বৃষ্টি রঙের ক্যানভাসে লাল-সবুজময় রংতুলির আঁচড়

বৃষ্টি রঙের ক্যানভাসে লাল-সবুজময় রংতুলির আঁচড় : বৃষ্টিকে বলা হয়ে থাকে ক্রিকেটের সবচেয়ে বড় শত্রু। কারণ, বৃষ্টি হলেই শঙ্কা দেখা দেয় একটি ক্রিকেট ম্যাচ পন্ড হবার। আবার, কখনো ক্রিকেট খেলার মাঝে বৃষ্টি হঠাৎ করে বিঘ্ন ঘটালে যেকোনো দলের ম্যাচ জেতার মোমেন্টাম পরিবর্তিত হয়। ক্রিকেট ম্যাচে বৃষ্টি এলেই দলগুলোকে নতুন ভিন্ন পরিকল্পনা করে আবারো বৃষ্টি পরবর্তী সময়ে মাঠে নামতে হয়।

 

বৃষ্টি রঙের ক্যানভাসে লাল-সবুজময় রংতুলির আঁচড়
১৯৯৭ আইসিসি ট্রফি জেতার পর দেশে ফিরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছ থেকে সংবর্ধনা নিচ্ছেন তৎকালীন বাংলাদেশ দলের অধিনায়ক আকরাম খান

 

তবে, বৃষ্টিবিঘ্নিত ম্যাচগুলোর সাথে বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের  কিছু সুখস্মৃতি রয়েছে। এই বৃষ্টিবিঘ্নিত ম্যাচগুলোর মধ্যে বাংলাদেশ দলের বেশকিছু ঐতিহাসিক জয় রয়েছে।

[ বৃষ্টি রঙের ক্যানভাসে লাল-সবুজময় রংতুলির আঁচড় ]

১৯৯৭ সাল, বাংলাদেশে তখন সবচেয়ে জনপ্রিয় খেলা ছিলো ফুটবল। সে সময় দেশের ক্রিকেটে ঘটে এক যুগান্তকারী বিপ্লব। যার ফলশ্রুতিতে, পরবর্তীতে একটি ক্রিকেট পাগল জাতিতে পরিণত হয় বাংলাদেশ। ক্রিকেটে তৎকালীন সময়ে বাংলাদেশের জন্য সবচেয়ে বড় আসর ছিলো আইসিসি ট্রফি।

এর আগে, ১৯৮২ এবং ১৯৯০ আইসিসি ট্রফি জয়ের খুব কাছাকাছি আসে বাংলাদেশ, তবে সে দু’বার পরাজয়ের আক্ষেপে পুড়তে হয় বাংলাদেশকে। অবশেষে ১৯৯৭ সালে, স্বপ্নপূরণ হয় বাংলাদেশের, আকরাম খান নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ দল চ্যাম্পিয়ন হয় সেবারের আইসিসি ট্রফির।

এ আসরের মাধ্যমেই বাংলাদেশ বিশ্বকাপ খেলার যোগ্যতা অর্জন করে এবং নিজদের ক্রিকেট ইতিহাসের প্রথম কোনো আন্তর্জাতিক শিরোপা অর্জন করে। ১৯৯৭ সালের আইসিসি ট্রফির দিনটি ছিলো বৃষ্টিময়। সেই বৃষ্টিবিঘ্নিত ম্যাচে বাংলাদেশ স্নায়ুচাপ নিয়ন্ত্রণে রেখে অবশেষে ইতিহাস রচনা করতে সমর্থ হয়।

সে ম্যাচে, টস জিতে কেনিয়াকে ব্যাট করতে পাঠায় বাংলাদেশ। ইনিংসের শুরুতেই বাংলাদেশের বোলারদের বোলিং তোপে ব্যাটিং বিপর্যয়ে পড়ে টুর্নামেন্টের হট ফেভারিট কেনিয়া। তবে, তৎকালীন কেনিয়ার ব্যাটার স্টিভ টিকোলোর ১৫২ বলে ১৫৭ রানের অনবদ্য ইনিংসে ২৪১ রানের লড়াকু পুঁজি পায় বাংলাদেশ। কেনিয়ার বোলিং আক্রমণের অভিজ্ঞতার কথা মাথায় রেখে সবাই ভেবেই বসেছিলেন , হয়ত আবারো আইসিসি ট্রফি হাতছাড়া হবে বাংলাদেশের।

কেনিয়ার ব্যাটিংয়ের পর বাংলাদেশের ইনিংস শুরুর আগেই নামে বৃষ্টি। এরপর, ম্যাচ গড়ায় রিজার্ভ ডেতে। পরবর্তীতে, ম্যাচটি জেতার জন্য ডি এল মেথডে বাংলাদেশের জেতার জন্য লক্ষবেধে দেয়া হয় ২৫ ওভারে ১৬৬ রানের। বাংলাদেশের ইনিংসেও রান চেজের গতিতে সমান স্রোতেই এগিয়ে যেতে থাকে বাংলাদেশ। এরপরে, শেষ ওভারে খালেদ মাসুদ পাইলটের বীরত্বসূচক ছক্কা এবং বাংলাদেশের আইসিসি ট্রফি জয় সবমিলিয়ে এক ঐতিহাসিক দিন সে বৃষ্টিবিঘ্নিত ম্যাচটি।

২০০৭ ওয়ানডে বিশ্বকাপ, সেবার প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে শক্তিশালী ভারতকে হারায় বাংলাদেশ। এরপরে, গ্রুপ পর্বের শেষ ম্যাচে বারমুডাকে হারালেই নিজেদের ক্রিকেট ইতিহাসে প্রথমবারের মতো সুপার এইটে উঠতো বাংলাদেশ। হয়েছিলও তাই। সে ম্যাচেও, বৃষ্টি হানা দেয়।

 

বৃষ্টি রঙের ক্যনভাসে লাল-সবুজময় রংতুলির আঁচর
বারমুডার বিপক্ষে ২০০৭ বিশ্বকাপে বাংলাদেশ ; Image Source: Getty Images

 

ফলে, ৫০ ওভারের জায়গায় ম্যাচ গিয়ে ২১ ওভারে ৯৪ রান করে বারমুডা। এরপর, ৯৫ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে ৭ উইকেটে জিতে প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপের সুপার এইটে খেলার যোগ্যতা অর্জন করে বাংলাদেশ।

২০১২ এশিয়া কাপ, ঘরের মাটিতে সেবারের এশিয়া কাপ আয়োজন করে বাংলাদেশ। সে টুর্না,মেন্টে নিজেদের প্রথম ম্যাচে পাকিস্তানের কাছে অল্প ব্যবধানে হেরে গেলেও, টুর্নামেন্টের দ্বিতীয় ম্যাচে ভারতকে হারিয়ে চমক দেখায় মুশফিকুর রহিম নেতৃত্বাধীন বাংলাদেশ দল। এরপর, নিজদের তৃতীয় ম্যাচে, বাংলাদেশের প্রতিপক্ষ ছিলো শ্রীলঙ্কা।

সে ম্যাচে টস জিতে বোলিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ। শ্রীলঙ্কা নির্ধারিত ৫০ ওভারে ২৩২ রান সংগ্রহ করে। এরপরে, সে ম্যাচেও বৃষ্টি বাধা দেয়। বৃষ্টি থামলে ডি/এল মেথডে ৪০ ওভারে বাংলাদেশের লক্ষ্য দাঁড়ায় ২১২ রান।

২১২ রানের লক্ষ্যে ব্যাট করতে নেমে উইকেটের এক প্রান্ত থেকে ধুম ধারাক্কা ব্যাটিং শুরু করেন ড্যাশিং ওপেনার তামিম ইকবাল। তবে, তামিমের ব্যাটে রানের চাকা সচল থাকলেও উইকেটের অপর প্রান্ত থেকে হতে থাকে একের পর এক উইকেটের পতন।

এরপর, তামিমের সাথে একটি পার্টনারশিপ করে দলকে খাদের কিনারা থেকে টেনে তুলে ধরেন, তৎকালীন ক্রিকেটের সব ফরমেটেই বিশ্বের সেরা অলরাউন্ডার থাকা, সাকিব আল হাসান।

তামিমের সাথে সাকিব গড়েন ৭৬ রানের এক জুটি। শেষের দিকে, নাসির হোসেন এবং মাহমুদউল্লাহ রিয়াদের দুর্দান্ত ফিনিশিংয়ে ৫ উইকেটের জয় পায় টিম টাইগার্স।

 

বৃষ্টি রঙের ক্যনভাসে লাল-সবুজময় রংতুলির আঁচর
শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে জয়ের পর বাংলাদেশ

 

বল হাতে ২ উইকেট এবং ব্যাট হাতে ৪৬ বলে কুইকফায়ার ৫৬ রানের ইনিংস খেলার সুবাদে ম্যাচ সেরা নির্বাচিত হন সাকিব আল হাসান। সে ম্যাচ জিতে নিজেদের ক্রিকেট ইতিহাসে প্রথমবারের মতো এশিয়া কাপের ফাইনালে উঠে বাংলাদেশ।

২০১৮ সাল, আয়ারল্যান্ডের মাটিতে উইন্ডিজ এবং বাংলাদেশকে নিয়ে ত্রিদেশীয় সিরিজ। এ সিরিজের আগে, টেস্ট খেলুড়ে দেশের অংশগ্রহণে কোনো আন্তর্জাতিক ট্রফির স্বাদ পায়নি বাংলাদেশ। সে ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালে উঠে বাংলাদেশ এবং উইন্ডিজ।

সে ফাইনাল ম্যাচেও বাধা দেয় বৃষ্টি। সে ম্যাচে, টস জিতে বোলিংয়ের সিদ্ধান্ত নেয় বাংলাদেশ। ম্যাচের ২৫ তম ওভারে, উইন্ডিজের দলীয় স্কোর যখন ১ উইকেটে ১৫২, ঠিক তখনই ম্যাচে হানা দেয় বৃষ্টি এবং এর পরে ডি/এল মেথডে বাংলাদেশের লক্ষ্য দাঁড়ায় ২৪ ওভারে ২১০।

 

বৃষ্টি রঙের ক্যনভাসে লাল-সবুজময় রংতুলির আঁচর
ত্রিদেশীয় সিরিজ জয়ের পর বাংলাদেশ

 

সে ম্যাচে, মোসাদ্দেক হোসেন সৈকতের আগ্রাসী ফিফটিতে জয়লাভ করে বাংলাদেশ এবং প্রথম কোনো টেস্ট খেলুড়ে দেশ সম্বলিত টুর্নামেন্টে জয়লাভ করে বাংলাদেশ।

আরও পড়ুন:

“বৃষ্টি রঙের ক্যানভাসে লাল-সবুজময় রংতুলির আঁচড়”-এ 13-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন