প্রতিভাবান নাজমুল হোসেনের আক্ষেপ হয়ে যাওয়া !

প্রতিভাবান নাজমুল হোসেনের আক্ষেপ হয়ে যাওয়া :  ইনজুরি’ এই শব্দটা সব সময়ই একজন পেশাদার খেলোয়াড়ের জন্য অমঙ্গলই। দিনের পর দিন, সপ্তাহের পর সপ্তাহ কিংবা মাসের পর পর মাস কেটে যায় মাঠের বাহিরে। আবার কারো কারো ক্ষেত্রে শেষ করে দেয় ক্যারিয়ার। তাইতো যে কোনো স্পোর্টসে প্রতিপক্ষের খেলোয়াড়ও প্রত্যাশা করে না কারো ইনজুরি হোক। আবার কখনো কখনো নিজ দলের কারো ইনজুরি কারো কারো জন্য আশীর্বাদ হয়ে আসে!

২০০৪-০৫ কিংবা এর পরবর্তী সময়ে, বাংলাদেশের খেলা হলে একাদশে পেসার থাকতেন একজন কিংবা সর্বোচ্চ দুজন। এর মাঝে বোলিং বৈচিত্র আর পারফরম্যান্সে একজন ছিলেন অটোচয়েজ। তিনি হচ্ছেন মাশরাফী বিন মোর্ত্তজা। একজন পেসার খেলালেও সেটা মাশরাফীই হতেন। একাধিক পেসার হলে তাপস কিংবা রাসেলরা আসতেন। তবে ক্ষেত্র বিশেষে সেটা বিদেশের মাটিতে গেলে তিন জনে উত্তীর্ণ হতো।

প্রতিভাবান নাজমুলের
নাজমুল হোসেন

প্রথম ছিলো মাশরাফি তাপস জুটি। এরপর আসেন শাহাদাত – রাসেলরা। তখন ওয়ানডে একাদশে দুই পেসার থাকলে মাশরাফির সাথে রাসেল এর নামা হতো। মাশরাফি আর রাসেলের প্রশংসনীয় বোলিং পারফর্ম্যান্সের কারণে অন্য কারো জন্য দলে ঢুকা ছিলো প্রায় অসাধ্য ব্যাপার। রফিক, মাশরাফি, রাজ্জাক, রাসেল, শাহাদাত, তাপসরা ছিলেন বোলিং ডিপার্টমেন্টর মূল অস্ত্র। এই দলটাতে অন্য কোনো পেসার ঢুকতে পারাটা ছিলো স্বপ্নের মতো ব্যাপার।

মাঝে মাঝে মাশরাফি রাসেল শাহাদাতরা ইনজুরিতে পড়তেন বিশেষ করে অতিরিক্ত ইনজুরি প্রবণ ছিলেন বোলিং এট্যাকের কাণ্ডারি মাশরাফি।তখন আপদকালীন সময়ে ডাক পড়তো এক অমিত সম্ভাবনা নিয়ে ক্যারিয়ার শুরু করা এক পেসারের। শুধু এই ত্রয়ীর ব্যাক আপই নয়, সময়ে সময়ে ব্যাক আপ হিসেবেই জায়গা পেয়েছিলেন অনেকবার।

কখনোই পারফরম্যান্স এতোটাও খারাপ ছিলো না যতটা অবজ্ঞা দেখেছিলেন। তবে এক্ষেত্রে তার বার বার ইনজুরিতে পড়াও অনেকটা দায়ী ছিলো। যার কারণে একটি বিশ্বকাপ ব্যতীত বড় কোনো আসরে প্রতিনিধিত্ব করা হয়নি বাংলাদেশের। তবে ভূমিকা রেখেছিলেন অনেক গুলো অবিস্মরণীয় জয়ে।

ভারতের বিপক্ষে প্রথম জয়েও তার ইকনোমিক বোলিং ভারতকে চেপে ধরেছিলেন, কার্ডিফে অজি বদেও তার ভূমিকা ছিলো অনেক। অজিদের বিপক্ষে মাশরাফি অজিদের রানের চাকাটাকে ব্লাস্ট করে দিয়েছেন যার দরুন এতোটা এগোতে পারেনি অজি ব্যাটাররা। আর নাজমুল নিয়েছিলেন ওপেনার ম্যাথু হেইডেনের মহামূল্যবান উইকেট। ২০১২ এশিয়া কাপে একাই গুড়িয়ে দেন লংকান ব্যাটিং লাইন আপ, যেখানে ছিলো জয়াবর্ধানে, দিলশান আর সাঙ্গাকারার উইকেট।

নাজমুল (Najmul)
নাজমুল

২০০৬ সালেও শ্রীলংকার বিপক্ষে প্রথম জয়ে কিংবা ২০০৯ সালে শ্রীলংকার বিপক্ষে ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালে শ্রীলংকার ৬ রানে ৫ উইকেট ফেলে তাদের চেপে রাখা কিংবা পরবর্তী সিরিজে জিম্বাবুয়েকে ৪৪ রানে অল আউটের ম্যাচে দ্রুত উইকেট তুলে নেওয়া, সব মিলিয়ে বেশ কিছু জয়ে রেখেছিলেন গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা। ইনজুরিতে পড়া অধিনায়ক মাশরাফির অনুপস্থিতিতে নিউজিল্যান্ড এর বিপক্ষে ৪-০ সিরিজে ছিলেন ব্যাক আপ বোলার।

২০১২ এশিয়া কাপে ফাইনালে তুলতে তার ভূমিকা অবিস্মরণীয়। তিলকারত্মে দিলশান, মাহেলা জয়াবর্ধানে, কুমার সাঙ্গাকারার উইকেট নিয়ে শ্রীলংকার ব্যাটিং লাইন আপ একাই গুড়িয়ে দেন তিনি। কিন্তু ফাইনালে উঠানোর নায়ক আবারও ইনজুরিতে পড়েন ফাইনাল খেলেই।

এই যাত্রাই শেষ যাত্রা। আর ফিরে আসেননি, বাইশ গজে বল করা হয়নি। ফাইনালে পাকিস্তানের বিপক্ষে ৮ ওভারে ১ মেইডেনে ৩৬ রানে নিয়েছেন ১ উইকেট। ৮ ওভার বল করার পরে ইনজুরিতে পড়ায় অধিনায়ক মুশফিক বল তুলে দেন আরেক পেসার শাহাদাতের হাতে।

৮ ওভারে ৪৩ রান দিয়ে উইকেট শূন্য থাকা শাহাদাতের শেষ ওভারেই আসে ২০ রান। ম্যাচটা বাংলাদেশ হারে ২ রানে। অনেকের মতো নাজমুল শেষ ওভার করলে ফলাফল হতে পারতো ভিন্ন, ম্যাচ জিততো বাংলাদেশ৷ নাজমুল আজীবন আক্ষেপ হয়েই থাকবেন কোটি বাংলাদেশীর কাছে।

একই ফরম্যাটে ২০০৪ সালে ইংল্যান্ডে অনুষ্ঠিত চ্যাম্পিয়নস ট্রফিতে অভিষেক হয় প্রোটিয়াদের বিপক্ষে। ক্যারিয়ারের ৩য় ম্যাচেই বাজিমাৎ। ৮.২ ওভার বল করে ১ মেইডেনে ৪০ রান খরচায় শিকার করেন ৪ উইকেট। যেখানে দুই ওপেনার নাথান অ্যাস্টল আর পিটার ফুলটন কে করেছেন বোল্ড। বোল্ড করেছেন ক্রিস কেয়ার্নসকে। উইকেট নিয়েছেন আন্দ্রে অ্যাডামসের৷

২০০৮ থেকে ২০১২ এই সময়টাতে অনেকটা লড়াই করে টিকে ছিলেন জাতীয় দলে। কখনো ব্যাক আপ বোলার, আবার কখনো তাকে ঘিরেই সাজানো হয়ে বোলিং অ্যাট্যাক। পুরো ক্যারিয়ারেরর প্রায় ম্যাচ গুলোই খেলেছেন কারো না কারো ইনজুরির আশীর্বাদে।

১৮৯৯ এর পরে ক্রিকেট ইতিহাসের চতুর্থ এবং বাংলাদেশী হিসেবে ২য় ক্রিকেটার যিনি কোনো প্রথম শ্রেণীর ম্যাচ না খেলেই সরাসরি জাতীয় দলের হয়ে টেস্ট ক্রিকেটে প্রধিনিধিত্ব করেছেন। প্রথম বাংলাদেশী এবং ১৮৯৯ সালের পর ৩য় ক্রিকেটার হিসেবে এই কীর্তি গড়েন মাশরাফি বিন মোর্ত্তজা।

নাজমুল হোসেন
নাজমুল হোসেন

অবাক করা ব্যাপার হলো একই রেকর্ডে যুক্ত হওয়া দুজনই জন্মেছিলেন একই দিনে তবে মাশরাফির সালটা ১৯৮৩ আর নাজমুলের ১৯৮৭। ছিলেন যথেষ্ট প্রতিভাবান। কিন্তু হয়ে আছেন বাংলাদেশের ‘আকিব জাবেদ’। কখনো সুযোগ পাননি, কখনো ব্যাক আপ হয়েছিলেন আবার কখনো সুযোগ পেয়েও ইনজুরি তাকে এগোতে দেয়নি।

২০০৪ সালের ১৬ ই ডিসেম্বর চট্টগ্রামের এম এ আজিজ স্টেডিয়ামে ভারতের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে অভিষেক হয়ে টেস্ট ক্রিকেটে৷ কিন্তু পরের টেস্ট খেলতে সময় নেন আরো সাত বছর। দ্বিতীয় সুযোগ আসে ২০১১ সালে। তবে এই সুযোগই শেষ সুযোগ। ক্যারিয়ারের দ্বিতীয় এবং সর্বশেষ টেস্ট খেলেন ১৬ই ডিসেম্বর ২০১১ সালে মিরপুর শের ই বাংলা ক্রিকেট স্টেডিয়ামে পাকিস্তানের বিপক্ষে। ৩ ইনিংসের টেস্ট ক্যারিয়ারে উইকেট ৫ টি, গড় ৩৮।

অধিনায়ক মাশরাফী পরবর্তী বোলিং অ্যাট্যাকে অর্থাৎ তিন পেসার কিংবা চার পেসারের যুগে অভিষিক্ত হলে নাজমুল হোসেনের হতে পারতেন অন্যতম বোলিং কাণ্ডারি কিংবা টেস্ট ক্রিকেটে মাশরাফির যোগ্য উত্তরসূরী। মাশরাফি শাহাদাত জুটির পর টেস্টে নিয়মিত পারফরম্যান্স করে যাওয়া পেসার এখনো পায়নি বাংলাদেশ। নিয়মিত সুযোগ পেলে সেই আক্ষেপ মেটানোর যথেষ্ট সুযোগ ছিলো নাজমুল হোসেনের।

পরিসংখ্যান সব সময় সব কিছুর সাক্ষ্য রাখে না। তবে নাজমুল হোসেনের পরিসংখ্যান বলে ২ টেস্টে ৩ ইনিংসে ৩৮.৮ গড়ে, ৩.৫৪ ইকোনমিতে নিয়েছেন ৫ উইকেট, সেরা বোলিং পাকিস্তানের বিপক্ষে ঢাকায় ৬১ রানে ২ উইকেট শিকার।

আর ৩৭ ওয়ানডেতে ৩৬ ইনিংসে ৩০.৮৬ গড়ে, প্রায় পাঁচ ইকোনমিতে ৪৩ টি উইকেট। সেরা বোলিং কিউইদের বিপক্ষে চট্টগ্রামে ৪০ রান খরচায় ৪ উইকেট। চার আন্তর্জাতিক টি টোয়েন্টি ম্যাচে উইকেট সংখ্যা মাত্র একটি, সেরা বোলিং ১৫ রানের বিনিময়ে এক উইকেট।

তবে অবদান রেখেছেন ভারতের বিপক্ষে প্রথম জয়ে। সে ম্যাচে ৭ ওভারে দিয়েছিলেন মাত্র ২৬ রান। যেখানে ইকোনমি ৩.৭১। আর অজিদের বিপক্ষে কার্ডিফে জয়ের দিন ১০ ওভারে ৬৫ রান দিলেও ইনিংসের শুরুর দিকে ফিরিয়েছেন ওপেনার ম্যাথু হেইডেনকে। হেইডেন থাকলে ফলাফল অজিদের দিকেও যেতে পারতো।

 

প্রতিভাবান নাজমুলের

 

২০০৯ সালের ত্রিদেশীয় সিরিজের ফাইনালে শ্রীলংকার যখন ৬ রানেই নেই ৫ উইকেট, সেখাবে নাজমুল হোসেনের একাই শিকার ৩ উইকেট। সেদিন আউট করেছিলেন দুই ওপেনার সানাৎ জয়সুরিয়া এবং উপুল থারাঙ্গাকে। আউট করেছেন থুসারাকেও। সে ম্যাচে ১০ ওভারে ৩ মেইডেনে ৩০ রান খরচায় নিয়েছেন ৩ উইকেট, ইকোনমি মাত্র ৩।

পরের সিরিজে বাংলাদেশ জিম্বাবুয়েকে অলআউট করে মাত্র ৪৪ রানে। যেখানে ৬ ওভারে ২ মেইডেনে নাজুমের শিকার ২ টি, ইকোনমি মাত্র ১.৬৬। আউট করেছেন ওপেনার হ্যামিলটন মাসাকাদজা আর চার্লস কভেন্ট্রিকে। ওয়েস্ট ইন্ডিজকে ৬১ রানে গুড়িয়ে দেওয়ার দিনেও সফল নাজমুল হোসেন। ৫ ওভারে ৩.২০ ইকোনমি ১৬ রান খরচায় হায়াতের উইকেট।

আর সেই মহাকাব্যিক ২০১২ এশিয়া কাপের অলিখিত ফাইনালে শ্রীলংকার বিপক্ষে ৮ ওভারে ১ মেইডেনে ৩২ রান খরচায় ৩ টি মহামূল্যবান উইকেট। যেখানে দিলশান, জয়াবর্ধানে আর সাঙ্গাকারা এদের প্রত্যেকেরই উইকেট নেওয়া একজন বোলারের স্বপ্ন থাকে সেখানে এক সাথেই তিন কিংবদন্তীকে আউট করে ম্যাচ জেতানো।

বাংলাদেশের প্রায় বড় বড় জয়ে দলের সাথে থাকা কিংবা অসাধারণ স্পেক উপহার দেওয়া নাজমুল হোসেন দিনশেষে আক্ষেপ হয়েই থাকবেন।

[ প্রতিভাবান নাজমুল হোসেনের আক্ষেপ হয়ে যাওয়া ]

আরও পড়ুন:

মন্তব্য করুন