বাংলাদেশের প্রথম বিশ্বসেরা ক্রিকেটার: মোহাম্মদ রফিক

বাংলাদেশের প্রথম বিশ্বসেরা ক্রিকেটার, মোহাম্মদ রফিক, নামটি আমাদের মনে এন দেয় নস্টালজিয়ার সেই রোমাঞ্চকর অনুভূতি। বাংলাদেশের এক অন্যতম কিংবদন্তী ক্রিকেটার হলেন মোহাম্মদ রফিক। মোহাম্মদ রফিক শুধু  বল হাতে নয়, বরং ব্যাট হাতেও বিপদে ধরেছেন দলের হাল। মোহাম্মদ রফিক, নিজের প্রত্যেকটি রান এবং উইকেটের জন্য অক্লান্ত পরিশ্রম করতেন।

তিনি প্রথম বাংলাদেশী ক্রিকেটার যিনি একদিনের আন্তর্জাতিকে ম্যাচসেরা নির্বাচিত হয়েছিলেন। তিনি প্রথম বাংলাদেশী ক্রিকেটার যিনি টেস্ট ম্যাচে ১০০ উইকেট লাভ করেছিলেন। তিনি মাঝে মাঝে ব্যাট হাতে তার দলের জন্য ভূমিকা রাখতেন।
যখন বাংলাদেশ দলের দ্রুত রানের প্রয়োজন হত, তখন তাকে ওপেনার হিসেবে পাঠানো হত। ক্রিকেট বিশ্বে অবদানের জন্য রফিককে বিভিন্নভাবে সম্মানিত করা হয়েছে, ২০০৫ সালে অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে সুপার সিরিজে তিনি বিশ্ব একাদশের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন এবং ২০০৭ সালে আফ্রিকা একাদশের বিপক্ষে প্রদর্শনী সিরিজে তিনি এশিয়া একাদশের অন্তর্ভুক্ত ছিলেন।

বাংলাদেশের প্রথম বিশ্বসেরা ক্রিকেটার: মোহাম্মদ রফিক

২০২০-২১ রোড সেফটি ওয়ার্ল্ড সিরিজে তিনি বাংলাদেশ লেজেন্ডস ক্রিকেট দলের অধিনায়ক ছিলেন। বুড়িগঙ্গা নদীর তীর ঘেঁষে জিনজিরা বস্তিতে সারাদিন ক্রিকেট খেলে আর মাছ ধরে সময় কাটানো মোহাম্মদ রফিক ছোটবেলায় দেখেছিলেন চরম দারিদ্রের চেহারা। স্বাধীনতার সময় বাবাকে হারিয়েছেন, বেড়ে ওঠা মা-দাদীর সাথে যৌথ পরিবারে। দারিদ্র্যের কারণে মোহাম্মদ রফিক খুব বেশী পড়ালেখা করতে পারেনি।
সেই দারিদ্রতাকে একদিন জয় করেছন রফিক, জয় করেছেন ক্রিকেট বিশ্বকেও। অসাধারন সরলতা ও মানবিক গুণের অধিকারী বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের সাবেক এই খেলোয়ারকে সারাদেশের ক্রিকেটপ্রেমিরা আজো বিনাশর্তে পছন্দের তালিকার শীর্ষে রাখেন। ১৯৯৭ সালে আইসিসি ট্রফিতে চ্যাম্পিয়ন হয় বাংলাদেশ, সাথে নিশ্চিত করে প্রথমবারের মত বিশ্বকাপের টিকেট।
আইসিসি চ্যাম্পিয়ন ট্রফি জিতে আসার পর তৎকালিন তারকা ক্রিকেটার মোহাম্মদ রফিককে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জিজ্ঞেস করলেন ‘তুমি কি চাও?’ রফিক তখন ইচ্ছে করলেই নিজের কথা চিন্তা করতে পারতেন। কিন্তু তিনি ভাবলেন নিজের এলাকার মানুষের কথা। প্রধানমন্ত্রীকে বললেন ‘বুড়িগঙ্গার ওইদিকে বাবু বাজারে একটা ব্রিজ হলে মানুষের যাতায়াতে অনেক সুবিধা হত’।
এ ঘটনার কয়দিন পরেই ওই জায়গায় প্রধানমন্ত্রী দ্রুত একটি ব্রিজ নির্মান করে দেন। আইসিসি ট্রফি জেতার সুবাধে প্রধানমন্ত্রীর কাছ থেকে দলের সব সদস্য জমি এবং একটি করে গাড়ি উপহার পেয়েছিলেন। কিন্তু রফিক নিজের জমিটা এলাকার স্কুলের জন্য দিয়ে দিলেন এবং গাড়িটা বিক্রি করে সেই স্কুলে ঘর তৈরি করে দিয়েছিলেন। এই সম্পর্কে রফিককে এক সাংবাদিক জিজ্ঞেস করলে তিনি বলেছিলেন; ‘আমি লেখাপড়া শিখতে পারিনি।
তাই আমি উদ্যোগ নিলাম আমার মহল্লার সন্তানরা যেন পড়াশুনা শিখতে পারে!’ ১৯৮৫ সালে বাংলাদেশের ২য় বিভাগ খেলায় বাঁ-হাতি সিমার হিসাবে তিনি খেলোয়াড়ী জীবন শুরু করেছিলেন। ১৯৮৮ সালে, তিনি বাংলাদেশ বিমান ক্রিকেট দলে যোগদান করেন।
তারপর পাকিস্তানি অলরাউন্ডার ওয়াসিম হায়দারের দ্বারা প্রভাবিত হয়ে স্লো অর্থোডক্স স্পিন বোলার হিসাবে তার রূপান্তর ঘটে। ১৯৯৪ সালের ডিসেম্বরে তিনি বাংলাদেশ ক্রিকেট দলের হয়ে ২য় সার্ক ক্রিকেট টুর্নামেন্টে অংশ নেন, সেখানে ভারতের এ দলের বিপক্ষে তিনি ২৫ রানে ৩ উইকেট নিয়ে বাংলাদেশের জয়ে অবদান রাখেন।
মোহাম্মদ রফিকঃ বাংলাদেশের প্রথম বিশ্বসেরা ক্রিকেটার
অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে টেস্টে ব্যাট করছেন রফিক

 

মোহাম্মদ রফিকঃ বাংলাদেশের প্রথম বিশ্বসেরা ক্রিকেটার

তিনি ১৯৯৭ সালের আইসিসি ট্রফি বিজয়ী বাংলাদেশ দলের একজন সদস্য ছিলেন। সব মিলিয়ে তিনি ৯ ম্যাচে ১০.৬৮ গড়ে ১৯ উইকেট নিয়েছিলেন। তার সেরা ২৫ রানে ৪ উইকেট এসেছিল সেমি-ফাইনালে স্কটল্যান্ডের বিপক্ষে। তার স্পিন সহযোগী এনামুল হক মনি’র সাথে তিনি টুর্নামেন্টে ১২ উইকেট নিয়েছিলেন। এছাড়াও কেনিয়ার বিরুদ্ধে ফাইনালে তিনি ১৫ বলে মূল্যবান ২৬ রান করেছিলেন।
২০০৮ সালের আগস্টে ইন্ডিয়ান ক্রিকেট লীগ (আইসিএল) এ নাম লেখানোর কারণে, বাংলাদেশ ক্রিকেট বোর্ড কর্তৃক রফিক ১৩ জন পেশাদার খেলোয়াড়দের সাথে দশ বছরের জন্য সকল ধরনের ক্রিকেটে নিষিদ্ধ হয়েছিলেন, কিন্তু এক বছর পরে আইসিএল এর সাথে তিনি সম্পর্ক ত্যাগ করেন এবং নিষেধাজ্ঞা ভেঙ্গে পুনরায় ফিরে আসেন। ২০০৩: বাংলাদেশের ও নিজের অভিষেক টেস্ট খেলার পরপরই অবৈধ বোলিং অ্যাকশনের অভিযোগে সাময়িকভাবে নিষিদ্ধ হন।
মোহাম্মদ রফিকঃ বাংলাদেশের প্রথম বিশ্বসেরা ক্রিকেটার
২০০৭ বিশ্বকাপে রফিক

 

ফেরেন দু’বছর পর। পরের বছর চট্টগ্রাম টেস্টে দক্ষিণ আফ্রিকার সাথে করেন ক্যারিয়ার সেরা বোলিং। ৭৭ রানে নেন ৬ উইকেট। ২০০৩: বাংলাদেশকে কাঁদানো সেই টেস্টে ছিলেন স্পিরিট অফ ক্রিকেটের প্রতীক। জয় থেকে ৪৮ রান দূরে থাকা পাকিস্তানের হাতে ছিলো মাত্র ২ উইকেট। রফিক বল করার সময় ক্রিজ ছেড়ে অনেকটা এগিয়ে গিয়েছিলেন নন-স্ট্রাইক প্রান্তে থাকা উমর গুল।
মোহাম্মদ রফিকঃ বাংলাদেশের প্রথম বিশ্বসেরা ক্রিকেটার
২০০৩ বিশ্বকাপে রফিক

 

মানকাডিং আউট করার সুযোগ থাকলেও রফিক তা না করে ফিরে আসতে বলেন গুলকে! বেঁচে যান গুল, সাথে পাকিস্তানও। ১ উইকেটে হারা সেই ম্যাচে নিয়েছিলেন ৭ উইকেট। ২০০৪: আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে একমাত্র সেঞ্চুরি। ওয়েস্ট ইন্ডিজের বিপক্ষে করা সবেধন নীলমণি সেই সেঞ্চুরির দারুণ ভূমিকা ছিলো হার না মানা সেই ড্র-তে। ২০০৫: জিম্বাবুয়ের সাথে অভিষেক টেস্ট জয়ে ছিলেন উজ্জ্বল তারা হয়ে। প্রথম ইনিংসে ৬৯ রানের পর দ্বিতীয় ইনিংসে অপরাজিত ছিলেন ১৪ রানে।
বল হাতে প্রথম ইনিংসে নিয়েছিলেন ৫ উইকেট। ২০০৬: ক্যারিয়ার সেরা ম্যাচ ফিগার অস্ট্রেলিয়ার বিপক্ষে ফতুল্লার সেই টেস্টে। প্রথম ইনিংসে ৫ উইকেটের পর দ্বিতীয় ইনিংসে পেয়েছিলেন ৪ উইকেট। দুই ইনিংস মিলিয়ে ফিগার ছিলো ৯/১৬০। ৩০৭ রান তাড়া করতে নেমে ৩ উইকেটের কষ্টার্জিত জয় পায় অজিরা।
পরের টেস্টে চট্টগ্রামে রীতিমত তুলোধুনো করেছিলেন ওয়ার্ন, ম্যাকগিলদের। ৫৩ বলে ২ চার আর ৬ ছক্কায় করেছিলেন ৬৫! সেসময় টেস্টে এরকম মারমুখো ব্যাটিং করার ক্ষমতা খুব কম খেলোয়াড়ের ছিলো! ২০০৭: বিশ্বকাপে ভারতের সাথে সেই ঐতিহাসিক জয়ে ১০ ওভারে মাত্র ৩৮ রান দিয়ে শিকার করেছিলেন রাহুল দ্রাবিড়, মহেন্দ্র সিং ধোনি আর সৌরভ গাঙ্গুলীকে। টুর্নামেন্টে নিয়েছিলেন ৮ উইকেট।
বিশ্বকাপ শেষেই নেন অবসর। ২০০৮: শেষ টেস্ট, প্রতিপক্ষ দক্ষিণ আফ্রিকা। প্রথম বাংলাদেশি হিসেবে টেস্টে ১০০ উইকেটের মাইলফলক স্পর্শ। দুই ফরম্যাটেই ১০০০ রান ও ১০০ উইকেট ডাবল করা প্রথম বাংলাদেশি মোহাম্মদ রফিকের। অর্জনের ঝুলিতে আছে আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ২২৬৩ রান ও ২২৬ উইকেট। টেস্টে ৭ আর ওয়ানডেতে ১ বার ৫ উইকেটের পাশাপাশি টেস্টে সেঞ্চুরিও আছে ১টি। ২০০৭ সালে এশিয়া একাদশের হয়ে খেলার সম্মান পেয়েছিলেন এই বাঁহাতি অলরাউন্ডার।

“বাংলাদেশের প্রথম বিশ্বসেরা ক্রিকেটার: মোহাম্মদ রফিক”-এ 1-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন