রিকি পন্টিং, এক অজি ত্রয়ীর গল্প

রিকি পন্টিং, এক অজি ত্রয়ীর গল্প : ব্রায়ান লারা, মাহেলা জয়াবর্ধানে, সৌরভ গাঙ্গুলী, রাহুল দ্রাবিড়, কুমার সাঙ্গাকারা, জ্যাক ক্যালিস, ইয়ান বোথাম এই ক্রিকেট বিশ্বে এমন কিছু রথী মহারথী আছেন যারা কখনোই স্পর্শ করতে পারেননি বিশ্বকাপ শিরোপা৷ শচীন – ইমরান খাঁনদের মতো কিংবদন্তীরা ক্যারিয়ার সায়াহ্নে এসে পেরেছেন। আবার ভিভ রিচার্ডডস, ক্লাইভ লয়েড, স্টিভ ওয়াহ, মাইকেল ক্লার্করা দুইবার করে স্পর্শ করেছেন।

রিকি পন্টিং
রিকি পন্টিং

আর অজি ত্রয়ী তা করেছেন তিন বার করে। এই তিনজন হলেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট ইতিহাসের সর্বকালের সেরা ব্যাটসম্যানের একজন, বলা যায় ক্রিকেট ইতিহাসে সর্বকালের সেরা অধিনায়কদের একজন তর্ক সাপেক্ষে সর্বকালের সেরা অধিনায়ক রিকি থমাস পন্টিং।

বাকী দুজন অজি উইকেট রক্ষক ব্যাটসম্যান অ্যাডাম গিলক্রিস্ট এবং তাদের স্বদেশী পেসার গ্ল্যান ম্যাকগ্রা। আবার রিকি পন্টিং বিশ্বকাপে এতোটাই সফল আর ভাগ্যবান যে অধিনায়ক হিসেবেই জিতেছেন দুই বিশ্বকাপ। যেখানে অনেক গ্রেট অধিনায়কেরাও একবারও জয়ের স্বাদ নিতে পারেননি।

[ রিকি পন্টিং, এক অজি ত্রয়ীর গল্প ]

এই তিনজনই একসাথে জিতেছেন ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত ১৯৯৯ বিশ্বকাপ। দক্ষিণ আফ্রিকায় – কেনিয়া এবং জিম্বাবুয়েতে অনুষ্ঠিত ২০০৩ বিশ্বকাপ এবং ওয়েস্ট ইন্ডিজে অনুষ্ঠিত ২০০৭ বিশ্বকাপ। তারা একসাথে খেলেছেনও এই তিন বিশ্বকাপ।

প্রথমবার ১৯৯৬ বিশ্বকাপে পন্টিং জাতীয় দলের প্রতিনিধিত্ব করেছিলেন। রিকি পন্টিং নিজের শেষ বিশ্বকাপ খেলেছেন ২০১১ উপমহাদেশের মাটিতে। ১৯৯৬ তে শুধু ব্যাটসম্যান হিসেবে খেললেও কোনো শিরোপা জুটেনি। তবে ১৯৯৯ তে প্রথম বার জিতেছেন।

রিকি পন্টিং ( Ricky Ponting )
রিকি পন্টিং ( Ricky Ponting )

এরপর ২০০৩, ২০০৭ এবং ২০১১ বিশ্বকাপে অধিনায়ক ছিলেন। ২০০৩ এবং ২০০৭ সালে শিরোপা জেতান অধিনায়ক হিসেবে৷ ২০১১ তে সেটি আর হয়ে উঠেনি। দল বাদ পড়ে কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে। সে ম্যাচে সেঞ্চুরি করেও হার এড়ানো যায়নি।

সে ম্যাচের পর ইস্তফা দেন অধিনায়কের। ক্রিকেট ছেড়েছেন তার প্রায় দুই বছর পর। তবে অধিনায়ক হিসেবে দুই বিশ্বকাপ জেতানোর অর্জন এর শ্রেষ্ঠত্ব পরিমাপ করতে অনেক ভারী কিছুই লাগবে।

১৯৯৬ তে রানার্স আপ হয় অজিরা৷ অজিদের সেবারের আসরে বেশ ভালো অবদান ছিলো রিকি পন্টিং এর। সাত ম্যাচে সাত ইনিংসের ৩২.৭১ গড়ে করেন ২২৯ রান। যেখানে কোনো অর্ধশতক না থাকলেও ছিলো ১ টি শতক। সর্বোচ্চ ১০২ রান।

১৯৯৯ বিশ্বকাপে গুরুত্বপূর্ণ ব্যাটসম্যান হয়ে উঠলেও ক্যাপ্টেন কিংবা ভাইস ক্যাপ্টেন কোনোটাই ছিলেন না। সেবার যথেষ্ট ধারাবাহিক ছিলেন তিনি। ১০ ম্যাচে ১০ ইনিংসে প্রায় ৪০ গড়ে করেন ৩৫৪ রান। ফিফটি করেছেন একটি, নেই কোনো সেঞ্চুরি। তবে প্রতিটি ম্যাচেই রান করে গিয়েছেন এই ব্যাটসম্যান।

রিকি পন্টিং ( Ricky Ponting )
রিকি পন্টিং ( Ricky Ponting )

২০০৩ সালে আরো পরিনত হয়েছেন, অধিনায়ক এর দায়িত্ব পেয়েছেন ব্যাটেও বেড়েছে রান। প্রথম বারেই বাজিমাৎ। বড় অবদান রেখেছেন বিশ্বকাপ জয়ে। ফাইনালে হয়েছেন ম্যান অব দ্য ম্যাচ। অজিদের জেতান ব্যাক টু ব্যাক ২য় শিরোপা, নিজেদের ইতিহাসের ৩য় শিরোপা, নিজের ২য় শিরোপা আর অধিনায়ক হিসেবে ১ম শিরপো।

সেবার হয়েছেন অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন। ১১ ম্যাচে ১০ ইনিংসে ৫১.৮৭ গড়ে করেন ৪১৫ রান। যেটি টুর্নামেন্টে ৩য় সর্বোচ্চ রান৷ ফিফটি ১ টি, সেঞ্চুরি ২ টি আর ফাইনালে খেলেন ১২১ বলে ১৪০ রানের মহা বিস্ফোরক এক ইনিংস। টুর্নামেন্টে স্ট্রাইক রেটও ছিলো ৮৭.৯২।

২০০৭ বিশ্বকাপেও হয়েছেন ৩য় সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক। ব্যাট হাতে আগের বারের চাইতে ইনিংস কমেছে তবে ব্যাট হাতে রান, স্ট্রাইক রেট এবং গড় সবই ঠিকই বেড়েছে। ১১ ম্যাচে ৯ ইনিংসে করেন ৫৩৯ রান। গড় ৬৭.৩৭। ফিফটি করেছেন ৪ টি, সেঞ্চুরি করেন ১ টি, সর্বোচ্চ ১১৩।

রিকি পন্টিং ( Ricky Ponting )
রিকি পন্টিং ( Ricky Ponting )

স্ট্রাইক রেট ৯৫.৩৯। অধিনায়ক হিসেবে আবারো পেয়েছেন বিশ্বকাপ জয়ের স্বাদ এবং ক্রিকেটার হিসেবে তৃতীয় বিশ্বকাপ। অধিনায়ক হিসেবে দ্বিতীয় শিরোপা, প্রথম দল হিসেবে অজিদের হ্যাট্রিক শিরোপা। আবারো অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন অজিরা।

২০১১ বিশ্বকাপে অধিকাংশ ক্রিকেটারই ছিলো অনভিজ্ঞ এবং ক্রিকেটে যারা জাতীয় দলের হয়ে খুব বেশী দিন প্রতিনিধিত্ব করেননি। তবে ব্যাট হাতে অধিনায়ক নিজেও ছিলেন অফ ফর্মে। ৬ ইনিংসে ৩৪.৩৩ গড়ে করেছেন ২০৬ রান।

প্রথম ৫ ইনিংসে করেন মাত্র ১০২ রান। কোয়ার্টার ফাইনালে খেলেন ১০৪ রানের ঝকঝকে এক ইনিংস। তবে শেষ রক্ষা হলো না দলের। এরপর বিদায় জানান ক্যাপ্টেন্সিকে।

রিকি পন্টিংয়ের মানেই ব্যাটে রান, অধিনায়ক হিসেবে দল জেতানো, সামনে থেকে নেতৃত্ব দেওয়া। আর বিশ্বকাপ হলে সেটি যেনো একটু বেড়েই যায়। বিশ্বকাপে অজি এই ব্যাটসম্যানের রান ১৭৪৩। যেটি বিশ্বকাপ ইতিহাসে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ। ২ ম্যাচ বেশী খেলে এক নাম্বারে থাকা ভারতীয় কিংবদন্তী শচীন টেন্ডুলকারের রান ২২৭৮ রান।

রিকি পন্টিং ( Ricky Ponting )
রিকি পন্টিং ( Ricky Ponting )

বিশ্বকাপে যৌথভাবে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সেঞ্চুরির মালিকও প্যান্টার৷ দুই ভারতীয় ব্যাটসম্যান শচীন টেন্ডুলকার এবং রোহিত শার্মা ৬ টি করে সেঞ্চুরি করেছেন। লঙ্কান গ্রেট কুমার সাঙ্গাকারা এবং রিকি পন্টিং এর সেঞ্চুরি ৫ টি করে। হাফ সেঞ্চুরির তালিকায় আছেন ৩য় স্থানে৷ হাঁকিয়েছেন ১১ টি অর্ধ শতক৷

ব্যাটসম্যান হিসেবে ৩য় সর্বোচ্চ ১৪৫ টি চার মেরেছেন তিনি৷ ছক্কা হাঁকানোতেও তিনি ৩য়। বিশ্বকাপে তার ব্যাট থেকে এসেছে ৩১ টি ওভার বাউন্ডারি। তার সময়ে এটিই ছিলো সর্বোচ্চ ছয়ের রেকর্ড। বিশ্বকাপে ৪২ ইনিংস খেলে মাত্র ১ টি শূন্য রানের ইনিংস৷ যা অবিশ্বাস্যই বটে।

রিকি পন্টিং ( Ricky Ponting )
রিকি পন্টিং ( Ricky Ponting )

শুধু ব্যাটসম্যান হিসেবে বিশ্বকাপে যতটুকু সফল দল নেতা হিসেবে তার চাইতেও বেশী সফল ছিলে কাপ্তান রিকি পন্টিং৷ নেতৃত্ব দিয়েছেন সর্বোচ্চ ২৯ ম্যাচ। তেমনি সফল ম্যাচ জয়েও। জিতেছেন ২৬ টি ম্যাচ। হেরেছেন মাত্র ২ টি ম্যাচ, আর পরিত্যক্ত একটি। জয়ের হার শতকার ৯৩ ম্যাচ৷ ২০০৩ এবং ২০০৭ বিশ্বকাপে ছিলো শতভাগ জয়ের রেকর্ড। অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন করেছিলেন অজিদের। হারেনি কোনো ম্যাচ৷ যে দুটি হার আছে সে দুটি ক্যারিয়ারের শেষ বিশ্বকাপে।

অধিনায়ক ব্যাটসম্যান হিসেবে সর্বোচ্চ রানও তার দখলে। অধিনায়ক হিসেবে করেন ২৫ ইনিংসে ৫২.৭২ গড়ে ১১৬০ রান। স্ট্রাইক রেট ৮৭.৮১। সেঞ্চুরি ৪ টি, যা অধিনায়ক হিসেবে বিশ্বকাপ ইতিহাসে সর্বোচ্চ। দ্বিতীয় সর্বোচ্চ ৫ টি ফিফটি রয়েছে। অধিনায়ক হিসেবে বিশ্বকাপে ৫০+ ইনিংস আছে ৯ টি, যেটি সর্বোচ্চ।

ফিল্ডার হিসেবে ক্যারিয়ার জুড়ে যে খ্যাতি ছিলো তা বিশ্বকাপেও বজায় ছিলো। বিশ্বকাপ ইতিহাসে ফিল্ডার হিসেবে সর্বোচ্চ ক্যাচের মালিক তিনি। সর্বোচ্চ ২৮ টি ক্যাচ লুফেছেন বিশ্বকাপে। অধিনায়ক হিসেবে নিয়েছেন ২১ টি ক্যাচ, অধিনায়ক হিসেবেও তা সর্বোচ্চ।

এত সব রেকর্ড আর অর্জনের পর বলাই যায় বিশ্বকাপ এবং প্যান্টার একের অপরের পরিপূরক।

 

আরও পড়ুন:

 

মন্তব্য করুন