খালেদ মাসুদ পাইলট [ Khaled Masud Pilot ]: ওয়ান ফ্রম ওয়ান কান্ট্রি !!!

খালেদ মাসুদ পাইলট [ Khaled Masud Pilot ]: ওয়ান ফ্রম ওয়ান কান্ট্রি!

কেন বলছি ? আপনাদের মনে আছে :

বাংলাদেশের কোনো ক্রিকেট সমর্থককে যদি কেউ প্রশ্ন করে –

বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত ছক্কা কোনটি?

সেক্ষেত্রে উত্তরটা অনেকের কাছ থেকে অনেক রকম আসতে পারে। তবে সবাই যদি আবার এক উত্তরে এসে মিলিত হলেও অবাক হওয়ার কিছু নেই। তবে সবার উত্তর এক না হলেও অনেকের কাছেই উত্তরটা কুয়ালামাপুরের কিলাত কেলাব ক্লাব মাঠে ১৯৯৭ এর ১৩ই এপ্রিল মার্টিন সুজিকে হাঁকানো শেষ ওভারের খালেদ মাসুদ পাইলটের সেই ঐতিহাসিক ছক্কা।ওই এক ছক্কাতেই পাল্টে গিয়েছে বাংলাদেশের ক্রিকেটের অনেক চিত্র।

খালেদ মাসুদ পাইলট সেদিন সেই ওভার বাউন্ডারি না হাঁকালে জয়টা অসম্ভবই হয়ে যেতো। এক সাক্ষাৎকারে পাইলট বলেন সেই ওভারের আগে তার প্রার্থনার কথা জানিয়েছিলেন, “আমার খুব প্রিয় একটি জিনিস কেড়ে নিয়ে হলেও বাংলাদেশকে ম্যাচটি জেতাও।’ এমন দেশাত্মবোধ সবার জন্য অনুকরণীয় হয়ে থাকবে সবসময়।

খালেদ মাসুদ পাইলট [ Khaled Masud Pilot ]: ওয়ান ফ্রম ওয়ান কান্ট্রি !!!
খালেদ মাসুদ পাইলট

খালেদ মাসুদ পাইলট [ Khaled Masud Pilot ]: ওয়ান ফ্রম ওয়ান কান্ট্রি!

দেশাত্মবোধের পাশাপাশি এই উইকেটরক্ষকের আরেকটি মহৎ গুন আছে, সেটি আত্মনিবেদন। ২০০৭ এর শ্রীলঙ্কা সফরে পাইলট চেয়েছেন শেষ টেস্টে তার পরিবর্তে মুশফিক খেলুক, “শ্রীলঙ্কাকে অলআউট করা আমাদের পক্ষে সম্ভব নয়। তবে উইকেট যেহেতু ফ্ল্যাট, এখানে দেড়-দুই দিন ব্যাটিং করে ফেলতে পারলে টেস্ট ড্র করার একটা সুযোগ তৈরি হবে।

তবে বড় হতাশাজনক ব্যাপার হলো এমন একটি আত্মনিবেদন মূলক সিদ্ধান্ত এর কথা জানানোর পর একটি মহল ছড়ালো খালেদ মাসুদ পাইলট শ্রীলঙ্কাকে মোকাবেলা করতেই ভয় পান, এটি শুধু মাত্র একটি অযুহাত। পরে অবশ্য তিনি পরিষ্কার জানিয়ে দিয়েছেন, “আমার কাছে মনে হয়েছিলো আমার পরিবর্তে মুশফিক ম্যাচটাতে ভালো খেলবে।” পাইলট এর কথাটা ভিন্ন ভাবে ছড়ালেও, কথা রেখেছিলেন মুশফিক৷ সেই ম্যাচে একটি ইনিংসে মুশফিক ৮০ রানের অনবদ্য এক ইনিংস খেলেন।

১৯৯৭ এর আইসিসি ট্রফিতে উপরের দিকেই ব্যাট করেছিলেন গুরুত্বপূর্ণ সময়ে, দক্ষিণ আফ্রিকায় গিয়ে ইনিংস ওপেন করেছিলেন কিন্তু তার নামে সাথে ‘পাইলট ভয় পায়’ এমন ট্যাগ তিনি মেনে নিতে পারেননি। রেকর্ড অবশ্য তার হয়েই কথা বলে। আশরাফুলের পর মুত্তিয়া মুরালিধরনের বিরুদ্ধে বাংলাদেশের সবচাইতে সফল ব্যাটসম্যানের নাম খালেদ মাসুদ পাইলট। ওয়ানডেতে সেখানে হয়েছিলেন সিরিজ সেরা। যদিও সেই টেস্টের পর আরখালেদ মাসুদ পাইলটকে ডাকা হয়নি টেস্ট দলে।

আত্মনিবেদন কিংবা স্পোর্টসম্যানশীপে পাইলট অভাবনীয় – অতুলনীয়। প্রথমবার পাইলটকে অধিনায়কত্ব দেওয়া হয় ২০০১ এর শেষের দিকে। টেস্ট সিরিজের পর ওয়ানডের আগে সংবাদ সম্মেলনে নির্বাচক মাইনুল হক অধিনায়ক দুর্জয়কে ছাড়াই ১৪ জনের দল ঘোষণা করেছিলেন। দুর্জয়ের ব্যাপারে বলেছিলেন, “ও তো শুধু হাত ঘুরিয়ে বল ছেড়ে দিচ্ছে, আমিও অমন বোলিং করতে পারবো।

এরপর নাটকীয় ভাবেই পাইলটকে অধিনায়কত্ব দেওয়া হয়, এতে বরং অবাকই হয়েছিলেন তিনি। জানা যায় এই দায়িত্ব নেওয়ার সামান্য ইচ্ছাটুকুও ছিলো না তার। নির্বাচকদেরখালেদ মাসুদ পাইলট বলেছিলেন, “আমি খুব খুশি হবো, যদি এই সিরিজে দুর্জয়কে রেখে পরের সিরিজে আমাকে অধিনায়ক করা হয়। কারণ এভাবে সিরিজের মাঝপথে কাউকে ছুড়ে ফেলাটা ভীষণ অসম্মানজনক।

২০০৩ সালে আবারো একই রকম ঘটনার মুখোমুখি হতে হয়েছিলো তাকে৷ ২০০৩ বিশ্বকাপের জন্য দেশ ছাড়ার আগে সংবাদ সম্মেলনে অধিনায়ক খালেদ মাসুদ পাইলট জানালেন পরিবারকে আরো বেশী সময় দিবেন এজন্যই তিনি অধিনায়কত্ব ছেড়ে দিচ্ছেন। অধিনায়ক হিসেবে বিশ্বকাপই পাইলটের শেষ সিরিজ। সেদিন পাইলট অশ্রুসিক্ত হয়েছিলেন। যদিও পাইলটকে পুরো ক্যারিয়ার জুড়ে সবাই দেখে এসেছে সদাহাস্যজ্বল এক মানুষ।

বিশ্বকাপে হয়েছিলেন দলের সর্বোচ্চ রান সংগ্রাহক। ছেড়ে দিলেন অধিনায়কত্ব। তবে একই ঘটনা আবার ঘটানোর অপেক্ষায় বিসিবি৷ ২০০৩ সালের পাকিস্তান সিরিজের শেষ টেস্টের আগে বোর্ড কর্তারা চেয়েছিলেন খালেদ মাসুদ পাইলট  পাইলটকে আবার অধিনায়ক এর আসনে বসাতে।

খালেদ মাসুদ পাইলট
খালেদ মাসুদ পাইলট

তবে এবারে ফলাফল ভিন্ন। দুর্জয়ের ক্ষেত্রে যেটা করতে পারেননি, এবার সেটি করতে একদম ভুল করেননি। বোর্ড কর্তাদের সাথে মিটিংয়ের আগে অধিনায়ক সুজনকে নির্ভর দিলেন “চাচা, চিন্তা করো না। আমি তো জানিই যে কী করবো।” কোচ আর বোর্ড কর্তাদের পরিস্কার জানিয়ে দেন, “আমি আর নেব না। কারণ আমাকে বিভিন্ন ভাবে ব্যবহার করা হয়েছে। দুর্জয়কে বাদ দেওয়ার সময় আমার খুব খারাপ লেগেছিল। আপনাদের কাছে অনুরোধ, পারলে সুজনকে এই অসম্মানটা করবেন না।”

বাংলাদেশের হয়ে সাকিব এখন অহরহই সিরিজ সেরা হচ্ছেন। তামিম, মুশফিকরাও এটিকে নিয়ম করে ফেলেছেন। তবে ‘ম্যান অব দ্যা সিরিজ’ এই অ্যাওয়ার্ডটা বাংলাদেশীদের হাতে আসা শুরু করে এই উইকেট রক্ষক ব্যাটসম্যানের হাত দিয়ে। বাংলাদেশের হয়ে প্রথম সিরিজ সেরা খেলোয়াড় এই ক্রাইসিস ম্যান।

শ্রীলঙ্কার বিপক্ষে ২০০২ সালে তাদের মাটিতে ৩ ম্যাচের ওয়ানডে সিরিজে এই পুরস্কার জেতেন তিনি। সেই সিরিজ তিনি খেলেছিলেন সত্যিকারের ক্রাইসিস ম্যানের মতোই৷ পুরো হতশ্রী পারফরম্যান্স বাংলাদেশ দলের। শুধু মাত্র এক পাইলটই ছিলেন ব্যতিক্রম। পুরো সিরিজ জুড়ে করেননি সর্বোচ্চ রান, নেননি কোন উইকেট, নেই কোনো সেঞ্চুরি, কোনো ম্যাচে হতে পারেননি ম্যান অব দ্যা ম্যাচ, নেই কোনো ম্যাচ জয়ী ইনিংস, দল জেতেনি কোনো ম্যাচ।

৩ ম্যাচে ১ অর্ধশতকে করেছেন ১০৬ রান, সাথে গ্লাভস তাতে ৩ ক্যাচ। কিন্তু পাইলটই পেয়েছিলেন ম্যান অব দ্যা সিরিজের পুরস্কার। এর পেছনে মূল কারণ বুদ্ধিদীপ্ত অধিনায়কত্ব আর লড়াই করার মনের জোর। ক্রিকেট ইতিহাসে এভাবে আর কোনো ক্রিকেটার কোনো ম্যান অব দ্য সিরিজের পুরষ্কার পাননি।

উইকেটকিপিং এর পরিসংখ্যানও উইকেট রক্ষক পাইলটের হয়েই কথা বলে। ছিলেন বিশ্বসেরাদের একজন। স্লেজিংয়ের গুনটাও ছিলো। তার স্বাক্ষর ক্যারিয়ারের প্রথম থেকেই দিয়ে এসেছেন। ভারতের বাঙালী অধিনায়ক সৌরভ গাঙ্গুলী একবার পাইলটের ব্যাটিং দেখে বলেছিলেন “এতো বিরক্তিকর ব্যাটিং কোথা থেকে শিখেছো?” এর জবাবে পাইলটে, “তোমাদের সুনীল গাভাস্কারের কাছ থেকে। তিনি তো ৬০ ওভার মাঠে টিকে ১৭৪ বল খেলে তুলেছিলেন মাত্র ৩৬ রান! মনে নেই?” গাঙ্গুলীর নিশ্চয়ই সেদিন একটু অবাকই হওয়ার কথা।

আরেকবার ১৯৯৭ তে টরেন্টোতে সাহারা কাপে যখন দর্শকরা পাকিস্তানের সাবেক অধিনায়ক ইনজামামকে ‘আলু’ ‘আলু’ বলে চিৎকার করছিলেন তখন তিনি ব্যাট নিয়ে তেড়ে গিয়েছিলেন দর্শকদের দিকে। ইনজামাম ফিরে এসে যখন ব্যাটিংয়ে মন দিচ্ছিলেন তখন উইকেটের পেছন থেকে পাইলটের স্লেজিং শুরু, “ইনজি ভাই, বোলো না, তোমকো আলু কিউ বলতা হ্যায়?” তখন সে অবশ্য পাইলটকে গাল মন্দ করেছিলেন।

২০০৫ সালের শ্রীলঙ্কা সফরে মুরালিধরনের তুমুল তর্ক বেঁধে যায়। মুরালিকে পাইলট ‘তোর পাঁচশ উইকেট তো চাক করে রে।‘ পরের বছর অবশ্য মুরালি তার ১০০০ উইকেটের মাইলফলকও স্পর্শ করেছিলেন পাইলটকে আউট করে। তবে এই উইকেট এর মাধ্যমে আরো একবার ইতিহাসের অংশ হয়ে গেলেন পাইলট।

কথায় আছে, “পরিসংখ্যান আস্ত একটা গাদা।” পরিসংখ্যান দিয়ে সব সময় ক্রিকেটকে মূল্যায়ন করা যায় না। বহুবার কলাপ্স হওয়া ব্যাটিং লাইন আপকে পাইলট একার হাতে টেনে নিয়েছেন বোলারদের সাথে নিয়ে, এনে দিয়েছেন সম্মান সূচক স্কোর কিংবা সম্মান সূচক পরাজয়।

বাংলাদেশের হয়ে ওয়ানডেতে প্রথম ১০০০ রানের মালিক এর নাম খালেদ মাসুদ পাইলট। যে ম্যাচ বাংলাদেশ প্রথমবার নিজেদের কৃতিত্বে ড্র করে, সে ম্যাচে টেল এন্ডারদের নিয়ে পাইলটের ধৈর্যের রুদ্রমূর্তিতে ড্র করে বাংলাদেশ। সেটি ২০০৪ এর সেই সেন্ট লুসিয়া টেস্ট এবং সেই টেস্ট সেঞ্চুরি ১০৩*(২৮১) ।

যে ম্যাচ জিতে বাংলাদেশ নিশ্চিত করেছিলো প্রথমবার বিশ্বকাপ খেলার টিকিট। সেটি এই ব্যাটসম্যানের ৭০ রানের কল্যানে জিতেছিলো বাংলাদেশ। হয়েছিলেন অব দ্যা ম্যাচ৷ এমন অনেক ইনিংস আছে যেগুলোতে পাইলট অসাধারণ খেলেছেন কিন্তু দল জয় না পাওয়ায় ইনিংস গুলোকে সেভাবে হাইলাইট করা হয় না৷ তবে বাংলাদেশ এর তখনকার ব্যাটিং দুর্দশার কারণে পাইলট তার ক্রিকেট পরিসংখ্যানকে সমৃদ্ধ করতে পারেননি৷

২০০৭ বিশ্বকাপে তাকে বাদ দিয়ে মুশফিকে দল নেওয়ায় সমালোচনা হয়েছিলো অনেক। ২০০৬ সালের পর নিজ বিভাগের শহর বগুড়ায় নিজের শেষ ওয়ানডে খেলেন এই উইকেট রক্ষক ব্যাটসম্যান।১৯৭৬ সালের ৮ ফেব্রুয়ারী রাজশাহী তে জন্ম নেয়া এই ক্রিকেটার জাতীয় দলের জার্সিতে খেলেছেন ৪৪ টেস্ট আর ১২৬ টি ওয়ানডে। টেস্টে ক্রিকেটে করেছেন ১৪০৯ রান আর ওয়ানডেতে ১৮১৮ রান৷ টেস্টে আছে ৮৭ টি ডিসমিসাল, ওয়ানডেতে ১২৬ টি।

২০১৪ তে ঢাকা প্রিমিয়ার ডিভিশনের ম্যাচে কলবাগানের ক্রিকেট একাডেমির হয়ে লিজেন্ড অব রূপগঞ্জের বিপক্ষে ম্যাচ দিয়ে স্বীকৃত ক্রিকেটের ইতি টানে এই ক্রিকেটার।

 

আরও পড়ুন:

মন্তব্য করুন