মাইকেল বেভানঃ দ্য ফাইটার

মাইকেল বেভান, ৯০ এর দশকের ক্রিকেট প্রেমীদের কাছে এক সুপরিচিত নাম। অস্ট্রেলিয়াকে অসংখ্য জয় এনে দিয়েছেন এ বেভান। নিজের আন্তর্জাতিক ক্রিকেটীয় ক্যারিয়ারে বেভানের ব্যাটিং গড় ছিলো ৫০ এরও বেশি। নিজের দিনে বেভান ছিলেন আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় ফিনিশার।

১৯৭০ সালের ৮ মে অস্ট্রেলিয়ান ক্যাপিটাল টেরিটরির বেলকনেনে জন্ম নেন মাইকেল বেভান। ১৯৯৪ সালে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয় বাঁহাতি এই ব্যাটসম্যানের, যিনি কিনা বাঁহাতে লেগস্পিন (চায়নাম্যান) করতে পারতেন।

টেস্ট ক্রিকেটে অতটা নাম না করতে পারলেও (খেলেছেন ১৮ টি টেস্ট) ওয়ানডে ক্রিকেটে বড় এক নাম ছিলেন মাইকেল বেভান। ম্যাচ শেষ করে আসার ব্যাপারে অবিশ্বাস্য ধারাবাহিকতার কারণে মাইকেল বেভানের সতীর্থরা তার নাম দিয়েছিলেন ‘দ্য টার্মিনেটর’।

মাইকেল বেভানঃ দ্য ফাইটার
নিজের প্রথম ওয়ানডে সেঞ্চুরি উদযাপন করছেন বেভান

[ মাইকেল বেভানঃ দ্য ফাইটার ]

১৯৯৪ সালের ১৪ ই এপ্রিল । শারজায় চলছে অস্ট্রেলেশিয়া কাপ । প্রতিপক্ষ শ্রীলংকার বিরুদ্ধে অস্ট্রেলিয়ার হয়ে ওয়ানডে ক্রিকেট দলে অভিষেক হল ২৪ বছর বয়সী এক আত্মপ্রত্যয়ী খেলোয়াড়ের । জার্সি নম্বর ১২ ,মাথায় ক্যাপ এর নম্বর ১১৬ ।

এর অল্প কয়েকদিন পরেই একই বছর ২৮ শে সেপ্টেম্বর পাকিস্তানের বিরুদ্ধে টেস্ট অভিষেক হল তার । এবার মাথায় ক্যাপ এর নম্বর ৩৬০ । ৫ ফুট ১১ ইঞ্চি উচ্চতার এই খেলোয়াড় টি কে নির্বাচকরা ধীরে ধীরে গড়ে তুলতে চাইছিলেন আসন্ন ১৯৯৬ ক্রিকেট বিশ্বকাপের জন্য ।

মাইকেল বেভানঃ দ্য ফাইটার
১৯৯৬ বিশ্বকাপে মাইকেল বেভান

তারা যে ধীরে ধীরে কাকে গড়ে তুলেছিলেন তা বোঝা গেছে দলের কঠিন সময়ে । মাত্র দশ বছরের সংক্ষিপ্ত ক্যারিয়ার এর পরিসংখ্যান তাকে বুঝবার জন্য কোন ভাবেই যথেষ্ট নয়। তার নাম মাইকেল বেভান ।

শুধু অস্ট্রেলিয়ারই নয়, ক্রিকেট ইতিহাসের অন্যতম সেরা ওয়ানডে স্পেশালিস্ট বেভান। ১৩ বছরের লম্বা ক্যারিয়ারে অসংখ্যবার লেজের দিকের ব্যাটসম্যানদের সঙ্গে ব্যাট করে দলকে জিতিয়ে মাঠ ছেড়েছেন বেভান।

২৩২ ম্যাচের ওয়ানডে ক্যারিয়ারে ৫৩.৫৮ গড়ে রান করেছেন ৬৯১২। ৪৬ ফিফটি ও ৬ সেঞ্চুরির মালিক এই মিডল অর্ডার ব্যাটসম্যান নট আউট থেকেছেন ৬৭ টি ওয়ানডে ইনিংসে। গড়টা তাই ঈর্ষনীয়, ৫৩.৫৮।

২০০৭ সালে মাইকেল বেভান যখন আন্তর্জাতিক ক্রিকেট থেকে অবসর নেন তখন ওয়ানডেতে ৫০ এর বেশি ব্যাটিং গড় ছিল কেবল তারই। ১৯৯৯ ও ২০০৩ বিশ্বকাপজয়ী অস্ট্রেলিয়া দলের সদস্য ছিলেন। ১৯৯৬ সালে অস্ট্রেলিয়া যে ফাইনাল খেলেছিল তাতে বড় অবদান ছিল মাইকেল বেভানের।

মাইকেল বেভানঃ দ্য ফাইটার
১৯৯৯ বিশ্বকাপে মাইকেল বেভান

১৯৯৬ ক্রিকেট বিশ্বকাপ মঞ্চের ফাইনালে অস্ট্রেলিয়া শ্রীলংকার কাছে পরাজিত হয় । সেই রানার আপ দলের নিয়মিত সদস্য ছিলেন মাইকেল বেভান । মিডল অর্ডার এর নিচের দিকে ব্যাট হাতে নামতেন তিনি । দল যখন ঘোর অমানিশার অন্ধকারে , তখনই মাইকেল বেভান ব্যাট হাতে কাণ্ডারির ভূমিকায় ।

আর তাই তো মাইকেল বেভান যতক্ষণ ব্যাট হাতে থাকতেন , ততক্ষণ কেউই টি. ভি. সেট এর সামনে থেকে উঠতেন না । যখন উঠতেন , তখন বেভান ব্যাট হাতে দলের জয় নিশ্চিত করে  ফেলেছেন।

মোহালিতে সেমিফাইনালে ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে ৫ রানে জেতা ম্যাচে স্টুয়ার্ট ল’র সঙ্গে দারুণ এক জুটি গড়েছিলেন বেভু (বেভানের ডাকনাম)। কার্টলি অ্যামব্রোস, ইয়ান বিশপদের বোলিং তোপে ১৫ রানেই ৪ উইকেট হারিয়েছিল অস্ট্রেলিয়া। সেখান থেকে স্টুয়ার্ট লয়ের সঙ্গে ১৩৮ রানের জুটি গড়ে দলকে ২০০ পার করতে সাহায্য করেছিলেন বেভান। শেন ওয়ার্নের স্পিন জাদুতে সেই ম্যাচ জিতে ফাইনালে উঠেছিল অস্ট্রেলিয়া। ফাইনালে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে হারলেও অপরাজিত ৩৬ রানের ইনিংস খেলেছিলেন বেভান।

ক্যারিয়ারে নট আউট থেকে অস্ট্রেলিয়াকে জিতিয়েছেন বেশ কিছু ম্যাচ। ১৯৯৪ সালে লাহোরে পাকিস্তানের বিপক্ষে ৪২ বলে ৫৩*, ১৯৯৮ সালে দিল্লিতে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে ২৫ বলে ৩৩*, শারজায় ভারতের বিপক্ষে ১০৩ বলে ১০১*, ১৯৯৯ সালে পার্থে শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ৬৫ বলে ৭২*, সিডনিতে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ৭৪ বলে ৬৯*, ২০০১ সালে মারগাওয়ে ভারতের বিপক্ষে ১১৩ বলে ৮৭*, ২০০২ সালে মেলবোর্নে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে ৯৫ বলে ১০২*, ২০০৩ সালে পোর্ট এলিজাবেথে ইংল্যান্ডের বিপক্ষে ১২৬ বলে ৭৪*- এমন সব ইনিংস মাইকেল বেভানের ক্যারিয়ারের বিজ্ঞাপন হয়ে আছে।

মাইকেল বেভানঃ দ্য ফাইটার
২০০৩ বিশ্বকাপে বেভান

আরও একটি অনবদ্য কীর্তি আছে তার । ওয়ানডেতে ৩০ কিংবা তার বেশি ম্যাচ খেলা মাত্র দুই জন ব্যাটসম্যান আছেন , যাদের ব্যাটিং গড় কখনই ৪০ এর নিচে নামেনি । দুইজনের একজন তিনি, আর একজন তারই সতীর্থ মাইক হাসি ।

লেখার শুরুতেই বলেছিলাম , ক্যারিয়ার এর পরিসংখ্যান দিয়ে বেভান কে বোঝা যাবে না । বেভান কে বুঝতে হলে যেতে হবে তাসমানিয়া কিংবা নিউ সাউথ ওয়েলস এর  ক্রিকেট একাডেমী গুলোতে যেখানে আজও ক্ষুদে ক্রিকেটাররা একটা অসম্ভব অবস্থান থেকে হারা ম্যাচ জিতে গেলে উল্লাসে বলে – “ ইয়েস, উই হ্যাভ ডান এ বেভান। ডন ব্র্যাডম্যান এর দেশের একজন ক্রিকেটারের জন্য এর চেয়ে বড় প্রাপ্তি আর কীইবা হতে পারে ।

মন্তব্য করুন