মাশরাফি-তাসকিন এবং ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি

মাশরাফি-তাসকিন এবং ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি !!!

মাশরাফি বিন মোর্তজা এবং তাসকিন আহমেদ যেন একই বৃন্তে দুইটি ফুল। ক্রিকেটাঙ্গনে প্রবেশ, এরপর সুরভ ছড়ানো, মাঝখানে হারিয়ে যাওয়া এবং পুনরায় ফিরে আসা এ সবকিছুর মধ্যেই যেন পরস্পরের সঙ্গে এক প্রকার মিল খুঁজে পাওয়া যায় মাশরাফি বিন মোর্তজা এবং তাসকিন আহমেদের মধ্যে।

মাশরাফি-তাসকিন এবং ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি
একত্রে অনুশীলন করছেন মাশরাফি এবং তাসকিন

 

বাংলাদেশ জাতীয় দলের সাবেক অধিনায়ক, মাশরাফি বিন মোর্তজা। ২০০১ সালে জিম্বাবুয়ের বিপক্ষে টেস্টের মাধ্যমে আন্তর্জতিক ক্রিকেটে অভিষেক হয় তার। এরপর থেকেই আন্তর্জাতিক ক্রিকেটে ছুটে চলে গেছেন এক দুরন্ত গতিতে। বিভিন্ন সময়ে ইনজুরির কারণে দলের বাহিরে থাকলেও প্রত্যেকবারই কামব্যাক করেছেন , পুনর্বাসন পরবর্তী সময়ে বাংলাদেশ দলকে উপহার দিয়েছেন বিভিন্ন জয়ের উপলক্ষ।

নিজের ইনজুরির কারণে, খেলতে পারেননি ২০০৩ এবং ২০১১ সালের দুটি বিশ্বকাপ। ২০০৯ সালে মোহাম্মদ আশরাফুলকে সরিয়ে অধিনায়কত্ব দেয়া হয় মাশরাফি বিন মোর্তজার হাতে।

মাশরাফি-তাসকিন এবং ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি
২০১১ বিশ্বকাপে সুযোগ না পেয়ে মাশরাফির কান্নার দৃশ্য

বাংলাদেশের ক্রিকেট ইতিহাসে অন্যতম সফল অধিনায়ক মাশরাফি বিন মর্তুজার ২০১১ বিশ্বকাপ খেলতে না পারার আক্ষেপে কান্নায় ভেঙ্গে পড়ার দৃশ্য এখনো পোড়ায় ক্রিকেট ভক্তদের। নিজেকে ফিট ও ম্যাচ খেলার উপযোগী প্রমাণের পাশাপাশি নিজের ক্ষতি হলে সেটার দায়ভারও নিজে নিবেন এমন শর্তেও খেলতে রাজি ছিলেন মাশরাফি। তবে তখনকার ফিজিওর ভুলে সে আশা মরীচিকায় পরিণত হয়।

স্কোয়াড ঘোষণার কয়েক মাস আগে ঢাকা লিগের ম্যাচ খেলার সময় বিকেএসপিতে চোট পান মাশরাফি। সে চোট পাওয়ার কদিন আগেই বড়সড় সার্জারির পর মাঠে ফিরেছিলেন। বিকেএসপির সেই চোট কেড়ে নেয় দেশসেরা পেসারের ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন। আক্ষেপ ছিল টাইগারদের সদ্য বিদায়ী অধিনায়কের তবে নেই অভিযোগ। যার ভুলে বিশ্বকাপ স্বপ্নটা চোখের সামনে দিয়ে হাওয়া হয়ে গেল সেই ফিজিও মাইকেল হেনরির সাথে কোন ঝামেলায় যাননি।

[ মাশরাফি-তাসকিন এবং ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি ]

ঘরের মাঠে বিশ্বকাপ মিসের হতাশা যেমন আছে তেমনি সৃষ্টিকর্তার ইচ্ছেকেও সহসায় মেনে নেন ২২ গজের এই লড়াকু সৈনিক। বিশ্বকাপ খেললে হয়তো হারাতে হত প্রিয়তমা স্ত্রীকে, দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ম্যাচের দিনই প্রথম সন্তানের জন্ম দিতে গিয়ে হাসপাতালে ভর্তি মাশরাফি পত্নী। চিকিৎসক ৯৯ শতাংশ আশা ছেড়ে দিলেও হাসপাতালে উপস্থিত থাকা মাশরাফি সেদিন আলৌকিকভাবে ফিরে পান স্ত্রী-সন্তান দুজনকেই। আর সে কারণেই ফিট থেকেও নানা প্রতিবন্ধকতায় বিশ্বকাপ মিস করা মাশরাফির নেই কারও প্রতি অভিযোগ।

বিশ্বকাপ মিস করা প্রসঙ্গে মাশরাফি বলেন, ‘আমি কি জন্য বলি আল্লাহ যা করে ভালোর জন্য করে। যখন ডেভিড ইয়াং রিপোর্টটা পাঠিয়েছিল আমাদের তখনকার ফিজিও মাইকেল হেনরির কাছে দূর্ভাগ্যজনকভাবে ও যখন সেটা লিখে পাঠায় তখন পুরো মেইলটা ওর কাছে আসেনি।’

‘মেইলটা যখন আসছে রিড মোর অপশন থাকে সে ঐ অপশনে যায়নি। ও উপরেরটুকু দেখেই ওটা নির্বাচকদের কাছে লিখে পাঠিয়ে দেয়। এরপর আমি ডাক্তারের (ডেভিড ইয়াং) সাথে ফোনে কথা বলি যে তুমিতো বললা অপশনটা আমার হাতে, আমি খেলতে পারবো তবে খেলতে গিয়ে লিগামেন্ট ছিঁড়ে গেলে পুরো দায়ভার আমার। সেখানে মেইলে এমন কিছু আসেনি কেন?’

‘তখন সে বলল নাহ, আমিতো পুরোটাই লিখে পাঠিয়েছি। তখন আমি হেনরিকে বললাম, সে বলল দেখ তুমি মোবাইল চেক করে। পরে আমি যেটা দেখলাম সে (মাইকেল হেনরি) আর নীচের অপশনে যায়নি। এরপর সে আমাকে সরি বলেছে। কিন্তু ওর সাথে তখন আর ঝামেলা করেতো লাভ নাই। মূলত আমি যেটা বললাম আমার ফ্যামিলিকে ব্যাক পাবো দেখেই এসব আমার সাথে ঘটেছে।’

মাশরাফি-তাসকিন এবং ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি
২০১৫ বিশ্বকাপে মাশরাফি

এরপর, ইনজুরি থেকে ফিরেছেন ম্যাশ। বাংলাদেশ দলকে নেতৃত্ব দিয়েছেন ২০১৫ বিশ্বকাপে। তার নেতৃত্বে ২০১৫ বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল এবং ২০১৭ চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফির সেমিফাইনাল খেলে বাংলাদেশ। এছাড়াও, দক্ষিণ আফ্রিকা, ভারত এবং পাকিস্তানের মতো ক্রিকেট পরাশক্তির বিপক্ষে বাংলাদেশ সিরিজ জেতে তারই নেতৃত্বে।

সে মাশরাফিরই দেখানো পথে যেনো চলছেন তাসকিন আহমেদ। মাশরাফির মতোই যেনো দল থেকে বাদ পড়ে নিজেকে মেলে তুলছেন পূর্বের থেকেও শক্তভাবে। মাশরাফি যেমন ২০১১ বিশ্বকাপ দলে ফিটনেসের কারণে সুযোগ না পেয়ে কেদেছিলেন, ঠিক তেমনভাবেই ২০১৯ বিশ্বকাপ দলে সুযোগ না পেয়ে অঝোরে কেদেছিলেন তাসকিন। এ যেনো একই মুদ্রার এপিঠ-ওপিঠ।

মাশরাফি-তাসকিন এবং ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি
২০১৯ বিশ্বকাপে সুযোগ না পেয়ে তাসকিনের  কান্নার দৃশ্য

দেশে প্রথমদিকে করোনা হানা দেয়ার সময়টায় নিজেকে নতুন করে আবিষ্কারের পণ করেন তাসকিন। যার পরিপ্রেক্ষিতে নিজের ফিটনেসসহ নিজের বোলিংয়ে পেস এবং সুইংয়ের এক অসাধারণ বিপ্লব আনেন তিনি। এরপর, ২০২১ সালে উইন্ডিজের বিপক্ষে ঘরের মাটিতে ওয়ানডে সিরিজের তৃতীয় ওয়ানডের মাধ্যমে ২ বছরেরও অধিক সময় পর আন্তর্জাতিক ক্রিকেট প্রত্যাবর্তন হয় তাসকিনের। এরপর, নিউজিল্যান্ড, শ্রীলঙ্কা এবং বাকি সিরিজগুলতেও নিজের অসাধারণ বোলিং দক্ষতা দেখানোর মাধ্যমে নজড় কেড়েছেন ক্রিকেট বোদ্ধাদের।

মাশরাফি-তাসকিন এবং ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি
দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে ৫ উইকেট নেয়ার পর তাসকিন

এরপর, দক্ষিণ আফ্রিকার বিপক্ষে নিজের বোলিং নৈপুণ্যে বাংলাদেশকে ইতিহাস গড়তে সাহায্য করেন। এ সিরিজের তৃতীয় ম্যাচে ৫ উইকেট নিয়ে একাই পুরো দক্ষিণ আফ্রিকার ব্যাটিং লাইন আপকে একাই গুড়িয়ে দেন তাসকিন আহমেদ। প্রথম ওয়ানডেতেও ৩৬ রান খরচ করে ৩ উইকেট নেন তাসকিন। এমন অমানবিক পারফর্মেন্সের কারণে সে সিরিজের ম্যান অব দ্যা সিরিজও নির্বাচিত হন তাসকিন আহমেদ।

মাশরাফি-তাসকিন এবং ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি
ম্যান অব দ্যা সিরিজ ট্রফি হাতে তাসকিন

মাশরাফির মতোই এগিয়ে যাবেন তাসকিন। নিজের দুর্বার গতি এবং সুইংয়ের মাধ্যমে নাজেহাল করবেন বিশ্বের বাঘা বাঘা ব্যাটারদের এই যেনো সকল ক্রিকেটপ্রেমীর প্রত্যাশা।

আরও পড়ুন:

“মাশরাফি-তাসকিন এবং ইতিহাসের পুনরাবৃত্তি”-এ 1-টি মন্তব্য

মন্তব্য করুন