সেই ইনিংসের পুরোটা থাকছে এই লেখায়।

বাকিরা একাই একশ, লারা একাই ১৫৩!
ব্রায়ান চার্লস লারা

ফ্রাঙ্ক ওরেল ট্রফি খেলতে বিংশ শতাব্দীর শেষে ওয়েস্ট উয়েস্ট ইন্ডিজে গেল স্টিভ ওয়াহ’র অপারেজয় অস্ট্রেলিয়া। প্রথম টেস্ট শোচনীয় ৩১২ রানের পরাজয় স্বাগতিক ওয়েস্ট উইন্ডিজের। দ্বিতীয় টেস্টে ব্রায়ান লারার ২১৩ রানের ইনিংসে ওয়েস্ট উইন্ডিজ ১০ উইকেটে জিতে সিরিজে সমতা ১-১।

২১৩ রানের ইনিংস খেলার আগে ব্রায়ান লারাকে অবশ্য খানিক রাগিয়ে দিয়েছিলেন অস্ট্রেলিয়ানরা। ব্রায়ান লারা ম্যাচের আগে নেটে ব্যাটিং প্র্যাকটিস করতে গেলে দেখে সব নেট দখল করে ব্যাটিং প্র্যাকটিস করছে অস্ট্রেলিয়ানরা। অপেক্ষা করার পরে রাগে ফুঁসতে ফুঁসতে মাঠ ছাড়েন ব্রায়ান লারা। সেই রাগ পরে রেকর্ডের বরপুত্র ব্রায়ান ঝাড়েন অজি বোলারদের উপর।

[ বাকিরা একাই একশ, লারা একাই ১৫৩! ]

সিরিজের তৃতীয় টেস্ট ১৯৯৯ সালের মার্চের ২৬ তারিখে শুক্রবারের সকালে টস জিতে ব্যাটিং নেয় অস্ট্রেলিয়া দলের অধিনায়ক স্টিভ ওয়াহ। পেরির বলে লেগ বিফোরের ফাঁদে পড়ার আগে স্টিভের অধিনায়কোচিত ১৯৯ রানের ইনিংসের সাথে রিকি পন্টিংয়ের ১০৪ রানের ইনিংসে সফরকারী অজিরা প্রথম ইনিংসে থামে ৪৯০ রানে।

ওয়েস্ট ইন্ডিজের টপ অর্ডার প্রথম ইনিংসে চরম ব্যর্থ হয়। স্বাগতিকরা ১০০ রান করার আগেই খুইয়ে বসে ছয় উইকেট। ওপেনার শেরউইন ক্যাম্পবেলের শতক আর আট নাম্বারে নামা রিডলি জ্যাকবসের ৬৮ রানে ওয়েস্ট ইন্ডিজ প্রথম ইনিংসে করে ৩২৯ রান। অজিদের হয়ে গ্লেন ম্যাকগ্রা নেন চার ও জেসন গিলেস্পি নেন তিন উইকেট।

১৬১ রানের লিড পাওয়া সফরকারী অজিরা দ্বিতীয় ইনিংসে গুটিয়ে যায় ১৪৬ রানে। সর্বোচ্চ ৩২ রান আসে শের্ন ওয়ার্নের ব্যাট থেকে। দ্বিতীয় ইনিংসে ৩৯ রানের বিনিময়ে কোর্টনি ওয়ালশ তুলে নেন পাঁচ উইকেট। ওয়েস্ট উইন্ডিজের সামনে লক্ষ্য দাঁড়ায় ৩০৮ রানের।
যেকোন উইকেটে চতুর্থ ইনিংসে ৩০৮ করা বেশ কঠিনই। তার উপর প্রতিপক্ষ দলে যদি থাকে জেসন গিলেস্পি, গ্লেন ম্যাকগ্রা, শেন ওয়ার্ন, স্ট্রুয়ার্ট ম্যাকগিলের মতো বোলাররা তাহলে তো অসম্ভবই বলা চলে। তবে ক্যারিবীয়রা আশা করতেই পারেন, কারণ তাদের দলে যে আছে একজন লড়াকু সেনানী ব্রায়ান চার্লস।

আগের ইনিংসে সেঞ্চুরিয়ান ক্যাম্পবেল, এই ইনিংসে ৭৭ রান করা ডেভ জোসেফ ও নাইটওয়াচম্যান পেদ্রো কলিন্স আউট হওয়ার পর উইকেটে আসেন ব্রায়ান লারা। চতুর্থ দিন শেষে উইন্ডিজের রান ৮৫/৩। ব্রায়ান লারা অপরাজিত দু রানে। পুরো পরীক্ষাটা পরেদিনই দিতে হবে ব্রায়ান চার্লস লারাকে।

[ বাকিরা একাই একশ, লারা একাই ১৫৩! ]

পঞ্চম দিনে জিততে উইন্ডিজের প্রয়োজন ২২৩ রান হাতে আছে সাত উইকেট; সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ একজন ব্রায়ান লারাও আছেন। গ্রিফিথ, হুপার দ্রুত প্যাভিলিয়নে ফেরায় উইন্ডিজের রান ১০৫/৫। জিমি অ্যাডামসকে নিয়া ধাক্কা সামলিয়ে উইন্ডিজ লাঞ্চে গেলেন ১৬১/৫ রানে, ব্রায়ান অপরাজিত ৪৪ রানে।

লাঞ্চ থেকে এসে ১১৮ বলে ৬ চার আর এক ছয়ে অর্ধশতক করা ব্রায়ান লারা পরের ফিফটি করলেন মাত্র ৫১ বলে। শতক ১৬৯ বলে ১৪ চার, এক ছয়ে। স্বাগতিক ওয়েস্ট ওয়েস্ট ইন্ডিজের স্কোর তখন ২৩৪/৫। জিততে ৭৪ রান যখন প্রয়োজন তখন ব্রায়ান ক্যাচ দিয়েছিলেন শেন ওয়ার্নের কাছে! সেটি লুফে নিতে পারেনি ওয়ার্ন। ক্যাচের পাশাপাশি বুঝি ম্যাচটাও ফেলে দিলেন!

ব্রায়ান চার্লস লারা
ব্রায়ান চার্লস লারা

৩৮ রান করে গ্লেন ম্যাকগ্রার বলে জিমি অ্যাডামস বোল্ড হলে ভাঙ্গে ১৩৩ রানের জুটি। ২৩৮/৬ থেকে গ্লেন ম্যাকগ্রা ঝড়ে স্বাগতিক ওয়েস্ট ওয়েস্ট ইন্ডিজ হয়ে যায় ২৪৮/৮। জয়ের জন্য তখনো প্রয়োজন ৬০ রানের, হাতে আছে দু উইকেট। উইকেটে তখনো অবিচল ব্রায়ান।

এরপর জেসন গিলেস্পির বলে ব্রায়ান লারার ক্যাচ মিস করেন উইকেট রক্ষক ইয়ান হিলি। কার্টলি অ্যামব্রোসের সাথে ৫৪ রানের জুটি গড়েন ব্রায়ান। কার্টলি অ্যামব্রোসের অবদান যেখানে ১২ রানের। ৩০২ রানে কার্টলি অ্যামব্রোস ফিরেন। টেস্ট ক্রিকেটে সর্বাধিক ৪৩ ডাক মারা কোর্টনি ওয়ালশ শেষ ব্যাটসম্যান হিসেবে আসেন উইকেটে। অতীব গুরুত্বপূর্ণ জেসন গিলেস্পির তিনটি বল খেলেন তিনি।

[ বাকিরা একাই একশ, লারা একাই ১৫৩! ]

স্বাগতিক ওয়েস্ট উইন্ডিজের জিততে দরকার ছয় রান। জেসন গিলেস্পি দেন নো বল। গ্লেন ম্যাকগ্রার ওভারে প্রথম বলে দু রান নেন ব্রায়ান। ফের গ্লেন ম্যাকগ্রা দেন এক ওয়াইড। ওয়েস্ট উইন্ডিজের জিততে লাগে দুই রান, ম্যাচ টাই হতে দরকার এক রান। পঞ্চম বলে এক রান নিলেন ব্রায়ান। ম্যাচ টাই।

শেষ বলে কোর্টনি ওয়ালশ নিজের উইকেট বাঁচালেন। পরের ওভারে জেসন গিলেস্পির প্রথম বলে বাউন্ডারি মেরে উইন্ডিজকে জেতালেন ব্রায়ান লারা। সময়ের হিসেবে ৫ ঘণ্টা ৫৪ মিনিট। বলের হিসেবে ২৫৬, ১৯ চার, ১ ছয়ে অপরাজিত ১৫৩।

ইতিহাসের পাতায় জায়গা করে নেওয়া যে ইনিংস, সেই ঐতিহাসিক ইনিংসের বাইশ বছর পেরিয়ছে। ক্রিকেটে অজস্র ইনিংসের মাঝেও যে ইনিংস দাগ কেটে আছে সব ক্রিকেটপ্রেমীদের মনে। ক্যারিয়ারের শেষে ব্রায়ান বলেছিলেন; ‘ডিড আই এন্টারটেইন ইউ?’ উত্তরটা বোধহয় আপনি অবশ্যই পেরেছেন রেকর্ডের বরপুত্র ব্রায়ান চার্লস লারা। পেরেছেন কী!

[ বাকিরা একাই একশ, লারা একাই ১৫৩! ]

আরও পড়ুন:

মন্তব্য করুন